অভিনয় জগতে পা রেখেছেন সবে। কিন্তু নিজের মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে একেবারেই নবাগত নন অহিল্যা। নিট পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে ছাত্র আন্দোলন হোক কিংবা অরোভিলের ইয়ুথ সেন্টার বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিতর্ক—যে বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন, তা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে পিছপা হননি এই অভিনেত্রী ও প্রভাবী। কারণ তাঁর কাছে তারকা-ইমেজের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ মানুষের স্বার্থ।
অহিল্যার দর্শনটা বেশ সোজাসাপ্টা—অভিনেত্রী হওয়ার আগে তিনি একজন মানুষ। তাই কোনও বিষয়ে কথা বললে নিজের পেশাগত পরিচয় বা ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার কী ভাবে প্রভাবিত হতে পারে, সেই হিসাব কষে চুপ করে থাকার পক্ষপাতী নন তিনি।
২৫ বছর বয়সি অহিল্যার বেড়ে ওঠা অরোভিলের আধ্যাত্মিক, প্রকৃতিনির্ভর ও বিকল্প জীবনযাপনের পরিবেশে। সেই পরিমণ্ডলই তাঁর চিন্তাভাবনার ভিত গড়ে দিয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। সম্প্রতি প্রবীণ পরিচালক সিঙ্গীতম শ্রীনিবাস রাওয়ের সঙ্গীতনির্ভর ছবি সিং গীতম-এর হাত ধরে অভিনয়ে পা রেখেছেন অহিল্যা। ছবিতে তাঁর চরিত্র গৌরী একজন পরিবেশসচেতন তরুণী। পর্দার চরিত্র আর বাস্তবের অহিল্যার মধ্যে যেন সেখানেই একটা অদ্ভুত মিল।
বাস্তব জীবনেও পরিবেশ, সমাজ এবং তরুণ প্রজন্মের সমস্যা নিয়ে বারবার মুখ খুলেছেন তিনি। নিট পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে দেশজুড়ে যখন ছাত্র আন্দোলন তীব্র হয়েছিল, তখন প্রতিবাদকারীদের পাশে দাঁড়ানো বিনোদন জগতের অল্প কয়েক জন মুখের মধ্যে ছিলেন অহিল্যা। পরীক্ষাব্যবস্থায় জবাবদিহির দাবি থেকে শুরু করে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতেও সরব হয়েছিলেন আন্দোলনকারীরা। অহিল্যাও তাঁদের সঙ্গে প্রতিবাদে অংশ নেন।
কিন্তু সদ্য আত্মপ্রকাশ করা একজন অভিনেত্রী কেন এমন স্পর্শকাতর বিষয়ে প্রকাশ্যে অবস্থান নেবেন?
অহিল্যার কাছে উত্তরটা খুব সহজ। তাঁর বেড়ে ওঠার মধ্যেই রয়েছে এর ব্যাখ্যা। তাঁকে এমন ভাবে বড় করা হয়েছে, যাতে নিজের পরিচয়কে শুধু কোনও পেশা দিয়ে সংজ্ঞায়িত না করেন। দেশের মানুষ, তরুণ প্রজন্ম এবং তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করা তাঁর কাছে ব্যক্তিগত দায়িত্বের মতো। তাই কোনও বিষয় গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে সে বিষয়ে নিজের মত প্রকাশ করতেই তিনি স্বচ্ছন্দ।
অরোভিলের ইয়ুথ সেন্টার বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিতর্কেও একই অবস্থান নিয়েছিলেন অহিল্যা। যে অরোভিলের প্রকৃতি, আধ্যাত্মিকতা এবং সামাজিক পরিবেশের মধ্যে তাঁর শৈশব-কৈশোর কেটেছে, সেখানকার তরুণদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিসর বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি তাঁকে স্বাভাবিক ভাবেই নাড়া দিয়েছিল। নিজের পরিচিত জায়গার সমস্যা বলে চুপ না থেকে সেটিকে বৃহত্তর সামাজিক প্রশ্ন হিসেবেই দেখেছেন তিনি।
অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ক্ষেত্রে বিতর্ক এড়িয়ে চলাকে অনেক সময় ‘নিরাপদ কৌশল’ বলে মনে করা হয়। বিশেষ করে ক্যারিয়ারের শুরুতেই কোনও রাজনৈতিক বা সামাজিক বিষয়ে অবস্থান নিলে তার প্রভাব ভবিষ্যতে পড়তে পারে—এই আশঙ্কাও থাকে। কিন্তু অহিল্যা সেই পথ বেছে নিতে নারাজ।
তাঁর কাছে মানুষের সমস্যা নিয়ে কথা বলা কোনও পেশার পরিপন্থী নয়। বরং একজন শিল্পী হিসেবে সমাজের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কেরই অংশ।
আর এখানেই সিং গীতম-এর গৌরীর সঙ্গে বাস্তবের অহিল্যার মিলটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পর্দায় পরিবেশসচেতন এক তরুণীর চরিত্রে অভিনয় করছেন তিনি, আর পর্দার বাইরে নিজের বিশ্বাস ও সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নে সরব হচ্ছেন।
অভিনয় তাঁর পেশা হতে পারে, কিন্তু মানুষ হিসেবে তাঁর অবস্থানটাই যে আগে—অহিল্যার কথায় সেই বার্তাই বারবার ফিরে আসে।