দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে জাতপাতের ভিত্তিতে বৈষম্য প্রতিরোধে তৈরি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ২০২৬ সালের সাম্যবিধি পুনর্বিবেচনা করছে কেন্দ্রীয় সরকার। বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টে এ কথা জানিয়েছেন সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ কেন্দ্রের বক্তব্য নথিভুক্ত করে ইউজিসিকে চার সপ্তাহের মধ্যে বিস্তারিত হলফনামা জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

ইউজিসির ‘উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাম্যের প্রসার বিধিমালা, ২০২৬’-এর সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের হওয়া একগুচ্ছ আবেদনের শুনানিতে সলিসিটর জেনারেল বলেন, “এটি ইউজিসির বিধিমালা সংক্রান্ত মামলা। বিধিমালাটি পুনর্বিবেচনাধীন।” তবে কী ধরনের পরিবর্তনের কথা ভাবা হচ্ছে অথবা বিধিমালাটি সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নতুন কাঠামো তৈরি হবে কি না, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানাননি। তিনি শুধু স্পষ্ট করেন, সরকার বিষয়টি নতুন করে খতিয়ে দেখছে।

বেঞ্চ ইউজিসিকে সমস্ত প্রশ্নের উত্তর-সহ একটি পূর্ণাঙ্গ হলফনামা জমা দিতে বলেছে। কেন্দ্র ও ইউজিসির বক্তব্য পাওয়ার পরে আবেদনকারীরা দুই সপ্তাহের মধ্যে পাল্টা হলফনামা দিতে পারবেন। ফলে বিধিমালার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পেতে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

গত ২৯ জানুয়ারি প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ ২০২৬ সালের বিধিমালার প্রয়োগ স্থগিত করে দিয়েছিল। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে আদালত বিধিমালার কয়েকটি ধারাকে ‘অস্পষ্ট’ এবং তার সম্ভাব্য পরিণতিকে ‘অত্যন্ত ব্যাপক’ বলে চিহ্নিত করে। বিধিগুলির অপব্যবহারের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না বলে জানিয়েছিল আদালত। বেঞ্চের আশঙ্কা ছিল, যথেষ্ট সুরক্ষা ও স্পষ্টতা না থাকলে বৈষম্য দূর করার পরিবর্তে এই বিধিমালা শিক্ষাঙ্গনে নতুন বিভাজন তৈরি করতে পারে এবং সামাজিক সম্প্রীতির উপর বিপজ্জনক প্রভাব ফেলতে পারে।

একই সঙ্গে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছিল, পরবর্তী আদেশ না হওয়া পর্যন্ত ইউজিসির ২০১২ সালের বৈষম্যবিরোধী বিধিই কার্যকর থাকবে। অর্থাৎ ২০২৬ সালের বিধিমালা স্থগিত থাকলেও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বৈষম্যের অভিযোগ গ্রহণ বা প্রতিকারের ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়নি।

বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ২০২৬ সালের বিধিমালার ৩(১)(সি) ধারা। সেখানে ‘জাতভিত্তিক বৈষম্য’ বলতে তফসিলি জাতি, তফসিলি জনজাতি এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির সদস্যদের বিরুদ্ধে শুধু জাতি বা জনজাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্যকে বোঝানো হয়েছে। আবেদনকারীদের বক্তব্য, এই সংজ্ঞা সাধারণ শ্রেণিভুক্ত ছাত্রছাত্রীদের বাইরে রেখে দিয়েছে এবং পারস্পরিক জাতিগত বৈষম্যের সম্ভাবনাকে স্বীকার করেনি।

অন্য দিকে, একই বিধিমালার ৩(১)(ই) ধারায় বৈষম্যের একটি বিস্তৃত সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। সেখানে ধর্ম, বর্ণ, জাত, লিঙ্গ, জন্মস্থান ও প্রতিবন্ধকতার মতো একাধিক ভিত্তির উল্লেখ রয়েছে। আদালত প্রশ্ন তুলেছিল, বৈষম্যের এমন বিস্তৃত সংজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও আলাদা করে ‘জাতভিত্তিক বৈষম্য’-এর অপেক্ষাকৃত সংকীর্ণ সংজ্ঞা তৈরির প্রয়োজন কী।

