Home Sports ভিসা এল, ফাতেন ফিরলেন না

ভিসা এল, ফাতেন ফিরলেন না

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
16 views 3 minutes read
A+A-
Reset

তেতুয়ান: ইউরোপে গিয়ে পেশাদার ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন ছিল ২৬ বছরের ফাতেন বেন ওমর এল আজিজির। মরক্কোর আঞ্চলিক মহিলা ফুটবল লিগে খেলতেন তিনি। কিন্তু বৈধ পথে স্পেনে যাওয়ার দরজা খোলার আগেই ভূমধ্যসাগর তাঁর জীবন কেড়ে নিল।

গত ৩০ জুলাই মরক্কো থেকে সাঁতরে স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ভূখণ্ড সেউতায় পৌঁছনোর চেষ্টা করেছিলেন ফাতেন। সেই যাত্রাতেই সমুদ্রে ডুবে মৃত্যু হয় তাঁর। সবচেয়ে নির্মম ঘটনা—যেদিন তাঁর মৃত্যু হয়, সেদিনই তাঁর মা জানতে পারেন, স্পেনের ভিসা মঞ্জুর হয়েছে।

তাঞ্জিয়ারের স্পেনীয় দূতাবাসে পরিচয়পত্র নিয়ে গেলেই ভিসাটি হাতে পাওয়ার কথা ছিল। অর্থাৎ যে বৈধ ইউরোপযাত্রার জন্য অপেক্ষা করছিলেন ফাতেন, তার দরজা খুলেছিল তাঁর মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা পর।

উত্তর মরক্কোর তেতুয়ানে মা জামিলা, দুই ভাইবোন এবং আত্মীয়দের সঙ্গে থাকতেন ফাতেন। ফুটবলই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় ভালোবাসা। মঙ্গলবার মাঠে এবং বৃহস্পতিবার সমুদ্রসৈকতে নিয়মিত অনুশীলন করতেন। কিন্তু আঞ্চলিক মহিলা ফুটবল খেলে সংসার চালানো ছিল প্রায় অসম্ভব।

দল জিতলে তাঁর হাতে আসত মাত্র ২৬০ মরক্কান দিরহাম, ব্রিটিশ মুদ্রায় প্রায় ২১ পাউন্ড। দল হারলে কোনও পারিশ্রমিকই মিলত না। সেই সামান্য টাকায় মা, ভাইবোন এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের দায়িত্ব নেওয়া কঠিন ছিল। মাত্র ১২ বছর বয়সেই বাবাকে হারিয়েছিলেন ফাতেন। ফলে অল্প বয়সেই সংসারের বোঝা এসে পড়েছিল তাঁর কাঁধে।

ফুটবলের বাইরে তেতুয়ানের সবচেয়ে পুরনো কবরস্থানেও কাজ করতেন তিনি। কবর পরিষ্কার করতেন, আর মৃতদের শ্রদ্ধা জানাতে আসা মানুষের কাছে ‘রায়হান’ নামে পরিচিত সুগন্ধি পাতা বিক্রি করতেন। মুসলিম অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় এই পাতার বিশেষ প্রতীকী গুরুত্ব রয়েছে।

আজ সেই কবরস্থানেই শুয়ে আছেন ফাতেন।

যে ফোন বদলে দিল সব

৩০ জুলাই সকালে জামিলার কাছে ফোন আসে। ফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তি ফাতেনের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন। জামিলা নিজেকে তাঁর মা বলে পরিচয় দিলে তাঁকে জানানো হয়—ফাতেনের স্পেনের ভিসা অনুমোদিত হয়েছে। পরিচয়পত্র নিয়ে তাঞ্জিয়ারের দূতাবাস থেকে তা সংগ্রহ করতে হবে।

কিন্তু ফাতেন যে ভিসার আবেদন করেছিলেন, তা তাঁর মা জানতেনই না। কী ধরনের ভিসা ছিল, স্পেনে কোথায় যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল—এসবও পরিবারের কাছে পরিষ্কার ছিল না।

