Home International রাশিয়ার গভীরে ড্রোন-ধাক্কা

রাশিয়ার গভীরে ড্রোন-ধাক্কা

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
14 views 3 minutes read
A+A-
Reset

রাশিয়ার তাতারস্তানে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং প্রায় ৭৫ জন আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে রুশ প্রশাসন। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার অভিযান শুরুর পর রুশ ভূখণ্ডে ইউক্রেনের অন্যতম প্রাণঘাতী হামলা হিসেবে দেখা হচ্ছে ঘটনাটিকে। তবে হতাহতের সংখ্যাই শুধু আলোচনায় নয়—তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, ইউক্রেনের ড্রোন কি এখন রাশিয়ার আরও গভীরে গিয়ে আঘাত হানতে সক্ষম?

রুশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাতারস্তানের একাধিক এলাকায় ড্রোন হামলায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আহতদের মধ্যে কয়েক জনের অবস্থা গুরুতর। হামলার পরপরই জরুরি পরিষেবা ও নিরাপত্তা বাহিনী ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলিতে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করে।

তাতারস্তানের ভৌগোলিক অবস্থানই ঘটনাটিকে আলাদা গুরুত্ব দিচ্ছে। ইউক্রেন সীমান্ত থেকে বহু দূরে অবস্থিত এই অঞ্চল রাশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকেন্দ্র। তেল শোধন, পেট্রোরসায়ন, বিমান এবং সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনে তাতারস্তানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ফলে সেখানে ড্রোন পৌঁছে ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে পারা রাশিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়েও নতুন প্রশ্ন তুলছে।

সীমান্ত ছাড়িয়ে ইউক্রেনের ড্রোন

যুদ্ধের শুরুতে রাশিয়ার অভ্যন্তরে ইউক্রেনীয় হামলা মূলত সীমান্তবর্তী বেলগোরোদ, কুরস্ক বা ব্রিয়ানস্কের মতো অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ ছিল। সময়ের সঙ্গে সেই ছবিটা বদলেছে। মস্কো থেকে শুরু করে রাশিয়ার বহু দূরের শিল্পাঞ্চল, তেল শোধনাগার, জ্বালানি ডিপো, বিমানঘাঁটি এবং সামরিক স্থাপনাও ইউক্রেনীয় ড্রোনের নিশানায় এসেছে।

কিয়েভের এই কৌশলের পিছনে সামরিক যুক্তি স্পষ্ট। ইউক্রেনের বক্তব্য, রাশিয়া যে পরিকাঠামো ব্যবহার করে ইউক্রেনের উপর হামলা চালাচ্ছে, তা যুদ্ধের বাইরে থাকা কোনও নিরাপদ অঞ্চল নয়। রাশিয়ার ভূখণ্ডের সামরিক ও যুদ্ধ-সহায়ক পরিকাঠামোকে আঘাত করতে পারলে মস্কোর হামলার ক্ষমতা দুর্বল করা সম্ভব—এটাই কিয়েভের হিসাব।

অন্যদিকে, এই কৌশলের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হল অসামরিক হতাহতের সম্ভাবনা। তাতারস্তানের ঘটনায় নিহতদের মধ্যে সাধারণ মানুষ থাকলে হামলার লক্ষ্যবস্তু, বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে অভিযান পরিচালিত হয়েছিল কি না—এই প্রশ্ন সামনে আসবেই।

রাশিয়া এর আগেও ইউক্রেনের বিরুদ্ধে অসামরিক এলাকা ইচ্ছাকৃত ভাবে নিশানা করার অভিযোগ তুলেছে। কিয়েভ অবশ্য বারবার দাবি করেছে, তাদের দূরপাল্লার হামলার প্রধান লক্ষ্য রাশিয়ার সামরিক এবং যুদ্ধ-সহায়ক পরিকাঠামো।

এ বার মস্কোর পালা?

হামলার পর মস্কোর প্রতিক্রিয়ার দিকেই এখন নজর। অতীতে রুশ ভূখণ্ডে বড় ইউক্রেনীয় হামলার পরে রাশিয়া ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।

তাই তাতারস্তানের ঘটনার পরও পাল্টা আঘাতের আশঙ্কা বাড়ছে। ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, সামরিক ঘাঁটি এবং অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রগুলিকে লক্ষ্য করে নতুন হামলা হতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।

একই সঙ্গে চাপে পড়বে রাশিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও। বিশ্বের সবচেয়ে বড় দেশগুলির একটির বিশাল ভূখণ্ডের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও সামরিক স্থাপনাকে একই সঙ্গে সুরক্ষিত রাখা অত্যন্ত কঠিন। ইউক্রেন যদি একসঙ্গে বহু দিক থেকে তুলনামূলক কম খরচের ড্রোন পাঠাতে পারে, তা হলে রুশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ছড়িয়ে দিতে বাধ্য করা সম্ভব। আর সেই ফাঁকেই কিছু ড্রোন লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছে যেতে পারে।

বদলে যাচ্ছে যুদ্ধের মানচিত্র

ড্রোন প্রযুক্তির দ্রুত উন্নতি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের চরিত্রই বদলে দিয়েছে। প্রচলিত যুদ্ধবিমান বা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় অনেক কম খরচে তৈরি ড্রোন এখন কয়েকশো, এমনকি হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে পাঠানো সম্ভব।

ফলে যুদ্ধের ‘সম্মুখরেখা’ আর শুধু দুই দেশের সীমান্ত বা যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যে আটকে নেই। রাশিয়ার গভীরে অবস্থিত শিল্পাঞ্চল, জ্বালানি কেন্দ্র এবং সামরিক পরিকাঠামোও ক্রমশ সংঘাতের সরাসরি অংশ হয়ে উঠছে।

তাতারস্তানের হামলা সেই পরিবর্তনেরই বড় উদাহরণ। অন্তত ১৩ জনের মৃত্যু এবং প্রায় ৭৫ জনের আহত হওয়ার রুশ দাবি সত্য হলে, এটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ড্রোন হামলা নয়। বরং এর মাধ্যমে আরও এক বার স্পষ্ট হল—যুদ্ধের ভৌগোলিক সীমা ক্রমশ সরে যাচ্ছে।

এখন প্রশ্ন, মস্কো কতটা বড় পাল্টা আঘাত হানবে এবং কিয়েভ তার পর আরও কতটা গভীরে যেতে চাইবে। সেই পাল্টাপাল্টি যদি আরও তীব্র হয়, তা হলে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পরবর্তী অধ্যায় আরও দীর্ঘ, আরও বিস্তৃত এবং আরও রক্তাক্ত হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles