বাংলাস্ফিয়ার: পাকিস্তানের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তের ছোট্ট শহর কুনরিতে হাটবারের বাতাসও ঝাল। চার দিকে পাহাড়ের মতো জমে থাকে শুকনো লাল লঙ্কা। ক্রেতা, বিক্রেতা, দালাল আর শ্রমিকদের ভিড়ের মধ্যে উড়তে থাকে লঙ্কার সূক্ষ্ম গুঁড়ো। চোখ জ্বালা করে, গলা ধরে আসে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এটাই কুনরির পরিচিত ছবি। পাকিস্তান বিশ্বের অন্যতম প্রধান লাল লঙ্কা উৎপাদক দেশ, আর সেই উৎপাদনের প্রাণকেন্দ্র এই কুনরি। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায় সেই পরিচিত ছবিই এখন বিপন্ন।
কখনও অসহনীয় তাপপ্রবাহ, কখনও খরা, কখনও ভয়াবহ বন্যা। তার সঙ্গে বৃষ্টির সময় ও পরিমাণের অনিশ্চয়তা। প্রকৃতির এই খামখেয়ালিপনায় লাল লঙ্কা চাষ ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। বাড়ছে সার ও সেচের খরচ। বিশেষ করে ছোট কৃষকদের পক্ষে পরিবর্তিত আবহাওয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চাষ চালিয়ে যাওয়া ক্রমশ অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
কুনরির কৃষক আহসান আলি দারসের জমিতেই সেই সংকটের ছবি স্পষ্ট। এক সময় তাঁর খেত ভরে থাকত সবুজ লঙ্কাগাছে। এখন সেখানে রোদে ঝলসে যাওয়া গাছ, ফেটে যাওয়া শুকনো মাটি আর মাঝেমধ্যেই ফাঁকা জমি। কয়েক মাসের প্রচণ্ড গরমে গাছগুলি ধুঁকছে। বর্ষা নামলে হয়তো কিছুটা স্বস্তি মিলবে—এই আশায় আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন দারস। অথচ দিনের কয়েক ঘণ্টা গড়াতেই তাপমাত্রা পৌঁছে যায় ১২০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের উপরে, অর্থাৎ প্রায় ৪৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
পাকিস্তানের কাছে এই সংকট নিছক একটি ফসলের সমস্যা নয়। দেশের অর্থনীতির প্রায় এক-চতুর্থাংশ কৃষির উপর নির্ভরশীল। প্রায় অর্ধেক শ্রমশক্তি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে কৃষিক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত। অথচ ২৫ কোটিরও বেশি মানুষের দেশটি জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে বিশ্বের সবচেয়ে বিপন্ন রাষ্ট্রগুলির অন্যতম।
২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যা তার নির্মম উদাহরণ। সেই বন্যায় পাকিস্তানের প্রায় ৪৫ লক্ষ একর কৃষিজমি ধ্বংস হয়েছিল। সবচেয়ে বড় আঘাত নেমে এসেছিল সিন্ধ এবং পাশের পঞ্জাবে। পঞ্জাব পাকিস্তানের প্রধান খাদ্য উৎপাদক অঞ্চল। তিন-চার বছর পেরিয়ে গেলেও বহু কৃষক বলছেন, সেই বিপর্যয়ের আর্থিক ধাক্কা তাঁরা এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেননি।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ফসলগুলির অন্যতম লাল লঙ্কা। পাকিস্তানি রান্নায় যার উপস্থিতি প্রায় অপরিহার্য, সেই লঙ্কাই এখন চাষিদের কাছে অনিশ্চয়তার প্রতীক। কখনও অতিরিক্ত গরমে চারা মরে যাচ্ছে, কখনও অতিবৃষ্টিতে জমি ডুবছে, আবার কখনও বৃষ্টির দেখা নেই। একের পর এক তাপপ্রবাহ ও বন্যার চক্রে সবচেয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন ছোট ও প্রথাগত কৃষকেরা। কারণ নতুন প্রযুক্তি, উন্নত সেচব্যবস্থা কিংবা নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ফসল শুকোনোর পরিকাঠামোয় বিনিয়োগ করার মতো অর্থ তাঁদের হাতে নেই।
আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিতে তাই বীজ বোনার সময়ই বদলে ফেলছেন অনেকে। দারস আগে মে মাসে লঙ্কার বীজ বুনতেন। পরে মার্চে বোনা শুরু করেন, যাতে প্রবল গরম শুরু হওয়ার আগেই গাছগুলি কিছুটা বড় ও শক্ত হয়ে উঠতে পারে। কয়েক বছর সেই কৌশল কাজও করেছে।
গত নভেম্বরেই যেমন ভাল ফলন হয়েছিল। কুনরির বাজারে কয়েকশো লঙ্কাচাষি, ক্রেতা ও দালাল জড়ো হয়েছিলেন। কোথাও কোথাও শুকনো লাল লঙ্কার স্তূপ আট ফুটেরও বেশি উঁচু হয়েছিল। তার চার পাশে চলেছে দরদাম, নিলাম, বস্তাবন্দি আর পরিবহণের ব্যস্ততা।
মাত্র ২৫ হাজার মানুষের কুনরি শহর ফসল ওঠার পর এই লঙ্কার বাজারকে ঘিরেই যেন নতুন জীবন পায়। সিন্ধ প্রদেশের শহরটি ভারতীয় সীমান্ত থেকে প্রায় ৭০ মাইল পশ্চিমে। বাজারের তুলনামূলক ধনী ক্রেতারা মোটরসাইকেলে লঙ্কার স্তূপের ফাঁক দিয়ে ঘোরেন। অন্য দিকে দিনমজুরেরা পিঠে লঙ্কার ভারী বোঝা নিয়ে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে চলেন। ফসল ওঠার মরসুমে শুধু এই একটি বাজারেই দিনে গড়ে ২০০ টনের বেশি লাল লঙ্কা বিক্রি হয়। পাকিস্তানের মোট লাল লঙ্কা উৎপাদনের ৮৫ শতাংশেরও বেশি আসে কুনরি ও তার আশপাশের এলাকা থেকে।
কিন্তু এ বছর পুরনো হিসাব আবার উল্টে দিয়েছে প্রকৃতি। মার্চেই এত গরম পড়েছিল যে দারস তখন বীজ বুনতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে মে মাস পর্যন্ত। তার ফলে এক দিকে চাষের সময় কমেছে, অন্য দিকে সদ্য গজানো দুর্বল চারাগুলিকে পড়তে হয়েছে গ্রীষ্মের ভয়ঙ্কর তাপের মুখে।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে যেন সময়ের সঙ্গে দৌড় শুরু হয়েছে কুনরির কৃষকদের। সেপ্টেম্বর থেকে ফসল তোলা শুরু হওয়ার আগে গাছগুলিকে কোনও রকমে বাঁচিয়ে রাখতে আগের তুলনায় অনেক বেশি সার ব্যবহার করছেন দারস-সহ বহু কৃষক। ফলে উৎপাদন খরচ আরও বাড়ছে। কিন্তু বেশি খরচ করলেই যে ফসল ঘরে উঠবে, সেই নিশ্চয়তাও নেই।
জুলাইয়ের শেষ দিকে অবশেষে দারসের জমিতে বর্ষার প্রথম বৃষ্টি নামে। তাতেও অবশ্য উদ্বেগ কাটেনি। কারণ এখন তাঁর ভয় উল্টো দিকে—বৃষ্টি যদি বেশি হয়ে যায়?
দারসের কথায়, ‘‘অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে ফসল ধ্বংস হবে। আবার বৃষ্টি না হলেও ধ্বংস হবে।’’
এই একটি বাক্যেই যেন কুনরির লঙ্কাচাষিদের বর্তমান সংকট ধরা পড়ে।
বৃষ্টি শুধু মাঠের ফসলকেই বিপন্ন করে না। কুনরির শতাব্দীপ্রাচীন লঙ্কা শুকোনোর পদ্ধতিও এখন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সেপ্টেম্বরে ফসল তোলার পর লঙ্কা মাটিতে ছড়িয়ে রোদে শুকোনো হয়। পুরো প্রক্রিয়ায় প্রায় ১০ দিন লাগে। কিন্তু আবহাওয়ায় আর্দ্রতা বেশি থাকলে লঙ্কায় ছত্রাক ধরে যেতে পারে। হঠাৎ বৃষ্টি নামলে আরও বড় ক্ষতি।
স্থানীয় প্রশাসনের হিসাবেই শুকোনো ও প্রক্রিয়াকরণের পর্যায়ে মোট উৎপাদনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। কুনরির জেলা কর্মকর্তা মুহাম্মদ খানের মতে, ছোট জমির মালিকদের প্রধান সমস্যা লঙ্কা শুকোনো। বিশেষ করে রাতে কুয়াশা ও আর্দ্রতার কারণে বিপুল পরিমাণ ফসল নষ্ট হয়।
এই কারণেই বহু বছর ধরে কুনরির ছোট কৃষকেরা আধুনিক শুকোনোর কেন্দ্রের দাবি জানিয়ে আসছেন। সেখানে নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতায় লঙ্কা শুকোনো গেলে আবহাওয়ার উপর নির্ভরতা অনেকটাই কমানো সম্ভব। কিন্তু সেই দাবি এখনও পূরণ হয়নি।
কুনরির লঙ্কা ব্যবসায়ী মুহাম্মদ সালিমের ক্ষোভ, ‘‘যখনই সরকার বলেছে একটি কেন্দ্র তৈরি হবে, শেষ পর্যন্ত কিছুই হয়নি।’’
প্রশাসনও স্বীকার করছে, বড় জমির মালিকদের তুলনায় ছোট কৃষকদের সমস্যা অনেক বেশি। ধনী কৃষকেরা অতিরিক্ত সার, সেচ কিংবা অন্য ব্যবস্থার খরচ বহন করতে পারেন। ছোট কৃষকের পক্ষে সেই অর্থ জোগাড় করা কঠিন। ফলে জলবায়ু পরিবর্তন শুধু কৃষি উৎপাদনেই আঘাত করছে না, কৃষকদের মধ্যেকার আর্থিক বৈষম্যও বাড়িয়ে তুলছে।
সিন্ধ সরকার অবশ্য কিছু পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে। কুনরিতে একটি নতুন লঙ্কার বাজার তৈরির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সেখানে গুদাম, নিলামের জায়গা এবং ফসল সুরক্ষিত রাখার উন্নত পরিকাঠামো তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু কৃষকদের কাছে মূল প্রশ্ন আরও গভীর—খেতেই যদি ফসল না টেকে, তা হলে আধুনিক বাজার দিয়ে কতটা সমস্যার সমাধান হবে?
ফলন কমছে, সারের দাম বাড়ছে, সেচের সমস্যা মিটছে না। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে আবহাওয়ার চরম অনিশ্চয়তা। ফলে বহু কৃষক এখন বিকল্প ফসলের দিকে ঝুঁকছেন।
দারসও এ বছর নিজের চার একর জমিতে ৮০০টি পেঁপেগাছ লাগিয়েছেন। লঙ্কার উপর নির্ভরতা কিছুটা কমানোর চেষ্টা করছেন তিনি। কিন্তু তাঁর আশঙ্কা, ফসল বদলালেই সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ জলবায়ু যখন বদলে যাচ্ছে, তখন কোন ফসল আগামী কয়েক বছর নিরাপদ থাকবে, তার নিশ্চয়তা কে দেবে?
কুনরির সংকট তাই শুধু লাল লঙ্কার সংকট নয়। এটি এমন এক কৃষিব্যবস্থার সংকট, যা কয়েক প্রজন্ম ধরে নির্দিষ্ট ঋতুচক্রের উপর ভর করে গড়ে উঠেছিল। কখন বৃষ্টি হবে, কখন গরম বাড়বে, কখন বীজ বুনতে হবে, কখন ফসল তুলতে হবে—কৃষকের অভিজ্ঞতায় তার একটা মোটামুটি হিসাব ছিল। জলবায়ু পরিবর্তন সেই পুরনো হিসাবটাই ভেঙে দিচ্ছে।
এক সময় যে প্রকৃতিকে বুঝে চাষ করাই ছিল কুনরির কৃষকদের সবচেয়ে বড় শক্তি, এখন সেই প্রকৃতির আচরণই তাঁদের কাছে দুর্বোধ্য হয়ে উঠছে। লাল লঙ্কার বিশাল স্তূপ এখনও কুনরির বাজারকে রাঙিয়ে তোলে। কিন্তু সেই লালের পিছনে ক্রমশ ঘন হচ্ছে অনিশ্চয়তার ছায়া।
দারসের কথাতেই তার সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত প্রকাশ—‘‘মনে হচ্ছে, প্রকৃতি আর আমাদের পাশে নেই।’’