Home International ২৬ বছর পর ফাঁস ক্লিন্টনের ‘টোপ’ বিমান

২৬ বছর পর ফাঁস ক্লিন্টনের ‘টোপ’ বিমান

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
14 views 3 minutes read
A+A-
Reset

ওয়াশিংটন: প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তায় বিমান বদল, ছদ্মবেশী যাত্রা কিংবা ‘টোপ’ বিমান—মার্কিন রাজনীতিতে এমন কৌশল একেবারে নতুন নয়। কিন্তু গোপন অভিযানের সময় সাংবাদিকদের কতটা জানানো হবে, সেই প্রশ্নেই এখন নতুন করে বিতর্ক। আর সেই বিতর্কের মাঝেই ২৬ বছরের নীরবতা ভাঙলেন প্রবীণ সাংবাদিক সুসান পেজ।

তিনি জানালেন, ২০০০ সালে বিল ক্লিন্টনের পাকিস্তান সফরের আগে হোয়াইট হাউস কী ভাবে তাঁকে গোপনে ডেকে প্রেসিডেন্টের বিমানবদলের পরিকল্পনা জানিয়েছিল।

প্রেসিডেন্ট নামলেন ‘অন্য’ বিমান থেকে

২০০০ সালের মার্চে ভারত সফর শেষে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে যাওয়ার কথা ছিল তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ক্লিন্টনের। তখন পাকিস্তানে সদ্য সামরিক শাসন কায়েম হয়েছে। কয়েক মাস আগেই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেছেন জেনারেল পারভেজ মুশারফ। ফলে ক্লিন্টনের সফরকে ঘিরে নিরাপত্তা-উদ্বেগ ছিল প্রবল।

সেই পরিস্থিতিতে তৈরি হয় অভিনব এক ছক। ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’-এর পরিচিত চিহ্নযুক্ত একটি বিমান প্রথমে ইসলামাবাদে অবতরণ করে। ক্যামেরার সামনে সেই বিমান থেকে নামেন ক্লিন্টনের মতো দেখতে এক সিক্রেট সার্ভিস কর্মী।

এর কিছু পরে একটি চিহ্নহীন ছোট বিমানে ইসলামাবাদে পৌঁছন আসল প্রেসিডেন্ট।

ক্লিন্টন বিমান থেকে নামার পরেই বোঝা যায়, পুরো ঘটনাটিই ছিল নিরাপত্তা কৌশলের অংশ।

তবে সেই সময় সফররত সাংবাদিকদের প্রত্যেকে যে অন্ধকারে ছিলেন, তা নয়।

২৬ বছর ধরে গোপন রেখেছিলেন পেজ

তৎকালীন ইউএসএ টুডে-র হোয়াইট হাউস সংবাদদাতা এবং হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুসান পেজকে ভারত থেকে পাকিস্তানে রওনা হওয়ার আগে গোপনে ডেকে পাঠানো হয়েছিল।

হোয়াইট হাউসের সংবাদ ও নিরাপত্তা বিভাগের আধিকারিকেরা তাঁকে জানিয়েছিলেন, প্রেসিডেন্ট আসলে কোন বিমানে থাকবেন, কী ভাবে ছদ্মবিমানটি ব্যবহার করা হবে এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তার জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

বৈঠকটি হয়েছিল ‘অফ দ্য রেকর্ড’ শর্তে। অর্থাৎ, তথ্য জানা গেলেও তা প্রকাশ করা যাবে না। সেই প্রতিশ্রুতি মেনেই ২৬ বছর ধরে বিষয়টি গোপন রেখেছিলেন পেজ।

এখন তাঁর যুক্তি, ইসলামাবাদে ক্লিন্টন নামার মুহূর্তেই গোটা কৌশল প্রকাশ্যে চলে এসেছিল। এত বছর পর সেই পুরনো গোপনীয়তা বজায় রাখার আর প্রয়োজন নেই।

পেজের বক্তব্য, পাকিস্তান সফরের ঝুঁকি শুধু প্রেসিডেন্টের জন্য ছিল না। তাঁর সঙ্গে থাকা সাংবাদিকেরাও একই সম্ভাব্য বিপদের মুখে ছিলেন। তাই অন্তত একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিককে আগে থেকে জানানো হয়েছিল।

ট্রাম্পের ক্ষেত্রে কোথায় ফারাক?

