শেষ বাঁশিতেই জয়ী: যুবভারতীতে অলৌকিক জয়ে এশিয়ার মূল পর্বে ইস্টবেঙ্গল

যা জানা জরুরি
- বাংলাস্ফিয়ার: শেষ বাঁশি বাজার মুহূর্ত পর্যন্ত ফুটবলে আশা হারাতে নেই।
- যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে বুধবার রাতে সেই পুরনো সত্যটিই নতুন করে প্রমাণ করল ইস্টবেঙ্গল।
- নির্ধারিত সময়ের ৯০ মিনিট পর্যন্ত পিছিয়ে থেকেও কুয়েতের শক্তিশালী আল-আরাবি এসসিকে অতিরিক্ত সময়ে ৪-১ গোলে হারাল লাল-হলুদ।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বাংলাস্ফিয়ার: শেষ বাঁশি বাজার মুহূর্ত পর্যন্ত ফুটবলে আশা হারাতে নেই। যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে বুধবার রাতে সেই পুরনো সত্যটিই নতুন করে প্রমাণ করল ইস্টবেঙ্গল। নির্ধারিত সময়ের ৯০ মিনিট পর্যন্ত পিছিয়ে থেকেও কুয়েতের শক্তিশালী আল-আরাবি এসসিকে অতিরিক্ত সময়ে ৪-১ গোলে হারাল লাল-হলুদ। এই স্মরণীয় জয়ের সুবাদে আন্তোনিয়ো লোপেজ হাবাসের দল জায়গা করে নিল ২০২৬-২৭ মরসুমের এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ টু-এর গ্রুপ পর্বে।
ম্যাচ শুরুর আগে গ্যালারিতে বিশাল ফলকে লেখা ছিল—‘দ্য এশিয়ান ড্রিম’। প্রায় ১৮ হাজার সমর্থকের সামনে সেই স্বপ্নই বাস্তবে রূপ দিলেন জয় গুপ্তা, বাসিম রশিদ, ডেভিড লালহ্লানসাঙ্গা ও রোহিত দানু। ৭৬ মিনিটে পিছিয়ে পড়া ইস্টবেঙ্গল ৯০ মিনিটে সমতা ফেরায়। অতিরিক্ত সময়ের শেষ ১২ মিনিটে তিন গোল করে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত করে দেয় কুয়েত প্রিমিয়ার লিগের গতবারের রানার্সদের।
গত মরসুমে ২২ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে দেশের সর্বোচ্চ স্তরের লিগ জিতেছিল ইস্টবেঙ্গল। সেই সুবাদেই এশীয় প্রতিযোগিতার যোগ্যতা অর্জন পর্বে খেলার সুযোগ আসে। কিন্তু আল-আরাবির বিরুদ্ধে কাজটি মোটেই সহজ ছিল না। অতিথি দলে ছ’জন বিদেশি থাকলেও ইস্টবেঙ্গলের হাতে ছিলেন মাত্র তিন বিদেশি। স্পেনীয় মধ্যরক্ষক নাচো মনসালভে না থাকায় সম্পূর্ণ ভারতীয় রক্ষণ নিয়ে নামতে হয়েছিল হাবাসকে।
শুরু থেকেই অবশ্য রক্ষণাত্মক ফুটবলের পথে যায়নি ইস্টবেঙ্গল। প্রতিপক্ষের শারীরিক শক্তি ও দীর্ঘদেহী রক্ষণভাগের মোকাবিলায় মাঝমাঠে চাপ তৈরি করেন রশিদ ও জেকসন সিং। প্রথমার্ধে রশিদের জোরালো প্রচেষ্টা রুখে দেন আল-আরাবির অধিনায়ক তথা গোলরক্ষক সুলেমান আবদুলগফুর। জেসিন টিকেও সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিলেন রশিদ, কিন্তু তাঁর দুর্বল শট সহজেই ধরে নেন গোলরক্ষক।
