বাংলাস্ফিয়ার: পাঞ্জাবে মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে ঘটে যাওয়া তিনটি ঘটনা রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিয়ন্ত সিংহ হত্যা মামলায় দণ্ডিত জগতর সিংহ হাওয়ারার জন্য প্যারোলের আবেদন, ইন্দিরা গান্ধী হত্যাকাণ্ডে দণ্ডিত এক ব্যক্তির ছেলেকে বিধানসভা নির্বাচনের প্রার্থী ঘোষণা এবং শিরোমণি অকালি দল সভাপতি সুখবীর সিংহ বাদলের উপর হামলা—ঘটনাগুলি আপাতদৃষ্টিতে আলাদা হলেও একটি জায়গায় এসে মিলে যাচ্ছে। সেটি হল শিখ ধর্মীয় পরিচয় ও আবেগকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা তথাকথিত ‘পন্থিক’ রাজনীতির পরিসর।

তবে কয়েকটি ঘটনাকে পাশাপাশি রেখে পাঞ্জাবে কট্টরপন্থী রাজনীতি ফিরে এসেছে বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছনো তাড়াহুড়ো হবে। বরং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, রাজ্যের রাজনৈতিক দলগুলি কি ভোটের সম্ভাবনা দেখে পন্থিক পরিসরে জায়গা দখলের প্রতিযোগিতায় নেমেছে?

হাওয়ারার প্যারোল ঘিরে রাজনীতি

মুখ্যমন্ত্রী ভগবন্ত মান রাজ্যপাল গুলাবচাঁদ কাটারিয়ার সঙ্গে দেখা করে জগতর সিংহ হাওয়ারার জন্য দশ দিনের প্যারোল চেয়েছেন। উদ্দেশ্য, দীর্ঘদিন বন্দি থাকা হাওয়ারা যেন তাঁর অসুস্থ মায়ের সঙ্গে দেখা করতে পারেন। রাজ্যপালও সেই আবেদন বিবেচনার জন্য সুপারিশ করেছেন।

১৯৯৫ সালে পাঞ্জাবের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিয়ন্ত সিংহকে হত্যার মামলায় হাওয়ারা দোষী সাব্যস্ত হন। ২০১০ সালে তাঁর মৃত্যুদণ্ড পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। প্রায় ৩১ বছর ধরে তিনি কারাগারে রয়েছেন। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হল, বিয়ন্ত সিংহের নাতি তথা বিজেপি নেতা রবনীত সিংহ বিট্টুও মানবিকতার যুক্তিতে প্যারোলের আবেদন সমর্থন করেছেন। অথচ বন্দি শিখদের মুক্তি বা সাজা মকুবের দাবির তিনি বরাবরই বিরোধিতা করেছেন।

ভগবন্ত মানের অবস্থানেও পরিবর্তন স্পষ্ট। মার্চ মাস পর্যন্ত পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্টে তাঁর সরকার হাওয়ারার প্যারোলের বিরোধিতা করেছিল। এখন সেই সরকারই মানবিক কারণে প্যারোল চাইছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এটি কি নিছক মানবিক অবস্থান, না কি ২০২৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে পন্থিক ভোটারদের কাছে পৌঁছনোর পরিকল্পিত চেষ্টা?

আম আদমি পার্টি ২০২২ সালে উন্নয়ন, দুর্নীতিবিরোধী অভিযান এবং প্রশাসনিক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ক্ষমতায় এসেছিল। কিন্তু সরকারের কার্যকারিতা, আইনশৃঙ্খলা, মাদক সমস্যা, কর্মসংস্থান ও কৃষিসঙ্কট নিয়ে অসন্তোষ বাড়লে পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির দিকে নজর ঘোরানো সুবিধাজনক হতে পারে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক প্রমোদ কুমারের মতে, আপ এক দিকে হাওয়ারার প্যারোল সমর্থন করে পন্থিক ভোটারদের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছে, অন্য দিকে তীর্থযাত্রা, ভজনসন্ধ্যা ও মন্দিরকেন্দ্রিক প্রকল্পের মাধ্যমে হিন্দু ভোটারদের আকর্ষণ করছে। অর্থাৎ অকালি দল ও বিজেপির ঐতিহ্যগত রাজনৈতিক পরিসরের দু’দিকেই ভাগ বসাতে চাইছে শাসকদল।

