ছ’সপ্তাহেই ফুরিয়ে যাবে বিমানের জ্বালানি: হরমুজ সংকটে ইউরোপ জুড়ে উড়ান বাতিলের আশঙ্কা

যা জানা জরুরি
- বাংলাস্ফিয়ার: বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে।
- মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে ক্রমাগত উত্তেজনা এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল স্থবির হয়ে পড়ায় এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে বিশ্ব অর্থনীতি।
- আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (IEA) এক ভয়াবহ সতর্কবার্তায় জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে আগামী ছ’সপ্তাহের মধ্যেই ইউরোপের প্রধান বিমানবন্দরগুলোর জেট ফুয়েলের ভাণ্ডার সম্পূর্ণ শূন্য হয়ে…
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বাংলাস্ফিয়ার: বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে ক্রমাগত উত্তেজনা এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল স্থবির হয়ে পড়ায় এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে বিশ্ব অর্থনীতি। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (IEA) এক ভয়াবহ সতর্কবার্তায় জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে আগামী ছ’সপ্তাহের মধ্যেই ইউরোপের প্রধান বিমানবন্দরগুলোর জেট ফুয়েলের ভাণ্ডার সম্পূর্ণ শূন্য হয়ে যেতে পারে।
আইইএ-র প্রধান ফাতিহ বিরোল সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালীর এই অচলাবস্থা ইতিহাসের বৃহত্তম জ্বালানি বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর ফলে কেবল আকাশপথ নয়, বরং পেট্রল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ পরিষেবার আকাশছোঁয়া দাম সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস তুলবে। বিশেষত বিশ্বের নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চল এই সংকটে অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি বিপর্যস্ত হবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
হরমুজ সংকট: ইউরোপের আকাশে দুর্যোগের ঘনঘটা
বিশ্বের মোট খনিজ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (LNG) প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয় হরমুজ প্রণালী দিয়ে। ইরান, আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের মধ্যে সামরিক সংঘাতের জেরে গত সাত সপ্তাহ ধরে এই পথটি কার্যত অবরুদ্ধ। ইউরোপের বিমান পরিষেবা সংস্থাগুলো তাদের প্রয়োজনীয় জেট ফুয়েলের প্রায় ৭৫ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। ফলে এই পথ বন্ধ হওয়ায় ইউরোপীয় বিমানবন্দরগুলো এখন চরম অস্তিত্ব সংকটে।
একাধিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যেই তারা জ্বালানি সংকটের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে যাবে। বিরোলের মতে, ইউরোপের রিফাইনারিগুলো বর্তমানে তাদের সর্বোচ্চ উৎপাদন ক্ষমতা ব্যবহার করলেও চাহিদার তুলনায় তা একেবারেই নগণ্য। গত ১৮ মার্চ ইউরোপীয় বাজারে জেট ফুয়েলের দাম রেকর্ড ছাড়িয়ে প্রতি টনে ১,৮০০ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে।
চাপে বিমান সংস্থাগুলো: অনিশ্চয়তায় গ্রীষ্মকালীন পর্যটন
জার্মান বিমান সংস্থা লুফথান্সার প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা গ্রাৎসিয়া ভিট্টাডিনি জানিয়েছেন, জ্বালানি সরবরাহকারীরা এখন আর এক মাসের বেশি কোনো দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা দিতে পারছেন না। তীব্র জ্বালানি সংকট ও শ্রমিক ধর্মঘটের জোড়া ফলায় বিদ্ধ হয়ে লুফথান্সা তাদের আঞ্চলিক শাখা ‘সিটিলাইন’ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
একই চিত্র ব্রিটিশ বাজেট এয়ারলাইন ইজ়িজেট-এর ক্ষেত্রেও। সংস্থাটি জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার কারণে গত মার্চ মাসেই তাদের অতিরিক্ত ২ কোটি ৫০ লক্ষ পাউন্ড জ্বালানি খরচ করতে হয়েছে। গত বছরের তুলনায় এই গ্রীষ্মের আগাম টিকিট বিক্রিও প্রায় ২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা পর্যটন শিল্পের জন্য বড় ধাক্কা।
বিপন্ন এশিয়ার বাজার: ভারত ও চিনে হাহাকার
আইইএ প্রধানের মতে, এই সংকটের ‘প্রথম সারিতে’ রয়েছে এশিয়া। ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী তেলের প্রায় ৭০ শতাংশের গন্তব্য ছিল চিন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো।
ভারতে এই সংকটের আঁচ ইতিমধ্যেই লেগেছে। রান্নার গ্যাসের অভাবে মুম্বইয়ের বহু রেস্তোরাঁ ও হোটেল গত মার্চ থেকেই আংশিক বা পূর্ণ সময়ের জন্য বন্ধ রাখতে হচ্ছে। গ্যাসের অপ্রতুলতায় উৎপাদন থমকে গেছে গুজরাটের বিখ্যাত সিরামিক শিল্পে। ফাতিহ বিরোল সতর্ক করেছেন যে, এশিয়ার এই সংকট দ্রুত লয়ে এখন ইউরোপ ও আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ছে।
কূটনৈতিক তৎপরতা ও আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ
সংকট মোকাবিলায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন জরুরি ভিত্তিতে রিফাইনারিগুলোর উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা করছে। ব্রিটেন ইতিমধ্যে ৪০টি দেশের সঙ্গে হরমুজ প্রণালী পুনরায় সচল করার বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে। তবে তাৎপর্যপূর্ণভাবে এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় এখন পর্যন্ত আমেরিকার কোনো অংশগ্রহণ নেই।
আইইএ-র চূড়ান্ত সতর্কবার্তা অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা আমদানির অন্তত ৫০ শতাংশ যদি বিকল্প উৎস থেকে পূরণ করা সম্ভব না হয়, তবে ইউরোপের বিমানবন্দরগুলোতে জ্বালানির বাস্তব ঘাটতি দেখা দেবে। এর ফলে বড় মাপের উড়ান বাতিল করা ছাড়া কর্তৃপক্ষের কাছে আর কোনো পথ খোলা থাকবে না। সব মিলিয়ে, আগামী গ্রীষ্মকালীন ছুটির মরসুম পর্যটকদের কাছে বড় ধরনের দুঃস্বপ্নে পরিণত হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



