বাংলাস্ফিয়ার: কলম্বিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে শক্তিশালী ভূমিকম্পে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসের ঘটনা ঘটেছে। সোমবার, ১০ অগস্ট ৭.৪ মাত্রার ভূমিকম্পে অন্তত ১১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন বহু মানুষ। বিভিন্ন শহরে বাড়িঘর ভেঙে পড়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাস্তা ও অন্যান্য পরিকাঠামো। ধ্বংসস্তূপের নীচে এখনও মানুষ আটকে থাকার আশঙ্কায় উদ্ধারকাজ চলছে। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিল পশ্চিম কলম্বিয়ার চোকো অঞ্চলের সান হোসে দেল পালমার এলাকায়। রাজধানী বোগোতা থেকে জায়গাটি প্রায় ৪০০ কিলোমিটার পশ্চিমে। কম্পনের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে কেন্দ্রস্থল থেকে কয়েকশো কিলোমিটার দূরের শহরেও তা অনুভূত হয়। কালি, পেরেইরা, কুইবদো এবং মানিসালেসের মতো শহরে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর এসেছে।
প্রথম দিকে হতাহতের সংখ্যা তুলনামূলক কম বলে জানানো হয়েছিল। কিন্তু উদ্ধারকারীরা একের পর এক ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট হতে থাকে। পরে মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ১১১-তে পৌঁছেছে। আহতের সংখ্যাও কয়েক ডজন। উদ্ধারকর্মীরা ভেঙে পড়া বাড়ির ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের খুঁজছেন।
সবচেয়ে বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে প্রত্যন্ত চোকো অঞ্চলে। পাহাড়, ঘন জঙ্গল এবং দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে বহু জায়গায় উদ্ধারকারী দল এখনও সহজে পৌঁছতে পারছে না। ভূমিকম্পের পরে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতির সম্পূর্ণ হিসাব পাওয়াও কঠিন হয়ে উঠেছে।
প্রাথমিক হিসাবে ১,৬০০টিরও বেশি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অন্তত ৬১টি বাড়ি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। দেশের তৃতীয় বৃহত্তম শহর কালিতেও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পেরেইরা ও অন্যান্য শহরে বহু মানুষ বাড়ি ছেড়ে খোলা জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন। মূল ভূমিকম্পের পরে পরাঘাতের আশঙ্কা থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িতে ফিরে যেতেও অনেকেই ভয় পাচ্ছেন।
দেশের প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন, যাতে উদ্ধার ও ত্রাণের জন্য দ্রুত সরকারি সম্পদ ব্যবহার করা যায়। তাঁর সরকার মাত্র কয়েক দিন আগেই দায়িত্ব নিয়েছে। ফলে নতুন সরকারের সামনে এটিই প্রথম বড় জাতীয় বিপর্যয়। প্রশাসন জানিয়েছে, উদ্ধার, চিকিৎসা এবং আশ্রয়ের ব্যবস্থা করাই এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
আন্তর্জাতিক সাহায্যও আসতে শুরু করেছে। বিভিন্ন দেশ উদ্ধার ও ত্রাণে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ১ কোটি ৫৫ লক্ষ ডলারের সহায়তার কথা জানিয়েছে। এল সালভাদর, মেক্সিকো এবং চিলিও সাহায্যের প্রস্তাব দিয়েছে।
এই বিপর্যয় আবারও সামনে এনেছে কলম্বিয়ার ভৌগোলিক ঝুঁকির প্রশ্ন। দেশটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’-এর প্রভাবিত অঞ্চলে অবস্থিত। পৃথিবীর এই বিস্তীর্ণ বলয়ে একাধিক ভূত্বকীয় পাতের সংঘাতের কারণে ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের প্রবণতা অত্যন্ত বেশি। সেই কারণেই কলম্বিয়ায় ছোট-বড় ভূমিকম্প নতুন ঘটনা নয়।
তবে সোমবারের ভূমিকম্পটির গুরুত্ব অন্য জায়গায়। এটি একবিংশ শতাব্দীতে কলম্বিয়ায় নথিভুক্ত সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প বলে জানানো হয়েছে। ফলে শুধু তাৎক্ষণিক উদ্ধার নয়, দেশের বাড়িঘর ও পরিকাঠামোর ভূমিকম্প-সহনক্ষমতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
কলম্বিয়ার ইতিহাসে ভূমিকম্পের ভয়াবহ নজির রয়েছে। বিশেষ করে ১৯৯৯ সালের আর্মেনিয়া ভূমিকম্প দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়। সেই ভূমিকম্পে ব্যাপক প্রাণহানি হয়েছিল এবং হাজার হাজার বাড়ি ধ্বংস হয়েছিল। তার পরে নির্মাণবিধি ও বিপর্যয় মোকাবিলা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হলেও দেশের দরিদ্র ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে দুর্বল নির্মাণ এখনও বড় ঝুঁকি।
বর্তমান বিপর্যয় সেই বৈষম্যকেও সামনে এনেছে। বড় শহরের তুলনায় প্রত্যন্ত অঞ্চলে উদ্ধারকারী বাহিনী পৌঁছতে বেশি সময় লাগছে, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কাও বেশি। ফলে একই মাত্রার ভূমিকম্পের অভিঘাত দরিদ্র ও দুর্গম এলাকায় অনেক বেশি প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ের বিরুদ্ধে উদ্ধারকারীদের লড়াই। ধ্বংসস্তূপের নীচে আটকে থাকা মানুষকে যত দ্রুত উদ্ধার করা সম্ভব হবে, প্রাণহানি তত কমানো যাবে। একই সঙ্গে পরাঘাতে আরও বাড়ি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা থাকায় উদ্ধারকারী ও সাধারণ মানুষ—দু’পক্ষকেই সতর্ক থাকতে হচ্ছে।