তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী এ রেবন্ত রেড্ডির আমেরিকা সফর বাতিল হয়েছে। তাঁর দফতর শুক্রবার জানিয়েছে, বিদেশ মন্ত্রক ‘রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ছাড়পত্র’ দিতে অস্বীকার করায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির সঙ্গে সমঝোতাপত্র স্বাক্ষরের উদ্দেশ্যে ২০ আগস্ট ব্রিটেন ও আমেরিকায় দশ দিনের সফরে রওনা হয়েছিলেন রেড্ডি। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তাঁর আর বস্টনে যাওয়া হচ্ছে না। ২৩ আগস্ট লন্ডন থেকেই হায়দরাবাদে ফিরবেন তিনি।

সরকারি পদাধিকারী বা সরকারি কর্মচারীদের বিদেশ সফরের আগে বিদেশ মন্ত্রকের কাছ থেকে ‘রাজনৈতিক ছাড়পত্র’ নিতে হয়। কী এই ছাড়পত্র, কেন তা প্রয়োজন এবং কীভাবে তা দেওয়া হয়?

রাজনৈতিক ছাড়পত্র কী

রাজনৈতিক ছাড়পত্র দেয় কেন্দ্রীয় বিদেশ মন্ত্রক। কেবল নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নন, সরকারি কাজে বা ব্যক্তিগত কারণে বিদেশে যেতে ইচ্ছুক সরকারি কর্মচারীদেরও এই অনুমোদন প্রয়োজন। বিভিন্ন মন্ত্রক, সচিব, আমলা ও অন্য সরকারি আধিকারিকদের কাছ থেকে প্রতি মাসে বিদেশ মন্ত্রকের কাছে এমন কয়েকশো আবেদন জমা পড়ে।

ছাড়পত্র দেওয়া বা প্রত্যাখ্যানের আগে একাধিক বিষয় বিবেচনা করে বিদেশ মন্ত্রক। তার মধ্যে রয়েছে সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠানের প্রকৃতি, অন্য দেশগুলির প্রতিনিধিত্বের স্তর, আমন্ত্রণের ধরন এবং আয়োজক দেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক।

এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হল, কোনও সরকারি বিদেশ সফরের ফলে যাতে ভারতের কূটনৈতিক অবস্থান বা বিদেশনীতি সম্পর্কে অনভিপ্রেত বার্তা না যায়। সরকারের সংশ্লিষ্ট স্তরে সফরের সম্ভাব্য কূটনৈতিক প্রভাব আগেই যাচাই করা হয়।

২০১৬ সাল থেকে বিদেশ মন্ত্রকের ‘ই-পলিটিক্যাল ক্লিয়ারেন্স’ ওয়েবসাইটে আবেদন করা যায়। মন্ত্রকের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে আবেদনগুলি পরীক্ষা করে ছাড়পত্র দেয় একটি নির্দিষ্ট সমন্বয় বিভাগ।

মুখ্যমন্ত্রীদের কোন কোন অনুমতি প্রয়োজন

মুখ্যমন্ত্রী এবং রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মন্ত্রীদের সরকারি কিংবা ব্যক্তিগত—যে কোনও বিদেশ সফর সম্পর্কে মন্ত্রিসভার সচিবালয় এবং বিদেশ মন্ত্রককে জানাতে হয়।

২০১৫ সালের ৬ মে মন্ত্রিসভার সচিবালয়ের এক নির্দেশিকায় বলা হয়েছিল, বিদেশ সফরের জন্য আগাম রাজনৈতিক ছাড়পত্র এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিদেশি অনুদান নিয়ন্ত্রণ আইন বা এফসিআরএ-র অধীনে অনুমোদন বাধ্যতামূলক।

মুখ্যমন্ত্রী, রাজ্যের মন্ত্রী এবং অন্য রাজ্য সরকারি আধিকারিকদের কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রকের অর্থনৈতিক বিষয়ক বিভাগের অনুমোদনও নিতে হয়। আবেদনের একটি প্রতিলিপি ওই বিভাগের সচিবকে পাঠাতে হয়। তবে বিদেশ মন্ত্রকের রাজনৈতিক ছাড়পত্র সংযুক্ত না থাকলে অর্থনৈতিক বিষয়ক বিভাগ বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রক আবেদন বিবেচনাই করে না।

আগেও মুখ্যমন্ত্রীদের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে

মুখ্যমন্ত্রীদের রাজনৈতিক ছাড়পত্র না দেওয়ার ঘটনা নতুন নয়। ২০২২ সালে তৎকালীন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল প্রয়োজনীয় অনুমতি না পাওয়ায় সিঙ্গাপুর সফর বাতিল করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

২০১৯ সালের অক্টোবরেও বিদেশের একটি সম্মেলনে যোগ দেওয়ার অনুমতি পাননি তিনি। পরে দৃশ্য-শ্রাব্য মাধ্যমে সেই সম্মেলনে বক্তব্য রেখেছিলেন কেজরিওয়াল।

পূর্ববর্তী ইউপিএ সরকারের আমলেও অসমের তৎকালীন কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈয়ের আমেরিকা ও ইজরায়েল সফর এবং ঝাড়খণ্ডের তৎকালীন বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী অর্জুন মুন্ডার তাইল্যান্ড সফরের অনুমতি দেয়নি বিদেশ মন্ত্রক।

২০১২ সালের ২ এপ্রিল নিউ ইয়র্কে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে যেতে চেয়েছিলেন গগৈ। কিন্তু বিদেশ মন্ত্রকের নথিতে বলা হয়েছিল, কোনও বিদেশি কূটনৈতিক মিশনের সঙ্গে রাজ্য সরকারের সরাসরি যোগাযোগ উপযুক্ত নয়।

জল ও পরিবেশ প্রযুক্তিবিষয়ক একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গগৈয়ের প্রস্তাবিত ইজরায়েল সফরও অনুমোদন পায়নি। কেন্দ্রের বক্তব্য ছিল, বিষয়বস্তু এবং প্রোটোকল—দুই দিক থেকেই অসমের মুখ্যমন্ত্রীকে বিশেষ ব্যবস্থা দেওয়ায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলিকে সমস্যায় পড়তে হবে।

রেবন্ত রেড্ডির ক্ষেত্রে কেন অনুমতি প্রত্যাখ্যান করা হল, তা জানতে বিদেশ মন্ত্রকের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে তাঁর দফতর। রাজ্য সরকারি আধিকারিকদের দাবি, ১৬ আগস্ট কেন্দ্রের কাছে আবেদন করা হয়েছিল। কিন্তু কেবল ব্রিটেন সফরের অনুমতি দেওয়া হয়। সরকারি প্রতিনিধিদল ব্রিটেনে পৌঁছনোর পর আমেরিকা সফরের অনুমতি প্রত্যাখ্যানের কথা জানায় কেন্দ্র।

ছাড়পত্রের ব্যবস্থা নিয়ে সরকারের ভিতরেও বিতর্ক

২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরে বিভিন্ন কেন্দ্রীয় দফতরের সচিবদের সঙ্গে বৈঠক করে তাঁদের পরামর্শ চেয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদী। ওই বছরের ১৪ জুন তৎকালীন অসামরিক বিমান পরিবহণ সচিব অশোক লাভাসা মন্ত্রিসভার তৎকালীন সচিব অজিত শেঠকে চিঠি লিখেছিলেন।

পরে নির্বাচন কমিশনারের পদ থেকে ইস্তফা দেওয়া লাভাসা ওই চিঠিতে বলেছিলেন, সরকারি আধিকারিকদের সমস্ত বিদেশ সফরের প্রস্তাব বিদেশ মন্ত্রকের মাধ্যমে অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রী ব্যবস্থা বদলানো প্রয়োজন।

শেঠ চিঠিটি বিদেশ মন্ত্রকে পাঠান। কিন্তু তৎকালীন বিদেশসচিব সুজাতা সিংহ ২০১৪ সালের ১৩ আগস্ট জানান, বিদেশের কোনও কর্মসূচিতে ভারতীয় সরকারি প্রতিনিধিদের যোগদান উপযুক্ত বা কাম্য কি না এবং প্রতিনিধিত্বের স্তর কী হবে, তা নির্ধারণ করা বিদেশ মন্ত্রকেরই এক্তিয়ার। সেই ব্যবস্থা এখনও চালু রয়েছে।

আর কোন কোন অনুমোদন প্রয়োজন

বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পদাধিকারীর জন্য আলাদা নিয়ম রয়েছে।

  • মুখ্যমন্ত্রী, রাজ্যের মন্ত্রী এবং রাজ্য সরকারি আধিকারিকদের বিদেশ মন্ত্রকের পাশাপাশি অর্থনৈতিক বিষয়ক বিভাগের অনুমতি প্রয়োজন।
  • কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের সরকারি বা ব্যক্তিগত বিদেশ সফরের জন্য বিদেশ মন্ত্রকের রাজনৈতিক ছাড়পত্র পাওয়ার পরে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নিতে হয়।
  • লোকসভার সদস্যদের স্পিকার এবং রাজ্যসভার সদস্যদের চেয়ারম্যান তথা উপরাষ্ট্রপতির অনুমতি নিতে হয়।
  • যুগ্মসচিব পর্যন্ত বিভিন্ন মন্ত্রকের আধিকারিকদের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ছাড়পত্র পাওয়ার পরে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী অনুমোদন দেন।
  • যুগ্মসচিবের উপরের পদমর্যাদার আধিকারিকদের সফরের প্রস্তাব সচিবদের বাছাই কমিটির অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়।

সফরের মেয়াদ, গন্তব্য দেশ এবং প্রতিনিধিদলের সদস্যসংখ্যা অনুযায়ী নিয়ম বদলে যায়। রাষ্ট্রপুঞ্জ ছাড়া অন্য কোনও সংগঠন সফরের আতিথেয়তার ব্যয় বহন করলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কাছ থেকে এফসিআরএ ছাড়পত্রও নিতে হয়।

সাংসদের ব্যক্তিগত সফরের ক্ষেত্রে লোকসভা বা রাজ্যসভা সচিবালয়কে জানানো বাধ্যতামূলক নয়। তবে অনেক সাংসদই লোকসভার স্পিকার বা রাজ্যসভার চেয়ারম্যানের দফতরকে অবহিত করেন। সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে অবশ্য সরকারি ও ব্যক্তিগত—সব ধরনের বিদেশ সফরের জন্যই অনুমতি প্রয়োজন।

২০১৯ সালের ৯ মে কেন্দ্রীয় ব্যয় বিভাগ এক নির্দেশিকায় জানায়, সচিবদের বাছাই কমিটি বা প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন প্রয়োজন—এমন বিদেশ সফরের প্রস্তাব প্রতিনিধিদলের যাত্রার অন্তত ১৫ দিন আগে পাঠাতে হবে। কোনও অবস্থাতেই তা যাত্রার পাঁচ দিনের কম সময় আগে পাঠানো যাবে না।

বিচারপতিদের ক্ষেত্রে কী নিয়ম

সুপ্রিম কোর্ট বা হাই কোর্টের কোনও বিচারপতির সরকারি বিদেশ সফরের প্রস্তাব প্রথমে ভারতের প্রধান বিচারপতির অনুমোদন নিয়ে কেন্দ্রীয় বিচার বিভাগে পাঠানো হয়। বিচার বিভাগ বিদেশ মন্ত্রকের রাজনৈতিক ছাড়পত্র এবং প্রয়োজন হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের এফসিআরএ অনুমোদন নিয়ে চূড়ান্ত সম্মতি দেয়।

২০১০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিচারপতিদের ব্যক্তিগত বিদেশ সফরের ক্ষেত্রেও বিদেশ মন্ত্রকের রাজনৈতিক ছাড়পত্র প্রয়োজন ছিল। পরে সেই বাধ্যবাধকতা তুলে দেয় বিচার বিভাগ।

২০১১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি উচ্চতর বিচার বিভাগের বিচারপতিদের ব্যক্তিগত বিদেশ সফর নিয়ে নতুন বিধিনিষেধ জারি হয়েছিল। দিল্লি হাই কোর্টে সেই নির্দেশিকা চ্যালেঞ্জ করা হলে ২০১২ সালের ২৫ মে আদালত তা বাতিল করে দেয়। ফলে বর্তমানে বিচারপতিদের ব্যক্তিগত বিদেশ সফরের জন্য অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই।

গত বছরের ১৩ জুলাই কেন্দ্র একটি দফতর-স্মারক জারি করে বলেছিল, সুপ্রিম কোর্ট বা হাই কোর্টের বিচারপতিরা ব্যক্তিগত কিংবা সরকারি বিদেশ সফরের জন্য বিদেশ মন্ত্রকের কনস্যুলার, পাসপোর্ট ও ভিসা বিভাগের সহায়তামূলক কূটনৈতিক নথি চাইলে আগে রাজনৈতিক ছাড়পত্র জমা দিতে হবে।

কিন্তু চলতি বছরের ১ এপ্রিল দিল্লি হাই কোর্ট সেই দফতর-স্মারক বাতিল করে দেয়। আদালত জানায়, বিচারপতিরা যে উচ্চ সাংবিধানিক পদে রয়েছেন, তার পরিপ্রেক্ষিতে এমন শর্ত আরোপ অনাবশ্যক।