খবর

‘সব বললে জাদুঘরটাই খুলত না’: স্লোভেনিয়ায় বলকান রসিকতার আজব সংগ্রহশালা

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • বাংলাস্ফিয়ার: স্লোভেনিয়ার রাজধানী লিউব্লিয়ানার পুরনো শহরের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর পাশের প্রধান প্রমোদপথে হঠাৎই চোখে পড়ে এক অদ্ভুত দৃশ্য।
  • মাথায় বালতি, গায়ে পেস্তা-রঙা জ্যাকেট, পরনে লাল আঁটসাঁট পাজামা—একটি টেবিলের সামনে বসে রয়েছে মানবাকৃতি পুতুল।
  • সামনে উলটে পড়ে থাকা এক কাপ তুর্কি কফির দিকে তার শূন্য দৃষ্টি।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

বাংলাস্ফিয়ার: স্লোভেনিয়ার রাজধানী লিউব্লিয়ানার পুরনো শহরের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর পাশের প্রধান প্রমোদপথে হঠাৎই চোখে পড়ে এক অদ্ভুত দৃশ্য। মাথায় বালতি, গায়ে পেস্তা-রঙা জ্যাকেট, পরনে লাল আঁটসাঁট পাজামা—একটি টেবিলের সামনে বসে রয়েছে মানবাকৃতি পুতুল। সামনে উলটে পড়ে থাকা এক কাপ তুর্কি কফির দিকে তার শূন্য দৃষ্টি। পিছনে বড় অক্ষরে লেখা—‘বুলশিট মিউজিয়াম: পৃথিবী লাইনচ্যুত, আমরাও। ইয়েবিগা!’

‘ইয়েবিগা’ শব্দটির ভদ্র অনুবাদ হতে পারে—‘যা হওয়ার হবে’ কিংবা ‘ধুর, ছাড়ো তো’। তবে এর মধ্যে বিরক্তি, অসহায়তা, আত্মসমর্পণ এবং বিদ্রুপের এমন এক মিশ্রণ রয়েছে, যা বলকান অঞ্চলের জীবনদর্শনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। গত মে মাসে চালু হওয়া এই জাদুঘরের পাঁচটি ছোট ঘর জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে বিচিত্র পুতুল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি হাস্যরসাত্মক ছবি, অদ্ভুত সাজসজ্জা এবং কার্ডবোর্ডের পর্দায় লেখা অসংখ্য কৌতুক।

জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা বোরুত কোকেল নিজেও যেন প্রদর্শনীর অংশ। তাঁর জামায় লেখা—‘ইয়েবিগার কোন অংশটি বুঝতে পারছ না?’ কোকেলের বক্তব্য, বলকান সমাজে অর্থ না থাকলেও, চাকরি না থাকলেও কিংবা কোনও কিছু ঠিকঠাক না চললেও হাসির সাহায্যে পরিস্থিতি সামলানো যায়। তবে সেই হাস্যরসকে কার্যকর হতে হলে তার কোনও ছাঁকনি থাকা চলবে না।

‘বলকান’ রসিকতার সংগ্রহশালা হিসেবে পরিচিত হলেও এর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সাবেক যুগোস্লাভিয়ার কৌতুক-সংস্কৃতি। সমাজতান্ত্রিক যুগোস্লাভিয়ার অন্তর্ভুক্ত ছিল বর্তমান স্লোভেনিয়া, ক্রোয়েশিয়া, সার্বিয়া, মন্টেনেগ্রো, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা এবং কসোভো। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে জন্ম নেওয়া এই রাষ্ট্রের লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ স্লাভ এবং কয়েকটি অ-স্লাভ জনগোষ্ঠীকে একটি অভিন্ন পরিচয় ও ভাষার বন্ধনে বাঁধা।

কিন্তু নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় যুগোস্লাভিয়ার রক্তক্ষয়ী ভাঙন দেখিয়ে দেয়, অভিন্ন জাতীয় পরিচয়ের ভিত ততটা গভীর ছিল না। ধর্ম, ভাষা, বর্ণমালা এবং আঞ্চলিক পরিচয়ের বিভাজন আজও প্রবল। ক্যাথলিক, অর্থোডক্স ও ইসলাম ধর্মের পাশাপাশি পৃথক উপভাষা ও ভাষা সংশ্লিষ্ট দেশগুলির নিজস্ব পরিচয় নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

জাদুঘরটির দাবি, এই বিচিত্র সাংস্কৃতিক কাঠামোকে কোনও এক সময়ে জুড়ে রেখেছিল বলকান রসবোধ। তাই ভাষা ও বর্ণমালা নিয়ে কৌতুক এখানে বিশেষ জায়গা পেয়েছে। প্রবেশপথে সিরিলিক ও লাতিন—দুই লিপিতেই লেখা, ‘বোকা মানুষ দুই বর্ণমালাতেই বোকা।’ সিরিলিক লিপির সঙ্গে সার্ব ও অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের সম্পর্ক বেশি; লাতিন লিপি ব্যবহার করেন সাবেক যুগোস্লাভিয়ার অধিকাংশ অ-অর্থোডক্স জনগোষ্ঠী।

একটি ব্যঙ্গচিত্রে এক ব্যক্তি বলেন, ‘সুপ্রভাত।’ পাশের জন জানতে চান, ‘লোকটা কী বলল?’ উত্তর আসে, ‘সুপ্রভাত বলেছে, তবে সিরিলিক ভাষায়।’ একই ভাষার মানুষের মধ্যেও বর্ণমালা কীভাবে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দূরত্ব তৈরি করতে পারে, সেটিই এখানে হাসির মোড়কে ধরা হয়েছে।

অঞ্চলের যুদ্ধের ইতিহাসও প্রদর্শনীতে এসেছে, তবে অনেকটা পরোক্ষভাবে। বসনিয়ার যুদ্ধ নিয়ে নির্মিত বিতর্কিত সার্বীয় চলচ্চিত্র লেপা সেলা লেপো গোরে—অর্থাৎ ‘সুন্দর গ্রাম সুন্দরভাবে পোড়ে’—এর নাম পালটে তৈরি করা হয়েছে অর্থহীন অথচ মজার বাক্য: ‘ভাল খাবার সুন্দরভাবে মোটা করে।’

নারীর সামাজিক অবস্থান এবং নারীকে নিয়ে পুরুষতান্ত্রিক ধারণাও ব্যঙ্গের লক্ষ্য। ‘স্টারলেটা’ শব্দটির একটি নকল বিশ্বকোষীয় সংজ্ঞায় লেখা হয়েছে—‘নারীর শরীর ও টার্কি পাখির মাথাওয়ালা প্রথম বলকান পৌরাণিক প্রাণী।’ সৌন্দর্য, অস্ত্রোপচার এবং তারকাখ্যাতির আকাঙ্ক্ষার প্রতি তীব্র বিদ্রুপ রয়েছে এতে। আর একটি কৌতুকে বলা হয়েছে, ‘সে রাজপুত্রকে বিয়ে করতে চেয়েছিল, কিন্তু ঘোড়াটির কাছে বেশি টাকা ছিল।’ বলকানের একাধিক ভাষায় ‘ঘোড়া’ শব্দটি নির্বোধ বা অভদ্র পুরুষ বোঝাতেও ব্যবহৃত হয়।

কোকেল কয়েক বছরে প্রায় ২৫ হাজার আঞ্চলিক কৌতুক সংগ্রহ করেছেন। তবে ধর্ম, জাতি এবং জাতীয় প্রতীক নিয়ে সবচেয়ে তীক্ষ্ণ কৌতুকগুলি তিনি প্রদর্শনীতে রাখেননি। তাঁর স্বীকারোক্তি, ‘সব সত্যিকারের বলকান কৌতুক দেখাতে গেলে সম্ভবত জাদুঘরটাই খুলতে পারতাম না।’

নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে বিদ্রুপ করা কৌতুকও সচেতনভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। যেমন, মন্টেনেগ্রোর মানুষকে ‘অলস’ দেখানোর পুরনো রসিকতা এখানে নেই। একটি প্রচলিত কৌতুকে প্রশ্ন করা হয়, ঘুমোতে যাওয়ার আগে মন্টেনেগ্রোর মানুষ কী বলেন? উত্তর—‘পৃথিবী, উঠে এসো, যাতে আমি শুয়ে পড়তে পারি।’

প্রদর্শনীর অধিকাংশ কৌতুক আসলে দৈনন্দিন জীবনের অসঙ্গতি নিয়ে। যেমন—‘আমরা আগে ভাল ছিলাম, তখনও অভিযোগ করতাম। এখন অবস্থা খারাপ হচ্ছে, আবার অভিযোগ করছি।’ প্রেম নিয়ে বলা হয়েছে, ‘ভালবাসা হল, যখন তোমাকে আলুর বস্তার মতো দেখতে হলেও সে তোমাকে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই হিসেবে দেখে।’ আত্মবিদ্রুপও প্রবল—‘অপেশাদারেরা ভুল করে, আমরা অভিজ্ঞরা বিপর্যয় ঘটাই।’

সব কিছুকে এক সূত্রে বেঁধেছে বলকানের বিখ্যাত ফলের মদ ‘রাকিয়া’। প্রবেশের সময় দর্শকদের তা পরিবেশন করা হয়। প্রদর্শনীতে রাকিয়াকে বলা হয়েছে ‘প্রত্যেক বলকান পরিবারের প্রাথমিক চিকিৎসা’। আর ‘ইয়েবিগা’র সংজ্ঞা?—‘কী আর করা যাবে—এ কথা বলার বলকান পদ্ধতি। অনুভূতি সর্বাধিক, শক্তিক্ষয় সর্বনিম্ন। সঙ্গে থাকে রাকিয়া, চুরুট এবং এমন একটি গান, যা প্রয়োজনের চেয়েও বেশি কষ্ট দেয়।’

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles