বয়স বাড়লে হাঁটতে গিয়ে হাঁপ ধরে, সিঁড়ি ভাঙতে কষ্ট হয়, আগের মতো কাজ করার শক্তি থাকে না—এসবকেই অনেক সময় স্বাভাবিক বার্ধক্যের লক্ষণ বলে ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু শ্বাসকষ্ট, ক্লান্তি এবং ধীরে ধীরে দৈনন্দিন কাজকর্ম কমিয়ে দেওয়ার পিছনে থাকতে পারে হৃদ্যন্ত্রের ভাল্ভের রোগ। তাই লক্ষণগুলি সময়মতো চিনতে পারা অত্যন্ত জরুরি।
এখন বহু পরিবারেই বাবা-মাকে নিয়মিত রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করতে বলা হয়। রক্তচাপ মাপা, কোলেস্টেরলের ওষুধ ঠিকমতো খাওয়া, হাড়ের ঘনত্ব ও চোখ পরীক্ষা কিংবা বয়স অনুযায়ী প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যপরীক্ষার কথাও মনে করিয়ে দেওয়া হয়। স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত হাঁটা, পর্যাপ্ত ঘুম, এমনকি স্মৃতিশক্তি ভাল রাখাও এখন পারিবারিক আলোচনার অংশ। অর্থাৎ প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যচর্চা অনেকটাই চিকিৎসকের চেম্বারের বাইরে এসে পরিবারের দৈনন্দিন জীবনে জায়গা করে নিয়েছে।
কিন্তু এই ধরনের স্বাস্থ্যসচেতনতার বড় অংশই রক্তপরীক্ষা, বিভিন্ন শারীরিক মাপ এবং রোগনির্ণয়ের পরীক্ষার ফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। অথচ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন প্রায়ই বাদ পড়ে যায়—বয়স্ক মানুষটি কি এখনও তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ দৈনন্দিন কাজগুলি আগের মতো করতে পারছেন?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সুস্থ বার্ধক্যকে এমন একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখে, যেখানে বেশি বয়সেও ভাল থাকার জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্ষমতা গড়ে তোলা এবং বজায় রাখা সম্ভব হয়। এই স্বাধীনতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ হৃদ্যন্ত্র নিয়ে আলোচনায় সাধারণত কোলেস্টেরল, রক্তচাপ এবং ধমনিতে রক্ত চলাচলের বাধার কথাই বেশি উঠে আসে। তুলনায় অনেক কম গুরুত্ব পায় হৃদ্যন্ত্রের ভাল্ভ।
একজন মানুষের গড় আয়ুষ্কালে হৃদ্যন্ত্র প্রায় ২৫০ কোটি বার স্পন্দিত হয়। অবিরাম রক্ত পৌঁছে দেয় শরীরের প্রতিটি অঙ্গ এবং কোষে। দু’টি মুঠো করা হাতের সমান আকারের এই অঙ্গটির মধ্যে রয়েছে চারটি ভাল্ভ। প্রতিটি হৃদ্স্পন্দনের সঙ্গে সেগুলি খোলে এবং বন্ধ হয়, যাতে রক্ত সঠিক দিকে প্রবাহিত হতে পারে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ভাল্ভগুলি পুরু, শক্ত অথবা সংকীর্ণ হয়ে যেতে পারে। ভাল্ভের সবচেয়ে সাধারণ এবং গুরুতর রোগগুলির একটি হল ‘অ্যাওর্টিক স্টেনোসিস’। এই অবস্থায় অ্যাওর্টিক ভাল্ভ সংকীর্ণ হয়ে যাওয়ায় হৃদ্যন্ত্র থেকে শরীরের বাকি অংশে রক্ত পাঠানো কঠিন হয়ে পড়ে। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের মতে, এটি হৃদ্যন্ত্রের ভাল্ভের সবচেয়ে সাধারণ এবং সম্ভাব্য গুরুতর রোগগুলির অন্যতম।
বার্ধক্য ভেবে যে লক্ষণগুলি উপেক্ষিত হয়
সমস্যা হল, হৃদ্যন্ত্রের ভাল্ভের অসুখ সাধারণত খুব ধীরে ধীরে তৈরি হয়। তাই দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হওয়ার আগে পর্যন্ত বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রেই সুস্থ বার্ধক্য সংক্রান্ত আলোচনায় জায়গা পায় না।
আমেরিকার ন্যাশনাল হার্ট, লাং অ্যান্ড ব্লাড ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, এর লক্ষণের মধ্যে থাকতে পারে ক্লান্তি, শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, মাথা ঘোরা কিংবা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।
কিন্তু সমস্যাটি শুধুমাত্র চিকিৎসাবিজ্ঞানের নয়, সামাজিক অভ্যাসেরও। অনেক প্রবীণ মানুষ বুঝতেই পারেন না যে তাঁদের কর্মক্ষমতা ক্রমশ কমছে। তাঁরা অজান্তেই নিজেদের জীবনযাত্রা বদলে ফেলেন। আগের তুলনায় কম হাঁটেন, সিঁড়ি এড়িয়ে চলেন, শারীরিক পরিশ্রম কমিয়ে দেন কিংবা ঘন ঘন বিশ্রাম নেন।
পরিবারের সদস্যরাও পরিবর্তনগুলি লক্ষ করেন। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সেগুলিকে বয়স বাড়ার স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবেই দেখা হয়। অথচ শ্বাসপ্রশ্বাস, সহনশক্তি কিংবা দৈনন্দিন কাজ করার আত্মবিশ্বাস কমতে শুরু করলে তার পিছনে হৃদ্যন্ত্রের কোনও অসুখ রয়েছে কি না, তা দেখা প্রয়োজন।
সাধারণ পরীক্ষাতেই মিলতে পারে প্রথম সূত্র
অনেক সময় নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষার সময়ই প্রথম সন্দেহ তৈরি হয়। চিকিৎসক স্টেথোস্কোপে হৃদ্যন্ত্রের অস্বাভাবিক শব্দ বা ‘হার্ট মার্মার’ শুনতে পারেন। অসুস্থ ভাল্ভের মধ্যে দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হওয়ার সময় সৃষ্ট অস্বাভাবিক প্রবাহ থেকেই এই শব্দ তৈরি হয়।
এর পরে ইকোকার্ডিয়োগ্রাম করা হতে পারে। এটি হৃদ্যন্ত্রের ব্যথাহীন অতিশব্দ পরীক্ষা। এর মাধ্যমে দেখা যায়, ভাল্ভগুলি ঠিকমতো খুলছে ও বন্ধ হচ্ছে কি না এবং হৃদ্যন্ত্র কতটা কার্যকর ভাবে কাজ করছে।
রোগ দ্রুত ধরা পড়লে রোগী এবং তাঁর পরিবার অনেকটা সময় পান। রোগটি কী অবস্থায় রয়েছে, কত দ্রুত বাড়ছে এবং কখন চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে—এসব বোঝা যায়। উপসর্গ অত্যন্ত গুরুতর হয়ে ওঠার আগেই চিকিৎসার সম্ভাব্য পথগুলি নিয়েও আলোচনা করা সম্ভব হয়।
চিকিৎসায় এসেছে বড় পরিবর্তন
গত এক দশকে গুরুতর অ্যাওর্টিক স্টেনোসিসের চিকিৎসায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। নির্বাচিত কিছু রোগীর ক্ষেত্রে ‘ট্রান্সক্যাথেটার অ্যাওর্টিক ভাল্ভ রিপ্লেসমেন্ট’ বা টিএভিআর করা সম্ভব।
এটি তুলনামূলক ভাবে কম কাটাছেঁড়ার চিকিৎসাপদ্ধতি। সাধারণত পায়ের রক্তনালির মধ্যে দিয়ে একটি সরু নল প্রবেশ করিয়ে তার সাহায্যে নতুন ভাল্ভ হৃদ্যন্ত্রে পৌঁছে দেওয়া হয়। ফলে প্রচলিত পদ্ধতিতে বুক খুলে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয় না।
তবে ভাল্ভের রোগের চিকিৎসায় সবার জন্য একই পদ্ধতি প্রযোজ্য নয়। রোগ কতটা গুরুতর, কী ধরনের উপসর্গ রয়েছে, ভাল্ভের গঠন, রোগীর বয়স, সামগ্রিক স্বাস্থ্য, শারীরিক দুর্বলতা, চিকিৎসার পরে প্রত্যাশিত জীবনযাত্রার মান, রোগীর নিজস্ব প্রত্যাশা এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা পরিকল্পনা—সব কিছু বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
চিকিৎসার পরেও নজরদারি জরুরি
ভাল্ভে কোনও চিকিৎসা বা প্রতিস্থাপনের পরেও দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, নির্ধারিত ওষুধ ঠিকমতো খাওয়া, রক্তচাপ ও ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং দাঁত ও মুখের পরিচ্ছন্নতার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।
শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেলে, বুকে অস্বস্তি হলে, মাথা ঘুরলে, অজ্ঞান হয়ে গেলে, জ্বর এলে অথবা হঠাৎ দৈনন্দিন কাজ করার শক্তি উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে গেলে দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা দরকার।
সুস্থ ভাবে বয়স বাড়ানোর প্রসঙ্গে আমরা অনেক প্রশ্ন করি—হাড় কতটা শক্ত? ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণে রয়েছে কি? স্মৃতিশক্তি কেমন? হৃদ্যন্ত্র সুস্থ তো?
এই তালিকায় আরও একটি প্রশ্ন যোগ করা প্রয়োজন—হৃদ্যন্ত্রের ভাল্ভগুলি কতটা সুস্থ?
নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা, হাঁটা বা দৈনন্দিন কাজে সহনশক্তির পরিবর্তনের দিকে নজর রাখা, অস্বাভাবিক শ্বাসকষ্টকে নিছক বয়সের ফল বলে উড়িয়ে না দেওয়া, প্রয়োজনমতো চিকিৎসকের পরামর্শ এবং ইকোকার্ডিয়োগ্রাম—এই কয়েকটি পদক্ষেপই অনেক ক্ষেত্রে একজন প্রবীণ মানুষের চলাফেরার ক্ষমতা, স্বাধীনতা এবং জীবনযাত্রার মান দীর্ঘদিন বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে।
সুস্থ বার্ধক্যের আলোচনায় তাই হৃদ্যন্ত্রের ভাল্ভের স্বাস্থ্যকেও সমান গুরুত্ব দেওয়ার সময় এসেছে।