২৩ মিনিটে বড় বিপদের মুখে পড়েছিল ইস্টবেঙ্গল। কেনিয়ান মালেকোর শট প্রভসুখন সিং গিলের পায়ের ফাঁক দিয়ে প্রায় গোলরেখা অতিক্রম করে যাচ্ছিল। শেষ মুহূর্তে ঘুরে গিয়ে বলটি নিয়ন্ত্রণে নেন গিল। গোটা বল গোলরেখা অতিক্রম না করায় রক্ষা পায় লাল-হলুদ।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ম্যাচের সহজতম সুযোগটি নষ্ট করেন বিপিন সিং। পাল্টা আক্রমণে জেসিনের বাড়ানো বল ধরে সামনে প্রায় ফাঁকা গোল পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু একটি অতিরিক্ত স্পর্শ নেওয়ার পরে তাঁর শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। সেই ব্যর্থতার মূল্য দিতে হয় ৭৬ মিনিটে। বক্সের মধ্যে মালেকোকে ফেলে দেন সন্দীপ মান্ডি। রেফারি পেনাল্টির নির্দেশ দিলে আনায়ো ইয়াউলা নিচু জোরালো শটে আল-আরাবিকে এগিয়ে দেন।
তার পরেও বিপদ কাটেনি। ব্যবধান দ্বিগুণ করার সুযোগ পেয়েছিল কুয়েতের দল। ইউসেফ মাজেদের হেড অল্পের জন্য বাইরে যায়। আর একটি আক্রমণে নিজের শরীর ছুড়ে দিয়ে নিশ্চিত গোল বাঁচান সন্দীপ। পেনাল্টির ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করে দলকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন তিনি।
সময় তখন দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। গ্যালারির উদ্বেগ ক্রমশ হতাশায় বদলে যাচ্ছে। ঠিক ৯০ মিনিটে অধিনায়ক রশিদের নিখুঁত ফ্রি-কিকে দুর্দান্ত দৌড়ে উঠে জোরালো হেড করেন জয় গুপ্তা। আবদুলগফুরকে পরাস্ত করে বল জালে জড়াতেই বিস্ফোরণের মতো গর্জে ওঠে যুবভারতী। ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।
সমতা ফেরানোর পরে বদলে যায় ইস্টবেঙ্গলের শরীরী ভাষা। আল-আরাবির খেলোয়াড়দের ক্লান্তির সুযোগ নিয়ে আক্রমণের গতি বাড়ায় হাবাসের দল। ১০৮ মিনিটে বক্সের প্রান্তে বল পেয়ে অসাধারণ অর্ধভলিতে ইস্টবেঙ্গলকে এগিয়ে দেন প্যালেস্তাইনের মাঝমাঠের খেলোয়াড় বাসিম রশিদ। আইএসএল খেতাব নিশ্চিত করার ম্যাচেও গোল করেছিলেন তিনি। এ দিন আরও একবার বড় মঞ্চে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিলেন অধিনায়ক।
১১৭ মিনিটে ব্যবধান বাড়ান পরিবর্ত হিসেবে নামা ডেভিড লালহ্লানসাঙ্গা। দীর্ঘদেহী মধ্যরক্ষক শেলডনকে কাটিয়ে অত্যন্ত শান্তভাবে গোলরক্ষককে মাটিতে ফেলে বল জালে পাঠান তিনি। অতিরিক্ত সময়ের সংযুক্তি পর্বে তাঁরই নিঃস্বার্থ পাস থেকে ফাঁকা গোলে বল ঠেলে ৪-১ করেন রোহিত দানু।
এশিয়ার মঞ্চে ১৯৯৩ সালে ইরাকের আল-জাওরাকে ৬-২ গোলে হারানো ইস্টবেঙ্গলের সর্বকালের স্মরণীয় জয়গুলির একটি। আল-আরাবির বিরুদ্ধে এই প্রত্যাবর্তনও তার পাশে স্থান পাওয়ার দাবি রাখে। প্রতিকূলতা, সীমিত বিদেশি এবং প্রায় নিশ্চিত বিদায়ের মুখ থেকে এমন জয় শুধু দক্ষতার নয়, চরিত্রেরও প্রমাণ। আগামী ১৮ আগস্ট কুয়ালালামপুরে গ্রুপ পর্বের সূচি নির্ধারণ হবে। বাহরাইনের আল-খালদিয়া এবং ওমানের আল-নাহদার সঙ্গে চতুর্থ পাত্রে (Pot 4) থাকবে ইস্টবেঙ্গল। ভারতসেরা হওয়ার পরে এ বার সত্যিই এশিয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে লাল-হলুদ।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



