যাদবপুরে রাতভর তাণ্ডব, ৩ মামলা

যা জানা জরুরি
- নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা: রাতভর সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের পর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও থামেনি চাপানউতোর।
- একটি মামলায় বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ১১ জন পড়ুয়ার নাম রয়েছে।
- অন্য দু’টি মামলা হয়েছে পাল্টা অভিযোগ এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা: রাতভর সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের পর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও থামেনি চাপানউতোর। ঘটনার পরের দিন তিনটি মামলা দায়ের হয়েছে। একটি মামলায় বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ১১ জন পড়ুয়ার নাম রয়েছে। অন্য দু’টি মামলা হয়েছে পাল্টা অভিযোগ এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিযোগ, বুধবার মধ্যরাতের পর একদল বহিরাগত জোর করে ক্যাম্পাসে ঢুকে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং ভয় দেখানোর চেষ্টা করে। তবে সেই বহিরাগতরা কারা বা কোনও নির্দিষ্ট সংগঠনের সঙ্গে তাঁদের যোগ রয়েছে কি না, তা এখনও তদন্তসাপেক্ষ।
সংঘর্ষের সূত্রপাত বুধবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিভাগের ছাত্র সংসদ ‘ফেটসু’-র সাধারণ সভাকে ঘিরে। বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির অভিযোগ, অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের কয়েক জন সদস্য লাঠি-বাঁশ নিয়ে সভায় ঢুকে গোলমাল বাধান। পাল্টা বিদ্যার্থী পরিষদের দাবি, সাধারণ সভার আড়ালে তাদের সদস্যদের উপর পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়েছিল। বচসা দ্রুত হাতাহাতিতে গড়ায়। এরপর সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে ক্যাম্পাসের একাধিক অংশে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এক আধিকারিক সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে জানিয়েছেন, প্রথমে বিদ্যার্থী পরিষদের এক কর্মীকে চড় মারার অভিযোগ ওঠে। এরপর রাত প্রায় একটার সময় স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী-সহ একটি বড় দল ক্যাম্পাসে ঢোকে বলে অভিযোগ। পড়ুয়াদের একাংশের দাবি, মোটরবাইকে করে বহু বহিরাগত এসেছিলেন। যদিও এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে বিদ্যার্থী পরিষদ। তাদের পাল্টা দাবি, বামপন্থী সংগঠনগুলিই বাইরে থেকে লোক এনে তাদের সদস্যদের উপর হামলা চালিয়েছিল। ফলে সংঘর্ষের শুরু এবং বহিরাগতদের পরিচয়—দুই প্রশ্নেই দুই শিবিরের বক্তব্য সম্পূর্ণ বিপরীত।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কয়েক জন পড়ুয়া অরবিন্দ ভবনের ভিতরে আশ্রয় নেন। বাইরে থেকে পাথর ছোড়া, বন্ধ দরজা ভাঙার চেষ্টা এবং ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় আগুন ধরানোর অভিযোগ ওঠে। ছাত্রদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের পতাকা ও বিভিন্ন সংগঠনের প্রচারপত্র ছিঁড়ে আগুনে পোড়ানো হয়। প্রাক্তনীদের উদ্যোগে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য পরিচালিত ‘অসুর পাঠশালা’র প্রচারফলকেও আগুন দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ। কিছু সময়ের জন্য ক্যাম্পাসের চারটি প্রবেশপথও অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। মূল ছাত্রাবাসে হামলার চেষ্টার অভিযোগও করেছেন পড়ুয়াদের একাংশ। রাত প্রায় তিনটে নাগাদ ভিড় ছত্রভঙ্গ হলে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আসে।
সংঘর্ষে বেশ কয়েক জন আহত হন। তাঁদের কয়েক জনকে কেপিসি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। বিদ্যার্থী পরিষদের এক ছাত্র অরিত্র সরকার পুলিশের অভিযোগে ১১ জনের নাম উল্লেখ করেছেন। তাঁর দাবি, দু’জন বিদ্যার্থী পরিষদ সমর্থককে গুরুতর মারধর করা হয় এবং তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। ওই অভিযোগের ভিত্তিতে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার বেআইনি জমায়েত, দাঙ্গা, গুরুতর আঘাত ও হত্যার চেষ্টার মতো ধারার পাশাপাশি তফসিলি জাতি ও জনজাতি অত্যাচার প্রতিরোধ আইনের ধারাও প্রয়োগ করা হয়েছে। পুলিশের সূত্রে দাবি, অভিযুক্ত ১১ জনই বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া এবং বামপন্থী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। তবে অভিযোগের সত্যতা এখনও প্রমাণিত হয়নি; তদন্ত চলছে।
পাল্টা অভিযোগও করেছে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলি। তাদের দাবি, হামলা, মারধর, অগ্নিসংযোগ এবং বহিরাগতদের ঢোকানোর নেপথ্যে বিদ্যার্থী পরিষদ ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের সমর্থকেরা ছিলেন। তাদের অভিযোগ, পরিকল্পিত ভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের দখল নেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। বিদ্যার্থী পরিষদ অবশ্য সেই অভিযোগ নস্যাৎ করে জানিয়েছে, তাদের কর্মীরাই আক্রান্ত হয়েছেন এবং দায় এড়াতে বাম সংগঠনগুলি মিথ্যা প্রচার করছে।
এই টানাপোড়েনের মধ্যেই ঘটনার প্রায় ৩৭ ঘণ্টা পরে থানায় পৌঁছয় উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্যের লিখিত অভিযোগ। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিযোগ, বুধবার রাত ১২টার পর কয়েক জন বহিরাগত জোর করে ক্যাম্পাসে ঢুকে পড়েন। তাঁরা এক নম্বর প্রবেশদ্বারের নজরদারি ক্যামেরা ভাঙেন এবং অরবিন্দ ভবনের ভাঁজ করা লোহার দরজার সামনে আগুন ধরানোর চেষ্টা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী প্রতীক-ফলক ভাঙার অভিযোগও রয়েছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি ও বহিরাগতদের বিরুদ্ধে সরকারি সম্পত্তি ক্ষতি প্রতিরোধ আইনের ৩ ও ৪ ধারা এবং ভারতীয় ন্যায় সংহিতার একাধিক ধারায় মামলা দায়ের হয়েছে। বেআইনি জমায়েত, দাঙ্গা, ভয় দেখানো, আঘাত, পথ আটকানো এবং সম্পত্তি নষ্টের মতো অভিযোগও রয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ তৈরি হয়েছে চার নম্বর প্রবেশদ্বারে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক প্রতীকটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াকে ঘিরে। শিল্পাচার্য নন্দলাল বসুর নকশা করা ওই প্রতীকে পদ্মের পাপড়ির মধ্যে রয়েছে তিন শিখাযুক্ত প্রদীপ। যাদবপুরের পরিচয়চিহ্ন হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গেও এই প্রতীকের গভীর যোগ রয়েছে। প্রতীক ভাঙার অভিযোগ অবশ্য দুই শিবিরই একে অপরের ঘাড়ে চাপিয়েছে। বিদ্যার্থী পরিষদের দাবি, বামপন্থী সংগঠনের সঙ্গে আসা বহিরাগতরাই এটি ভেঙেছে। বাম ছাত্র সংগঠনগুলির পাল্টা দাবি, হামলার পিছনে বিদ্যার্থী পরিষদ-ঘনিষ্ঠরাই ছিল।
ঘটনার তদন্তে তিন সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটিও গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয়। কমিটির সদস্যেরা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের মধ্যে নেতাজি সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রাক্তন উপাচার্য, বাবাসাহেব আম্বেদকর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং এক আধিকারিক রয়েছেন। শিক্ষক সমিতি বহিরাগতদের প্রবেশ ও ভাঙচুরের নিন্দা করে দ্রুত স্বাভাবিক পঠনপাঠনের পরিবেশ ফেরানোর দাবি জানিয়েছে। অধ্যাপকদের একাংশ প্রতীকী কর্মবিরতি পালন করে নজরদারি ক্যামেরার সব ফুটেজ সংরক্ষণ ও প্রকাশ এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিও তুলেছেন।
ঘটনা নিয়ে রাজনীতির উত্তাপও কমেনি। রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত বলেছেন, এই ধরনের সংঘর্ষ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় তথা গোটা পশ্চিমবঙ্গের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে। রাজনৈতিক দলগুলিকে ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি উত্তপ্ত না করার আবেদন জানিয়ে তাঁর বক্তব্য, পড়ুয়াদেরই তাঁদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ দেওয়া উচিত।
তবে সব অভিযোগের কেন্দ্রে এখন একটাই প্রশ্ন—বহিরাগতরা কারা, কী ভাবে তারা ক্যাম্পাসে ঢুকল এবং দীর্ঘ সময় ধরে ভাঙচুর চললেও বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা কেন কার্যকর হল না? তিনটি মামলার তদন্তে এই প্রশ্নগুলির উত্তরই এখন খুঁজছে পুলিশ। নিরাপত্তা বাড়াতে ক্যাম্পাসের কাছে পুলিশ চৌকি এবং অতিরিক্ত নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েনের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