‘বন্দি সিংহ’ প্রশ্নের পুনরুত্থান

হাওয়ারাকে কেন্দ্র করে বিতর্ক নতুন হলেও ‘বন্দি সিংহ’দের মুক্তির দাবি নতুন নয়। বিভিন্ন সন্ত্রাসবাদী ও রাজনৈতিক হিংসার মামলায় দণ্ডিত যে শিখ বন্দিরা দীর্ঘদিন কারাগারে রয়েছেন, তাঁদের মুক্তির দাবিতে তিন বছরের বেশি সময় ধরে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে কৌমি ইনসাফ মোর্চা।

২০২৩ সালের জানুয়ারিতে চণ্ডীগড়-মোহালি সীমান্তে শুরু হওয়া আন্দোলনে তাঁবু, লঙ্গর এবং স্থায়ী মঞ্চ তৈরি হয়েছিল। কৃষক সংগঠন ও একাধিক শিখ প্রতিষ্ঠানের সমর্থনে আন্দোলনটি দীর্ঘ সময় দুই শহরের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগপথে প্রভাব ফেলেছিল। আদালতের হস্তক্ষেপে রাস্তা খুললেও আন্দোলন পুরোপুরি শেষ হয়নি। স্বাধীনতা দিবসে নতুন প্রতিবাদের ডাকের মতো কর্মসূচি বিষয়টিকে রাজনৈতিক আলোচনায় ধরে রেখেছে।

একসময় যে দাবি প্রধানত পন্থিক সংগঠনগুলির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, তা এখন মূলধারার দলগুলিকেও অবস্থান নিতে বাধ্য করছে। বিজেপি বলছে, বন্দিদের মুক্তির সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকার এবং আদালতের আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই হতে হবে। আবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রী গজেন্দ্র সিংহ শেখাওয়াত একসময় যোগ্য বন্দিদের মুক্তির দাবিতে শিরোমণি গুরুদ্বার প্রবন্ধক কমিটির আবেদনপত্রে স্বাক্ষরও করেছিলেন।

পাঞ্জাব একক শক্তিতে নির্বাচনে লড়ার কথা বলা বিজেপি এখন শিরোমণি অকালি দল বাদলের পুরনো পন্থিক ভোটভিত্তিতে প্রবেশ করতে চায়। কিন্তু একই সঙ্গে তাকে জাতীয় নিরাপত্তা ও আইনের শাসন নিয়ে নিজের কঠোর অবস্থানও বজায় রাখতে হচ্ছে। এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা বিজেপির জন্য সহজ হবে না।

‘কুরবানি বনাম কুরবানি’

দ্বিতীয় ঘটনাটি আরও সরাসরি নির্বাচনমুখী। কারাবন্দি খাডুর সাহিবের সাংসদ অমৃতপাল সিংহের নেতৃত্বাধীন শিরোমণি অকালি দল—ওয়ারিস পাঞ্জাব দে ২০২৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম প্রার্থী ঘোষণা করেছে। বাস্সি পাঠানা আসনে তাদের প্রার্থী সতবন্ত সিংহ। তিনি ইন্দিরা গান্ধী হত্যা মামলায় দণ্ডিত এবং ১৯৮৯ সালে ফাঁসি হওয়া কেহর সিংহের ছেলে।

অন্য দিকে, ওই আসনেই নির্দল প্রার্থী হিসাবে লড়তে চাইছেন ইন্দিরা গান্ধীর অন্যতম হত্যাকারী বিয়ন্ত সিংহের মেয়ে অমৃত কৌর মালোয়া। ফলে এই লড়াইকে ইতিমধ্যেই কেউ কেউ ‘কুরবানি বনাম কুরবানি’ বলে বর্ণনা করছেন।

এই প্রার্থী নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে ওয়ারিস পাঞ্জাব দে অতীতের রক্তাক্ত ঘটনাকে বর্তমানের নির্বাচনী পরিচয়ে রূপান্তর করতে চাইছে। বিশেষ করে এমন এক প্রজন্মের তরুণদের কাছে তারা পৌঁছতে চাইছে, যাদের আশি ও নব্বইয়ের দশকের হিংসা, সন্ত্রাসবাদ এবং রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের প্রত্যক্ষ স্মৃতি নেই।

নদীর জলের ভাগ, চণ্ডীগড়ের অধিকার, ফেডারেল কাঠামো এবং সাজা শেষ করেও বন্দি থাকা শিখদের প্রশ্ন তুলে সংগঠনটি বোঝাতে চাইছে, কেন্দ্র ও রাজ্যের ধারাবাহিক সরকার পাঞ্জাবের সঙ্গে বঞ্চনা করেছে। তবে আবেগ তৈরি করা আর রাজ্যজুড়ে নির্বাচনী সমর্থন পাওয়া এক বিষয় নয়।

সুখবীরের উপর হামলা

তৃতীয় ঘটনা সুখবীর সিংহ বাদলের উপর হামলা। মহারাষ্ট্রের নানদেদের একটি গুরুদ্বারে নিহঙ্গের পোশাক পরা এক ব্যক্তি কৃপাণ নিয়ে তাঁর উপর হামলা চালান। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে সুখবীরের সাক্ষাতের কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটনাটি ঘটে। সেই সাক্ষাৎ ঘিরে বিজেপি ও অকালি দলের পুরনো জোট পুনরুজ্জীবনের জল্পনা শুরু হয়েছিল।

শিরোমণি অকালি দল বাদল দীর্ঘদিন পন্থিক রাজনীতির প্রধান বাহক হলেও ২০১৫ সালের ধর্মগ্রন্থ অবমাননার ঘটনা এবং পরবর্তী পুলিশি গুলিচালনা তাদের বিশ্বাসযোগ্যতায় গভীর আঘাত করে। ২০১৭ সালের পর থেকে দলটি সেই হারানো জমি আর ফিরে পায়নি। সুখবীরকে বহু পন্থিক সংগঠন এখনও দলের নৈতিক পতনের জন্য দায়ী করে। তাঁর উপর হামলা সেই ক্ষোভেরই বিপজ্জনক প্রকাশ কি না, তা তদন্তসাপেক্ষ। কিন্তু ঘটনাটি প্রমাণ করে, অকালি রাজনীতির ভিতরে ধর্মীয় বৈধতা ও নেতৃত্বের প্রশ্ন এখনও তীব্র।

ইতিহাস কী বলছে

পাঞ্জাবের নির্বাচনী ইতিহাস অবশ্য সতর্ক করছে। ১৯৯২ সালে সন্ত্রাসবাদ-পরবর্তী নির্বাচনী পর্ব শুরু হওয়ার পর রাজ্য খুব কম ক্ষেত্রেই নিছক ধর্মীয় আবেগের ভিত্তিতে ভোট দিয়েছে। অপারেশন ব্লু স্টার এবং ১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি থাকা সত্ত্বেও পাঞ্জাব তিনবার কংগ্রেসকে ক্ষমতায় এনেছে।

পাঞ্জাবের শিখেরা কখনও একক ভোটগোষ্ঠী হিসাবে আচরণ করেননি। একই কথা হিন্দু ও দলিত ভোটারদের ক্ষেত্রেও সত্য। জাত, শ্রেণি, অঞ্চল, কৃষিনির্ভরতা, গ্রাম-শহরের বিভাজন, প্রার্থী এবং সরকারের কাজ—সব মিলিয়েই ভোটের ফল নির্ধারিত হয়েছে।

বর্তমানে অবশ্য রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে। কংগ্রেস অন্তর্দ্বন্দ্বে জর্জরিত। শিরোমণি অকালি দল বাদল হারানো বিশ্বাস ফিরে পেতে ব্যর্থ। আপ সরকারের জনপ্রিয়তাও আগের মতো অপ্রতিদ্বন্দ্বী নয়। এই পরিস্থিতিতে অমৃতপাল সিংহের দল তরুণ ও ক্ষুব্ধ ভোটারদের একাংশের কাছে বিকল্প হয়ে উঠতে চাইছে।

পন্থিক প্রশ্ন তাই পাঞ্জাবের রাজনীতিতে ফিরে আসছে—কিন্তু তা এখনও জনসাধারণের সর্বগ্রাসী আন্দোলন নয়। বরং দলগুলির মধ্যে ওই পরিসর দখলের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। বিপদ হল, এই প্রতিযোগিতা উন্নয়ন, শিক্ষা, কৃষি, মাদক, কর্মসংস্থান ও প্রশাসনের মতো বাস্তব সমস্যাকে পিছনে ঠেলে আবেগ ও পরিচয়কে সামনে নিয়ে আসতে পারে।

পাঞ্জাব অতীতে এমন রাজনীতির ভয়াবহ মূল্য দিয়েছে। তাই পন্থিক আবেগের পুনরুত্থানের চেয়েও বড় প্রশ্ন—রাজনৈতিক দলগুলি ভোটের স্বার্থে সেই আবেগকে কত দূর উস্কে দিতে প্রস্তুত।