এই পুরনো ঘটনার সঙ্গে এখন তুলনা করা হচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বিমানবদলের।

গত জুলাইয়ে তুরস্কের আঙ্কারায় নেটো সম্মেলন শেষে দেশে ফেরার সময় ইরানের একটি বিশ্বাসযোগ্য হত্যার হুমকির খবর পাওয়ার পর ট্রাম্পকে গোপনে ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। একটি খাবার সরবরাহকারী গাড়ির আড়ালে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় ছোট, চিহ্নহীন সামরিক বিমানে।

অন্য দিকে, সাংবাদিক, হোয়াইট হাউসের কর্মী এবং কয়েক জন শীর্ষ আধিকারিককে নিয়ে মূল বিমানটি ট্রাম্পকে ছাড়াই ব্রিটেনের উদ্দেশে রওনা দেয়। সাংবাদিকদের জানালার পর্দা নামিয়ে রাখতে বলা হয়েছিল। কিন্তু তাঁদের জানানো হয়নি যে প্রেসিডেন্ট আদৌ ওই বিমানে নেই।

ফলে তাৎক্ষণিক সংবাদ প্রতিবেদনে স্বাভাবিক ভাবেই তৈরি হয়েছিল ধারণা—ট্রাম্প সেই বিমানেই রয়েছেন।

এখানেই ক্লিন্টন ও ট্রাম্প আমলের ব্যবস্থাপনার মধ্যে বড় পার্থক্য দেখছেন সাংবাদিকেরা।

ক্লিন্টনের ক্ষেত্রে গোটা সংবাদদলকে পরিকল্পনা জানানো না হলেও, তাদের নির্বাচিত এক প্রতিনিধিকে সম্ভাব্য বিপদ এবং নিরাপত্তা পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছিল। ট্রাম্পের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে এমন একটি বিমানে পাঠানো হয়, যা সম্ভাব্য হামলাকারীদের চোখে প্রেসিডেন্টের বিমান বলেই মনে হতে পারত।

নিরাপত্তা বনাম সাংবাদিকের নিরাপত্তা

বর্তমান হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জ্যাকি হাইনরিখ প্রশাসনের শীর্ষ আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠক করে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন।

তাঁর বক্তব্যের সারকথা—জাতীয় নিরাপত্তার কারণে কোনও তথ্য সাময়িক ভাবে গোপন রাখা প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু বিপদ কেটে যাওয়ার পরে সাংবাদিকদের সত্য জানানো এবং ভুল বা বিভ্রান্তিকর প্রতিবেদন সংশোধনের সুযোগ দেওয়া জরুরি।

সাংবাদিক ও ইতিহাসবিদ গ্যারেট গ্রাফের মতে, আধুনিক মার্কিন প্রেসিডেন্টদের ইতিহাসে পুরো সংবাদদলকে প্রেসিডেন্টের অবস্থান সম্পর্কে এমন ভাবে বিভ্রান্ত করার নজির খুবই বিরল।

প্রাক্তন সিএনএন সাংবাদিক বারবারা স্টারও একই প্রশ্ন তুলেছেন। সাংবাদিকেরা প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার প্রয়োজন বোঝেন। কিন্তু নিজেদের অজান্তে সম্ভাব্য নিশানা হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া তাঁদের পেশাগত দায়িত্বের অংশ নয়।

সুসান পেজের ২৬ বছর পর প্রকাশ্যে আনা ঘটনাটি তাই শুধু ক্লিন্টনের পুরনো নিরাপত্তা কৌশলের গল্প নয়। বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনছে—রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা রক্ষা করেও কি সংবাদমাধ্যমকে ন্যূনতম আস্থায় রাখা সম্ভব?

ক্লিন্টন আমলের সেই ব্যবস্থা হয়তো নিখুঁত ছিল না। কিন্তু আজকের বিতর্কে সেটিই ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে অস্বস্তিকর এক আয়না হয়ে উঠেছে—প্রেসিডেন্টকে বাঁচানোর ছক গোপন থাকতেই পারে, কিন্তু সেই ছকে যাঁদের সঙ্গে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তাঁদের নিরাপত্তার সত্যটুকুও কি গোপন রাখা যায়?

বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles