খবর

আট বছর আগেই লেখা ছিল বিপর্যয়ের চিত্রনাট্য, সতর্কতা উপেক্ষার বলি কুর্লার ৮টি প্রাণ

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • বাংলাস্ফিয়ার: মুম্বইয়ের কুর্লায় বুধবার পাহাড়ের ঢাল ভেঙে আট জনের মৃত্যুকে নিছক প্রাকৃতিক বিপর্যয় বলে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই।
  • কারণ, ঠিক কী ভাবে এই বিপদ ঘটতে পারে, আট বছর আগেই প্রায় অক্ষরে অক্ষরে তা জানিয়ে দিয়েছিল ভারতের ভূতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ।
  • ২০১৮ সালের প্রতিবেদনে কুর্লার ওই পাহাড়ি এলাকার জন্য অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

বাংলাস্ফিয়ার: মুম্বইয়ের কুর্লায় বুধবার পাহাড়ের ঢাল ভেঙে আট জনের মৃত্যুকে নিছক প্রাকৃতিক বিপর্যয় বলে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। কারণ, ঠিক কী ভাবে এই বিপদ ঘটতে পারে, আট বছর আগেই প্রায় অক্ষরে অক্ষরে তা জানিয়ে দিয়েছিল ভারতের ভূতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ। ২০১৮ সালের প্রতিবেদনে কুর্লার ওই পাহাড়ি এলাকার জন্য অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, প্রয়োজন সংরক্ষক প্রাচীর, জল নিষ্কাশনের নালা এবং পাহাড়ের ঢাল স্থিতিশীল রাখার ব্যবস্থা। কিন্তু তার একটিও বাস্তবায়িত হয়নি।

বুধবার প্রবল বৃষ্টির মধ্যে পাহাড়ের ঢালে থাকা একটি অশ্বত্থগাছ উপড়ে যায়। তার সঙ্গে আলগা হয়ে নেমে আসে পাথর ও বিরাট শিলাখণ্ড। সেগুলি আছড়ে পড়ে পাহাড়ের নীচে গড়ে ওঠা গওসিয়া চওলের ঘরগুলির উপর। মৃত্যু হয় আট জনের, যাঁদের মধ্যে তিনটি শিশুও রয়েছে। আহত হন আরও কয়েক জন।

অথচ এমনটাই যে ঘটতে পারে, তার সুনির্দিষ্ট পূর্বাভাস ছিল ২০১৮ সালের প্রতিবেদনে। ভূমিধস সংক্রান্ত গবেষণায় কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধান প্রতিষ্ঠান ভারতের ভূতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ দু’বছর ধরে মুম্বইয়ের ৭৪টি ভূমিধসপ্রবণ এলাকায় সমীক্ষা চালিয়েছিল। মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ ও প্রযুক্তিগত গবেষণার ভিত্তিতে তৈরি হয়েছিল ৪৩৫ পৃষ্ঠার ঝুঁকি নির্ধারণ প্রতিবেদন।

সেই প্রতিবেদনে মুম্বইয়ের পাঁচটি প্রধান ভূমিধসপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে কুর্লা, ভান্ডুপ, ঘাটকোপার, ভিখরোলি ও চেম্বুরকে চিহ্নিত করা হয়। কুর্লার ‘হিল নম্বর ৩’ ছিল ওই তালিকার অন্যতম বিপজ্জনক এলাকা। পাহাড়টির ঢাল অত্যন্ত খাড়া। সেখানে ফাটলযুক্ত শিলা ও আলগা মাটির স্তর রয়েছে। পাহাড়ের পাদদেশ এবং কিনারা ঘেঁষে ঘনবসতি গড়ে ওঠায় বিপদের মাত্রা আরও বেড়েছিল।

হিল নম্বর ৩-এর নেতাজি নগর ও মিলিন্দ নগর বসতি পরীক্ষা করে ভূতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ জানিয়েছিল, মহারাষ্ট্রের অন্য এলাকার তুলনায় সেখানে জীবন ও সম্পত্তির ঝুঁকি বহুগুণ বেশি। প্রতিবেদনের ভাষায়, খাড়া ঢাল, ফাটলযুক্ত শিলাস্তর এবং সেই ফাটলের মধ্যে গাছের শিকড় প্রবেশ করায় পাথর গড়িয়ে পড়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। এতে পাহাড়ের কিনারা ও নীচে থাকা বসতিগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই “অবিলম্বে নজর দেওয়া প্রয়োজন”।

প্রতিবেদনে এলাকাটিকে দ্বিতীয় শ্রেণির, অর্থাৎ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। পাহাড়ের ঢাল কাটা এবং ঢালের দিকে নতুন নির্মাণ বন্ধ করার সুপারিশ করা হয়। নিয়মিত গাছের শিকড় ছাঁটা, ছোট গাছ সরানো, বসতির পিছনে পাহাড়ের সম্পূর্ণ উন্মুক্ত অংশ বরাবর জল বেরোনোর ছিদ্রযুক্ত সংরক্ষক প্রাচীর নির্মাণ এবং তার পাদদেশে নালা তৈরির কথাও বলা হয়েছিল। বৃষ্টি ও গৃহস্থালির ব্যবহৃত জল যাতে পাহাড়ের মধ্যে জমে না থাকে, তার জন্য পৃথক নিষ্কাশনব্যবস্থা গড়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

ভূতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, বসতি নির্মাণের জন্য পাহাড় কাটলে ঢালের স্বাভাবিক গঠন বদলে যায়। প্রাকৃতিক জল নিষ্কাশনের পথও বাধাপ্রাপ্ত হয়। প্রবল বৃষ্টিতে বিকৃত ঢাল জল শুষে সম্পূর্ণ সিক্ত হয়ে পড়লে তা ভেঙে যায়। তাঁর কথায়, ভূমিধস কখনও একেবারে আকস্মিক নয়; ঢালের গঠন ও জমির ব্যবহারে পরিবর্তন তার বিপদ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

কিন্তু আট বছরেও সুপারিশ কার্যকর হয়নি। বৃহন্মুম্বই পুরসভার নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালেও হিল নম্বর ৩-কে সংরক্ষক প্রাচীর নির্মাণের অগ্রাধিকারের তালিকায় রাখা হয়েছিল। পুরসভার দাবি, সংশ্লিষ্ট জমি ও পাহাড়ের মালিক জেলা শাসকের দফতর। ফলে পুরসভা পরিকল্পনা কর্তৃপক্ষ হলেও সেখানে নির্মাণ করার ক্ষমতা তার নেই। প্রাচীর তৈরির দায়িত্ব ছিল মহারাষ্ট্র আবাসন ও এলাকা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং পূর্ত দফতরের। অর্থের অভাবে পরিকল্পনাটি থমকে যায়।

২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে মহারাষ্ট্র সরকার ভূমিধস প্রতিরোধে ৪০০ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ করেছিল। কিন্তু ২০২৩ সালের পরে অর্থ ছাড়ার গতি কমে যায়। আইআইটি বম্বের পরামর্শে পাহাড়ের পাথুরে অংশে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তারের জাল বসানো, মাটি ধরে রাখতে গাছ লাগানো এবং ঢাল স্থিতিশীল করার পরিকল্পনা হয়েছিল। তা-ও কার্যকর হয়নি।

কুর্লার শিবসেনা পুরপ্রতিনিধি বিজয়েন্দ্র শিন্ডে দাবি করেছেন, ঘটনার তিন মাস আগেই তিনি পাহাড়ে ধাতব জাল বসানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন। প্রশাসন তাতে কর্ণপাত করেনি। পুরসভা, জেলা প্রশাসন, বস্তি পুনর্বাসন কর্তৃপক্ষ এবং পূর্ত দফতরের মধ্যে দায়িত্ব ঠেলাঠেলি ও অনুমোদনের জটিলতায় কাজ আটকে থাকে।

কুর্লার বিপর্যয় তাই শুধু ভারী বৃষ্টির ফল নয়। বিজ্ঞানীরা বিপদ চিহ্নিত করেছিলেন, প্রতিরোধের পথও দেখিয়েছিলেন। তার পরেও প্রশাসনিক উদাসীনতা, অর্থাভাব এবং বহু দফতরের সমন্বয়হীনতা আটটি প্রাণ কেড়ে নিল। প্রকৃতি কেবল শেষ আঘাতটি করেছে; বিপর্যয়ের ভিত তৈরি করেছিল আট বছরের সরকারি নিষ্ক্রিয়তা।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles