মোদীর ‘দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র’ কি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের উত্তরাধিকার মুছে দিতে পারবে?

যা জানা জরুরি
- প্রায় প্রত্যেক দেশেরই একটি জাতীয় সঙ্গীত রয়েছে।
- নিউজিল্যান্ডের মতো কোনও কোনও দেশের আবার দু’টি।
- কিন্তু জাতীয় সঙ্গীতের পাশাপাশি সরকারি ভাবে স্বীকৃত একটি ‘জাতীয় গান’ রয়েছে একমাত্র ভারতেরই।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
প্রায় প্রত্যেক দেশেরই একটি জাতীয় সঙ্গীত রয়েছে। নিউজিল্যান্ডের মতো কোনও কোনও দেশের আবার দু’টি। কিন্তু জাতীয় সঙ্গীতের পাশাপাশি সরকারি ভাবে স্বীকৃত একটি ‘জাতীয় গান’ রয়েছে একমাত্র ভারতেরই। এ বছর প্রথম বারের জন্য স্বাধীনতা দিবসের উদ্যাপনেও জায়গা করে নিল ‘বন্দে মাতরম্’—‘ভারতমাতা’র উদ্দেশে রচিত সেই উদ্দীপনাময় বন্দনাগীতি। ১৫ আগস্ট বার্ষিক ভাষণ দিতে নরেন্দ্র মোদী যখন পৌঁছলেন, তখন তাঁকে স্বাগত জানানো হল এই গানের সুরে। ভারতীয় বায়ুসেনার একটি হেলিকপ্টার উড়ে গেল গানটির রচনার ১৫০ বছর পূর্তি স্মরণ করিয়ে দেওয়া একটি ব্যানার নিয়ে।
‘বন্দে মাতরম্’-এর মর্যাদা বৃদ্ধির লক্ষ্যে মোদীর ভারতীয় জনতা পার্টি বহু বছর ধরে যে চেষ্টা চালাচ্ছে, এই আয়োজন যেন তারই চূড়ান্ত পরিণতি। তার কয়েক দিন আগেই গানটির পরিবেশনে বিঘ্ন ঘটানোকে ফৌজদারি অপরাধ বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
স্বাধীনতার ৮০তম বছরে প্রবেশ করতে চলা ভারতের সাফল্যের কথা বলেছেন মোদী। তাকিয়েছেন স্বাধীনতার গৌরবময় শতবর্ষের দিকেও। এই ধরনের ঘোষণার মধ্যে অন্তত এটুকু স্বীকৃতি রয়েছে যে, ভারত ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের হাত থেকে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল। অথচ তাঁর দল বিজেপির বিশ্বাস, দেশ প্রকৃত অর্থে স্বাধীন হয়েছে তার বহু পরে। এই মনোভাবের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রকাশ ঘটেছিল বলিউড অভিনেত্রী এবং ২০২৪ সাল থেকে বিজেপি সাংসদ কঙ্গনা রানাউতের একটি মন্তব্যে। কয়েক বছর আগে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ভারত প্রকৃত স্বাধীনতা পেয়েছে ২০১৪ সালে মোদী নির্বাচিত হওয়ার পরেই।
এই মন্তব্য আক্ষরিক অর্থে নয়, তার অন্তর্নিহিত তাৎপর্যের জন্য গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিজেপি নেতৃত্বের চোখে, তারা যে ভারতের উত্তরাধিকার পেয়েছিল, সেই দেশ ছিল অতিরিক্ত কোমল, মাত্রাতিরিক্ত ইংরেজি-মনস্ক এবং সংখ্যালঘুদের প্রতি অতি-সহনশীল। তাদের প্রকল্প হল এমন একটি ‘সভ্যতাভিত্তিক রাষ্ট্র’ নির্মাণ করা, যার পরিচয় নির্ধারিত হবে ভারতের প্রাচীন হিন্দু ঐতিহ্য দিয়ে। ওয়াশিংটনের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কার্নেগি এনডাওমেন্টের মিলন বৈষ্ণব ২০২৪ সালের একটি গবেষণাপত্রে বিষয়টিকে এ ভাবেই ব্যাখ্যা করেছিলেন। ভারতের এই নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে তিনি বলেছিলেন ‘দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র’।
নতুন প্রজাতন্ত্রের প্রয়োজন নতুন পরিচয়। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার সময় ভারতের জাতীয় প্রতীকগুলি কী হবে, তা স্থির করেছিল গণপরিষদ। পরবর্তী কালে পুরসভা ও অন্যান্য নাগরিক সংস্থা ব্রিটিশ রাজা, রানি এবং নানা ডিউকের মূর্তি সরিয়ে দূরবর্তী পার্কে পাঠিয়ে দেয়—কখনও কখনও বেশ কৌতুককর ভাবে চিড়িয়াখানাতেও। রাজ্য সরকারগুলি শহর ও প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করতে শুরু করে।
২০১৪ সাল থেকে বিজেপিও একই ধরনের অভিযানে নেমেছে। এর প্রত্যক্ষ উদ্দেশ্য হল দলের হিন্দু-প্রাধান্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রসার ঘটানো। ‘বন্দে মাতরম্’-কে জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা না দেওয়ার অন্যতম কারণ ছিল, গানটিতে হিন্দু দেবদেবীর আবাহন মুসলমানদের বিচ্ছিন্ন বোধ করাতে পারে বলে আশঙ্কা। এখন আর সেটিকে উদ্বেগের বিষয় বলে মনে করা হয় না।
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সরকার তার প্রধান রেল পরিষেবার রং বদলে গেরুয়া করেছে—যে রং হিন্দুধর্ম এবং বিজেপি, উভয়ের সঙ্গেই যুক্ত। সরকারি সম্প্রচার সংস্থার প্রতীকও গেরুয়া হয়েছে। গত মাসে ভারতের জাতীয় পুরুষ হকি দলের পোশাকেও সেই রং এসেছে। গত বছর মহাত্মা গান্ধীর নামে চালু কর্মসংস্থান প্রকল্পটির আমূল পরিবর্তন করে নতুন নাম দেওয়া হয় ‘ভিবি-জি রাম জি’। অত্যন্ত কষ্টকল্পিত ভাবে তৈরি এই সংক্ষিপ্ত নামটির মধ্যে উল্টো পথে শব্দ বসিয়ে ভগবান রামের নামটি ঢোকানো হয়েছে।
তবে বিজেপির প্রকল্পের ধর্মীয় অংশটির তুলনায় তার ধর্মনিরপেক্ষ দিকগুলিই একটি নবীন রাষ্ট্রের জাতি-নির্মাণ প্রচেষ্টার সঙ্গে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ। জাতীয় প্রতীক এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটি অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি নতুন প্রজাতন্ত্রের প্রয়োজন এমন একটি সূচনাকাহিনি, যা তাকে অর্থ ও তাৎপর্য দেবে। বিজেপির দুর্ভাগ্য, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন এবং তার বীরদের বিশাল স্মৃতিভাণ্ডার ইতিমধ্যেই সেই প্রয়োজন পূরণ করে রেখেছে। ফলে বিজেপির সামনে দু’টি কৌশল অবশিষ্ট ছিল।
প্রথম কৌশলটি হল, বহু আগে প্রয়াত ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের নতুন ভূমিকায় হাজির করা। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে জাতির নির্মাতার আসন থেকে নামিয়ে অযোগ্য, অধিকারবোধে ভোগা অভিজাত পরিবারের উত্তরাধিকারী হিসেবে তুলে ধরা হল। তাঁর জায়গায় বিজেপির পুরাণ-নির্মাতারা গুরুত্ব বাড়ালেন নেহরুর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের। তাঁদের দাবি, প্যাটেলকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। মোদীর নিজের রাজ্য গুজরাতে বিশ্বের উচ্চতম মূর্তি নির্মাণ করে প্যাটেলকে অমর করে রাখা হয়েছে। আবার তাঁদের আর একটি বক্তব্য হল, গান্ধীর অহিংসার ‘অর্থহীনতা’য় যাঁর বিন্দুমাত্র আস্থা ছিল না, সেই বিপ্লবী সুভাষচন্দ্র বসুই ছিলেন ভারতের প্রকৃত প্রথম প্রধানমন্ত্রী।
দ্বিতীয় কৌশল হল, বিজেপির নিজের যে একমাত্র আকাশছোঁয়া ব্যক্তিত্ব রয়েছেন, তাঁর উপরেই সম্পূর্ণ নির্ভর করা। জুন মাসে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা মোদীকে সংবর্ধনা জানিয়েছে ‘পরপর মেয়াদে ভারতের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী’ হওয়ার জন্য। এই দাবির সঙ্গে এতগুলি শর্ত জুড়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য স্পষ্ট। এর ফলে নেহরুর প্রথম পাঁচ বছর হিসাবের বাইরে চলে যায়, কারণ তখনও দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। ইন্দিরা গান্ধীও বাদ পড়ে যান, কারণ তিনি এক বার ক্ষমতা হারানোর পরে আবার ফিরে এসেছিলেন।
নেহরুর প্রতি এই বিরাগ অবশ্য বোধগম্য। স্বাধীন ভারতের ‘প্রথম প্রধানমন্ত্রী’ তো দু’জন হতে পারেন না।
বিজেপি হয়তো ভারতকে গেরুয়া রঙে রাঙিয়ে দিতে পেরেছে। কিন্তু ইতিহাসের যে সংশোধিত ভাষ্য তারা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে, তা এখনও মানুষের মনে শিকড় গাড়তে পারেনি। গত মাসে দিল্লিতে শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে ছাত্রবিক্ষোভের সময়ই তার প্রমাণ মিলেছে। আন্দোলনকারীদের হাতে ছিল সংবিধানের প্রতিলিপি। তাঁরা প্রদর্শন করছিলেন সংবিধানের স্থপতি বি আর আম্বেদকর, ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী বিপ্লবী ভগৎ সিংহ এবং মহাত্মা গান্ধীর ছবি। তাঁদের কণ্ঠে ছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়কার স্লোগান।
নিজেদের সচেতন জীবনের অধিকাংশ সময় ‘দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্রে’ কাটানো সত্ত্বেও এই তরুণদের প্রতীকগুলি ছিল ‘প্রথম প্রজাতন্ত্রের’। একটি জাতি নির্মাণ করা সহজ কাজ নয়। কিন্তু ইতিমধ্যেই নির্মিত একটি জাতিকে পরে নতুন ছাঁচে ঢেলে সাজানো আরও কঠিন।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