জামিলার ধারণা, অনানুষ্ঠানিক ভাবে আবেদন করায় ফাতেন হয়তো ভেবেছিলেন ভিসা আর হবে না। সেই হতাশা থেকেই হয়তো অন্যদের সঙ্গে সাঁতরে সেউতায় যাওয়ার ঝুঁকি নিয়েছিলেন তিনি।

মৃত্যুর আগের কয়েক সপ্তাহে ফাতেনও নাকি অস্বাভাবিক ভাবে চুপচাপ ও বিষণ্ণ হয়ে পড়েছিলেন।

পরিবার সারা রাত তাঁকে খুঁজেছে। পরে এক যুবক তাঁদের বাড়িতে এসে জানতে চান, ফাতেন কি ব্যায়ামের পোশাক পরেছিলেন। তাঁর দাবি, সমুদ্র পেরোনোর সময় মাথায় আঘাত পেয়েছিলেন ফাতেন।

মেয়ের মৃতদেহ দেখতে পারেননি জামিলা। শনাক্ত করার জন্য তাঁকে পরিবর্তে যেতে হয়েছিল তাঁর বোনকে।

ফুটবলের মাঠ থেকে কবরস্থান

মা জামিলার কথায়, ফাতেনের স্বপ্ন ছিল ফুটবলকে হাতিয়ার করে ইউরোপে পৌঁছনো। সেখানে উন্নত প্রশিক্ষণ নেওয়া, পেশাদার ফুটবলার হওয়া এবং পরিবারকে একটু স্বচ্ছল জীবন দেওয়া।

কিন্তু পরিবারের আর্থিক অবস্থা তাঁর সেই স্বপ্নের পথে বড় বাধা ছিল। প্রশিক্ষণ, যাতায়াত কিংবা ভবিষ্যতের পরিকল্পনায় প্রয়োজনীয় অর্থ জোগানোর সামর্থ্য ছিল না পরিবারের।

অভিবাসীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কামিনান্দো ফ্রন্তেরাসের হিসাব অনুযায়ী, ওই গণপারাপারের সময় ফাতেন-সহ অন্তত ১৪১ জন প্রাণ হারিয়েছেন। কেউ ডুবে, কেউ আবার স্থলসীমান্তে তৈরি হওয়া ভিড়ে চাপা পড়ে। নিহতদের অধিকাংশের বয়স ৩৫ বছরের নীচে বলে মনে করা হচ্ছে।

ফাতেনের শেষকৃত্যে কয়েকশো মানুষ উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু তাঁর পরিবারের শোকের গল্প সেখানেই শেষ হয়নি।

এ বারও নিখোঁজ দুই সন্তান

মেয়ের মৃত্যুর পর জামিলা জানতে পারেন, তাঁর অন্য দুই সন্তানও একই পথে সেউতার দিকে রওনা হয়েছিল।

বড় ছেলে কোনওভাবে সেউতায় পৌঁছে মাকে ফোন করেছেন। কিন্তু তাঁর ১৪ বছরের ছোট মেয়েটির এখনও কোনও খোঁজ নেই।

“এখন সন্তানদের কেউই আমার কাছে নেই। আমি একা,” বলেছেন জামিলা।

ফাতেনের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গের গল্প নয়। এটি মরক্কোর তরুণ প্রজন্মের হতাশার ছবিও সামনে এনেছে। দেশে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সিদের প্রায় ৪০ শতাংশ বেকার। অথচ ২০৩০ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তুতিতে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে মরক্কো। দামি স্টেডিয়াম ও ক্রীড়া পরিকাঠামোর বিপরীতে কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন তরুণেরা।

ফাতেন ইউরোপে যেতে চেয়েছিলেন ফুটবলের মাধ্যমে। শেষ পর্যন্ত সেই ইউরোপের দরজা তাঁর জন্য খুলেছিল—কিন্তু ভিসা হাতে পাওয়ার আগেই সমুদ্র তাঁকে থামিয়ে দিল।

তাঁর অনুমোদিত ভিসাটি তাই এখন আর বিদেশযাত্রার নথি নয়। হয়ে রইল একটি স্বপ্ন পূরণের ঠিক আগের মুহূর্তে থেমে যাওয়া জীবনের নির্মম দলিল।

বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles