International

বিশ্বমঞ্চে মুনির, ঘরে অস্থির পাকিস্তান

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক গুরুত্বের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ তার সুসংগঠিত ও পরমাণু অস্ত্রধারী সেনাবাহিনী।
  • কিন্তু সেই সেনাবাহিনীর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাবই আবার দেশের গণতান্ত্রিক বিকাশ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের পথে বড় বাধা।
  • ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের উত্থান যেন সেই পুরনো ‘পাকিস্তান বৈপরীত্য’-কেই আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক গুরুত্বের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ তার সুসংগঠিত ও পরমাণু অস্ত্রধারী সেনাবাহিনী। কিন্তু সেই সেনাবাহিনীর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাবই আবার দেশের গণতান্ত্রিক বিকাশ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের পথে বড় বাধা। ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের উত্থান যেন সেই পুরনো ‘পাকিস্তান বৈপরীত্য’-কেই আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

গত দেড় বছরে আন্তর্জাতিক মঞ্চে মুনিরের সক্রিয়তা চোখে পড়ার মতো। ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা, চিনের সঙ্গে কৌশলগত মৈত্রী ধরে রাখা এবং সৌদি আরব ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের সঙ্গে সামরিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানো—সব ক্ষেত্রেই পাকিস্তান নিজেদের গুরুত্ব ফেরানোর চেষ্টা করেছে।

ইরানকে ঘিরে পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনার মধ্যেও ইসলামাবাদ নিজেকে সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অংশীদার হিসেবে তুলে ধরেছে। এই সক্রিয় কূটনীতির ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পাকিস্তানের গুরুত্বও কিছুটা বেড়েছে।

কিন্তু দেশের ভিতরে ছবিটা সম্পূর্ণ আলাদা।

পাকিস্তানের অর্থনীতি এখনও ঋণ, মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের শর্তের চাপে জর্জরিত। প্রায় ২৫ কোটি মানুষের দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, শিল্পোৎপাদনের গতি দুর্বল এবং বিদেশি বিনিয়োগ নিয়েও অনিশ্চয়তা কাটেনি। সৌদি আরবের আর্থিক সহায়তা কিংবা চিনের বিনিয়োগ সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু অর্থনীতির দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যাগুলির সমাধান এখনও হয়নি।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও স্থিতিশীলতার ছবি নেই। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এখনও কারাবন্দি। তাঁর দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের বিরুদ্ধে দমননীতি, নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এবং সংবাদমাধ্যমের উপর নিয়ন্ত্রণ পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

এর পাশাপাশি বালুচিস্তান, খাইবার পাখতুনখোয়া এবং পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে অসন্তোষ বাড়ছে। জঙ্গি হামলা এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের বিস্তারও নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। ফলে দেশের নিরাপত্তার প্রধান অভিভাবক হিসেবে সেনাবাহিনীর ভূমিকা যত বাড়ছে, ততই প্রশ্ন উঠছে—এই সমস্যাগুলির স্থায়ী সমাধান কি শুধুই সামরিক পথে সম্ভব?

মুনিরের হাতে আরও ক্ষমতা

২০২৫ সালে ভারতের সঙ্গে সামরিক সংঘাতের পর মুনিরকে ফিল্ড মার্শাল পদে উন্নীত করা হয়। পরে তাঁকে দেশের প্রথম প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধানও করা হয়েছে। এর ফলে সেনা, নৌ এবং বিমানবাহিনীর উপর তাঁর কর্তৃত্ব আরও কেন্দ্রীভূত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের নির্বাচিত সরকার আনুষ্ঠানিক ভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করলেও সমালোচকদের একটি অংশের মতে, পাকিস্তানের প্রকৃত ক্ষমতার ভারসাম্য এখনও সেনা সদর দফতরের দিকেই ঝুঁকে রয়েছে।

আর এখানেই পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য।

একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী দেশকে আন্তর্জাতিক দরকষাকষিতে বাড়তি ক্ষমতা দিতে পারে। কিন্তু সেই বাহিনী যদি দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে, তা হলে শক্তিশালী বেসামরিক প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা এবং জবাবদিহিমূলক সরকার গড়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে।

ফলে বিদেশে মুনিরের কূটনৈতিক সাফল্য পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বাড়াতে পারে, কিন্তু দেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার মূল কারণগুলিকে মুছে দিতে পারে না।

আসল যুদ্ধ দেশের ভিতরে

পাকিস্তানের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক সক্রিয়তা কতটা স্থায়ী হবে, তার উত্তর শেষ পর্যন্ত সীমান্তের বাইরে নয়, দেশের ভিতরেই মিলবে। অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানো, রাজনৈতিক বৈধতা পুনর্গঠন, জনঅসন্তোষ কমানো এবং প্রতিষ্ঠানগুলির উপর মানুষের আস্থা ফেরানো—এই কাজগুলিই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

বন্দুক দিয়ে আন্তর্জাতিক গুরুত্ব অর্জন করা যায়। কিন্তু স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গড়তে লাগে রাজনৈতিক বৈধতা, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং নাগরিক আস্থা।

মুনিরের সামনে তাই সবচেয়ে কঠিন লড়াই হয়তো সীমান্তে নয়—পাকিস্তানের নিজের ঘরেই।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles