বাংলাস্ফিয়ার: ভারতের মহিলা কুস্তিগিরদের যৌন হেনস্থার অভিযোগে প্রাক্তন রেসলিং ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ার (ডব্লিউএফআই) সভাপতি ব্রিজভূষণ শরণ সিংকে খালাস করার কারণ বিস্তারিত ভাবে ব্যাখ্যা করল দিল্লি আদালত। রাউস অ্যাভিনিউ আদালতের বক্তব্য, অভিযোগকারীদের বয়ানে ঘটনা ঘটার সময়, স্থান এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ক্ষেত্রে এমন একাধিক অসঙ্গতি রয়েছে, যা প্রসিকিউশনের মামলার ভিত্তিকেই দুর্বল করেছে। আদালত বলেছে, কোনও অভিযোগকারী যদি ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ‘ভুল’ বা ‘incorrect’ তথ্য দেন, তা বিচারপর্বে মামলার পক্ষে ‘fatal’ বা মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে।
গত ৩ অগস্ট ব্রিজভূষণ এবং ডব্লিউএফআইয়ের প্রাক্তন সহকারী সচিব বিনোদ তোমরকে সমস্ত অভিযোগ থেকে খালাস করেন অতিরিক্ত মুখ্য বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট অশ্বিনী পানওয়ার। ছয় মহিলা কুস্তিগিরের অভিযোগের ভিত্তিতে মামলাটি হয়েছিল। ২০২৩ সালে দিল্লির যন্তর মন্তরে দেশের প্রথম সারির কুস্তিগিরদের দীর্ঘ আন্দোলনের পরে এই মামলা জাতীয় রাজনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়।
বয়ানের অসঙ্গতিই আদালতের নজরে
বিচারের সময় অভিযোগকারীদের বক্তব্যের সঙ্গে তাঁদের আগের বয়ান এবং অন্যান্য সাক্ষ্যপ্রমাণ মিলিয়ে দেখে আদালত। মূল প্রশ্ন ছিল—যে দিন এবং যে জায়গায় যৌন হেনস্থার ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছিল, সেই সময় ব্রিজভূষণ সেখানে ছিলেন কি না এবং ঘটনাগুলির বর্ণনা অন্যান্য প্রমাণের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কি না।
বিচারের শেষ পর্যায়েও ব্রিজভূষণের আইনজীবীরা যুক্তি দিয়েছিলেন, অভিযোগকারীরা একাধিক বার তাঁদের বক্তব্য পরিবর্তন করেছেন। কোনও ক্ষেত্রে অভিযোগের স্থান বদলেছে, কোনও ক্ষেত্রে বদলেছে ঘটনার তারিখ। এমন অভিযোগও ছিল যেখানে প্রতিরক্ষার দাবি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সময়ে ব্রিজভূষণ ওই জায়গাতেই উপস্থিত ছিলেন না। অন্য দিকে সরকারি কৌঁসুলি দাবি করেছিলেন, মূল অভিযোগের ক্ষেত্রে কুস্তিগিরদের বক্তব্য ধারাবাহিক ছিল এবং অন্য সাক্ষীদের বক্তব্যেও তার সমর্থন পাওয়া যায়।
শেষ পর্যন্ত আদালত প্রতিরক্ষার যুক্তির বড় অংশ গ্রহণ করেছে। আদালতের মতে, যৌন হেনস্থার মতো মামলায় প্রত্যক্ষ প্রমাণ সব সময় পাওয়া সম্ভব নয় এবং নির্যাতিতার বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্যই দোষী সাব্যস্ত করার জন্য যথেষ্ট হতে পারে। কিন্তু সেই সাক্ষ্য যদি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ক্ষেত্রে পরস্পরবিরোধী হয়, তবে আদালতকে সতর্কতার সঙ্গে তা যাচাই করতে হয়।
‘রিহার্সড, ওয়েল-প্র্যাকটিসড, প্ল্যান্টেড’
রায়ের আরও তাৎপর্যপূর্ণ অংশে আদালত অভিযোগগুলির প্রকৃতি নিয়েও কঠোর মন্তব্য করেছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মামলার সামগ্রিক সাক্ষ্যপ্রমাণ দেখে কিছু অভিযোগ ‘rehearsed, well-practised and planted’ বলে মনে হয়েছে। অভিযোগের পিছনে বৃহত্তর ষড়যন্ত্র এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের সম্ভাবনার কথাও রায়ে এসেছে।
এই পর্যবেক্ষণই রায়টিকে শুধু প্রমাণের অভাবে খালাসের মামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি। ব্রিজভূষণও রায়ের পরে দাবি করেছেন, আদালতের পর্যবেক্ষণে অভিযোগকারীদের একটি নির্দিষ্ট আখড়া এবং রাজনৈতিক যোগাযোগের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। তিনি ফের দাবি করেছেন, গোটা আন্দোলনের পিছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল। তবে এটি ব্রিজভূষণের দাবি; অভিযোগকারী কুস্তিগিররা তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তিন বছর ধরে চলেছে মামলা
২০২৩ সালের জুনে দিল্লি পুলিশ ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থা, মহিলার শ্লীলতাহানির উদ্দেশ্যে বলপ্রয়োগ এবং ভয় দেখানোর অভিযোগ আনা হয়। ২০২৪ সালের মে মাসে আদালত ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৫৪, ৩৫৪এ এবং ৫০৬(১) ধারায় অভিযোগ গঠন করে। বিচার শুরু হয় ওই বছরের জুলাইয়ে।
প্রাথমিক ভাবে সাক্ষীর তালিকায় ৪৩ জনের নাম থাকলেও পরে কয়েক জনকে বাদ দেওয়া হয়। বিচারপর্বে ছয় অভিযোগকারী-সহ বহু সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। দীর্ঘ শুনানির পরে গত ২ জুলাই রায় সংরক্ষিত রেখেছিল আদালত। ৩ অগস্ট ব্রিজভূষণ এবং বিনোদ তোমরকে খালাস করা হয়।
এর আগেই এক নাবালিকা কুস্তিগিরের অভিযোগে ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে পকসো আইনে দায়ের হওয়া পৃথক মামলাটিও বন্ধ হয়ে যায়। নাবালিকার অভিযোগ প্রত্যাহারের পরে দিল্লি পুলিশের ক্লোজার রিপোর্ট ২০২৫ সালের মে মাসে আদালত গ্রহণ করেছিল।
উচ্চ আদালতে যাবেন কুস্তিগিররা
তবে এই রায়ের সঙ্গে আইনি লড়াই শেষ হচ্ছে না। কুস্তিগির বিনেশ ফোগাট জানিয়েছেন, তাঁরা আশা হারাননি এবং খালাসের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাবেন। তাঁর বক্তব্য, আন্দোলন এবং আইনি লড়াই দুটিই ন্যায়বিচারের দাবিতে হয়েছিল এবং সেই লড়াই চলবে।
ফলে ব্রিজভূষণের খালাস আপাতত বিচারিক ভাবে বড় স্বস্তি হলেও মামলা এখানেই চূড়ান্ত ভাবে শেষ হয়ে গেল—এ কথা বলা যাচ্ছে না। উচ্চ আদালতে আবেদন হলে বিচার হবে নিম্ন আদালত সাক্ষ্যপ্রমাণের অসঙ্গতিগুলিকে যে গুরুত্ব দিয়েছে, তা আইনসঙ্গত ছিল কি না এবং অভিযোগকারীদের সাক্ষ্যের মূল্যায়নে কোনও ত্রুটি হয়েছে কি না।
তবে বর্তমান রায়ের মূল বক্তব্য স্পষ্ট—ফৌজদারি মামলায় অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, দোষ প্রমাণের মানদণ্ড বদলে যায় না। অভিযোগের সময়, স্থান ও পরিস্থিতির মতো মৌলিক বিষয়ে বারবার অসঙ্গতি তৈরি হলে এবং সেই অসঙ্গতির সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না পাওয়া গেলে তার সুবিধা অভিযুক্তই পাবেন। ব্রিজভূষণ মামলায় সেই নীতিই প্রয়োগ করে তাঁকে সন্দেহের ঊর্ধ্বে দোষী প্রমাণ করা যায়নি বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে দিল্লির আদালত।