আবেদনকারীদের আরও অভিযোগ, মিথ্যা বা বিদ্বেষপ্রসূত অভিযোগ ঠেকানোর জন্য চূড়ান্ত বিধিমালায় পর্যাপ্ত রক্ষাকবচ নেই। অভিযোগের নিরপেক্ষ প্রাথমিক যাচাই, অভিযুক্তকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং প্রমাণিত মিথ্যা অভিযোগের ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়ার সুস্পষ্ট বিধান না থাকলে নিয়মটির অপব্যবহার হতে পারে। তা কোনও ছাত্র বা শিক্ষকের শিক্ষা, কর্মজীবন এবং সামাজিক মর্যাদার অপূরণীয় ক্ষতি করতে পারে বলেও দাবি তাঁদের।

বিধিমালায় ছাত্রাবাস, শ্রেণিকক্ষ, পরামর্শদাতা গোষ্ঠী এবং অন্যান্য শিক্ষামূলক ব্যবস্থায় বাছাই বা বণ্টন স্বচ্ছ, ন্যায্য ও বৈষম্যহীন রাখার কথা বলা হয়েছে। জানুয়ারির শুনানিতে আদালত সতর্ক করে জানিয়েছিল, এই বিধানের ব্যাখ্যা যেন পৃথক ছাত্রাবাস বা জাতভিত্তিক পৃথকীকরণের পথ না খুলে দেয়। শিক্ষাঙ্গনে বৈষম্য রোধের নামে ছাত্রছাত্রীদের পরিচয়ভিত্তিক গোষ্ঠীতে ভাগ করা গ্রহণযোগ্য নয় বলে বেঞ্চ ইঙ্গিত দিয়েছিল।

তবে বিধিমালার সমর্থকদের বক্তব্য, দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলিতে দলিত, আদিবাসী এবং অনগ্রসর শ্রেণির ছাত্রছাত্রীরা এখনও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য, সামাজিক বর্জন ও হেনস্থার মুখোমুখি হন। সেই অভিযোগগুলি দ্রুত এবং দায়বদ্ধতার সঙ্গে নিষ্পত্তির জন্য শক্তিশালী ব্যবস্থা প্রয়োজন। বিধিমালার বিরোধিতার নামে ঐতিহাসিকভাবে বঞ্চিত গোষ্ঠীগুলির সুরক্ষা দুর্বল করা উচিত নয়।

২০১৯ সালে জাতিগত বৈষম্যের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছেন বলে অভিযোগ ওঠা দুই পড়ুয়ার পরিবারের আবেদনের সূত্রেই নতুন বিধি তৈরির প্রক্রিয়া গতি পেয়েছিল। তাঁদের অভিযোগ ছিল, ২০১২ সালের বিধিমালা যথাযথভাবে কার্যকর না হওয়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা কার্যত নিষ্ক্রিয়।

কেন্দ্রের পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্তে এখন মূল প্রশ্ন—সামাজিক ন্যায় নিশ্চিত করার লক্ষ্য অক্ষুণ্ণ রেখে বিধিমালার অস্পষ্টতা ও অপব্যবহারের আশঙ্কা কীভাবে দূর করা হবে। সংশোধিত কাঠামোতে অভিযোগকারীর সুরক্ষার পাশাপাশি অভিযুক্তের ন্যায়সংগত শুনানির অধিকার, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সব শ্রেণির ছাত্রছাত্রীর জন্য সমান প্রতিকার নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। চার সপ্তাহ পরে কেন্দ্র ও ইউজিসির হলফনামাতেই সেই সম্ভাব্য পরিবর্তনের প্রথম স্পষ্ট ছবি পাওয়া যেতে পারে।