শপথ নিয়েই মাদক-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ বার্তা, প্রশাসন ছোট করা ও অর্থনীতিতে কাঁচি চালানোর প্রতিশ্রুতি নতুন প্রেসিডেন্টের
কলম্বিয়ার নতুন দক্ষিণপন্থী প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলার সরকারকে ১০০ কোটি ডলারের নিরাপত্তা সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। শুক্রবার দে লা এসপ্রিয়েলা প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মার্কিন বিদেশ দফতর এই ঘোষণা করে।
অন্য দিকে, দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম ভাষণেই দেশের মাদক পাচারকারী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অভিযান চালানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন নতুন প্রেসিডেন্ট। পাশাপাশি অর্থনীতিতে আস্থা ফেরাতে কঠোর ব্যয়সঙ্কোচেরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
৪৮ বছর বয়সি দে লা এসপ্রিয়েলা জুনে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় দফার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হন। নির্বাচনী প্রচারে তাঁর অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, সরকারি প্রশাসনের আয়তন প্রায় ৪০ শতাংশ কমানো এবং দেশের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস শিল্পকে ফের চাঙ্গা করা।
‘এ বার বদলের পালা’
শুক্রবার কালি শহরের পিচিঞ্চা ব্যাটালিয়ন সামরিক ঘাঁটিতে শপথ নেওয়ার পর দে লা এসপ্রিয়েলা বলেন, ‘‘জাতীয় আত্মসমর্পণের একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটাতে আমি এসেছি। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমাদের ভাগ্যের সবচেয়ে গভীর পরিবর্তনের পথে যাত্রা শুরু করতে চাই।’’
প্রায় ৭৫ মিনিটের ভাষণে সেনাবাহিনীর সদস্যদের সামনে দাঁড়িয়ে নতুন প্রেসিডেন্টের বার্তা ছিল স্পষ্ট—‘‘কলম্বিয়ার মানুষের কাছে আমার স্পষ্ট বার্তা—দেশে শৃঙ্খলা, কর্তৃত্ব এবং স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার সময় এসে গিয়েছে।’’
দ্বিতীয় দফার নির্বাচনের আগেই দে লা এসপ্রিয়েলাকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
‘আত্মসমর্পণ করুন, নয়তো…’
ক্ষমতায় এসেই মাদক পাচারকারী এবং সশস্ত্র অপরাধী গোষ্ঠীগুলিকে কড়া বার্তা দিয়েছেন দে লা এসপ্রিয়েলা।
তাঁর কথায়, ‘‘অপরাধী চক্র এবং মাদক-সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর সদস্যদের সামনে দু’টি পথ রয়েছে—আইনের শাসনের কাছে আত্মসমর্পণ করুন, অথবা কলম্বিয়ার রাষ্ট্র এবং তার নিরাপত্তা বাহিনীর দৃঢ় প্রত্যাঘাতের মুখোমুখি হন।’’
সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে শান্তি আলোচনার পথও কার্যত বন্ধ করে দিয়েছেন তিনি। দে লা এসপ্রিয়েলার দাবি, আলোচনার মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠার সুযোগ ‘‘সম্পূর্ণ ভাবে শেষ হয়ে গিয়েছে’’।
ট্রাম্পের ‘১০০ কোটি’
এর পরেই মার্কিন বিদেশ দফতর জানায়, কলম্বিয়ার নতুন সরকারের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও জোরদার করতে প্রস্তুত ওয়াশিংটন।
এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘‘এই পুনর্নবীকৃত অংশীদারিত্বের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের সঙ্গে সমন্বয় করে ১০০ কোটি ডলারের সহায়তা ঘোষণা করতে চায়। প্রেসিডেন্ট দে লা এসপ্রিয়েলার প্রশাসন যাতে আমাদের অভিন্ন লক্ষ্যগুলি অর্জন করতে পারে, তার জন্য এই অর্থ একটি নিরাপত্তা সহায়তা প্যাকেজের অংশ হিসেবে দেওয়া হবে।’’
ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ দে লা এসপ্রিয়েলার সঙ্গে ওয়াশিংটনের এই দ্রুত ঘনিষ্ঠতা তাই নিছক কূটনৈতিক সৌজন্য নয়—কলম্বিয়াকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও মাদকবিরোধী অভিযানে আরও শক্তিশালী অংশীদার হিসেবে দেখতে চাইছে আমেরিকা।
লাতিন আমেরিকায় ডানপন্থার হাওয়া
দে লা এসপ্রিয়েলার জয়কে লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে সাম্প্রতিক দক্ষিণপন্থী মোড়ের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পেরু, আর্জেন্টিনা, চিলে, ইকুয়েডর, বলিভিয়া এবং পানামার মতো দেশে দুর্বল অর্থনীতি ও বাড়তে থাকা অপরাধ ভোটারদের অগ্রাধিকার বদলে দিয়েছে। তার ফলে এক সময় প্রান্তিক বলে বিবেচিত কট্টর দক্ষিণপন্থী প্রার্থীরাও আইনশৃঙ্খলা ফেরানোর কঠোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে উল্লেখযোগ্য জনসমর্থন পাচ্ছেন।
তবে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সব ক’টি বাস্তবায়ন করা নতুন প্রেসিডেন্টের পক্ষে সহজ হবে না বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
প্রেসিডেন্টের কিছু সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক নির্দেশে কার্যকর করা সম্ভব হলেও তাঁর বহু গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনার জন্য বিভক্ত কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন। ফলে সংসদীয় সমঝোতার পথে তাঁর বেশ কিছু প্রস্তাবের কঠোরতা কমতে পারে।
কোকার গাছেও কাঁচি
মাদকবিরোধী অভিযানকে নিজের সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার করেছেন দে লা এসপ্রিয়েলা।
তাঁর ঘোষণা, দেশে বেআইনি মাদক উৎপাদনে ব্যবহৃত ফসলের ‘‘অভিশাপ চিরতরে নির্মূল’’ করা হবে। বিশেষ করে কোকেন তৈরির মূল উপাদান কোকা গাছের চাষ ধ্বংস করতে আকাশপথে আগাছানাশক ছড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তিনি।
নতুন প্রেসিডেন্টের দাবি, এমন আগাছানাশকই ব্যবহার করা হবে, যা মানুষের স্বাস্থ্য বা পরিবেশের ক্ষতি করবে না।
নতুন জোট, নতুন হিসাব
ক্ষমতা গ্রহণের পর তাঁর প্রথম পদক্ষেপগুলির অন্যতম হবে ট্রাম্পের উদ্যোগে গঠিত ‘শিল্ড অব দ্য আমেরিকাস’ কর্মসূচিতে কলম্বিয়ার যোগদান।
শপথগ্রহণের আগেই দে লা এসপ্রিয়েলা স্পেনের রাজা এবং আর্জেন্টিনা, ইকুয়েডর, চিলে, প্যারাগুয়ে ও পানামার প্রেসিডেন্টদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন।
শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোও। মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্লাঞ্চ।
পেত্রোকে নিশানা
দেশে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির শক্তিবৃদ্ধির জন্য প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোকেই দায়ী করেছেন দে লা এসপ্রিয়েলা। পেত্রো এখনও নতুন প্রেসিডেন্টের নির্বাচনী জয়কে স্বীকৃতি দেননি।
দ্বিতীয় দফার ভোটে দে লা এসপ্রিয়েলা অল্প ব্যবধানে পরাজিত করেন বামপন্থী সেনেটর এবং পেত্রোর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ইভান সেপেদাকে।
শুক্রবার সকালে বারানকিয়ায় একটি মিছিলের নেতৃত্ব দেন সেপেদা। সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, দেশের গণতন্ত্র রক্ষায় বিরোধীরা কাজ করে যাবে। একই সঙ্গে সরকারের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ অসহযোগ এবং নাগরিক অবাধ্যতার পথে হাঁটার আহ্বান জানান তিনি।
ফলে শপথের প্রথম দিনেই দে লা এসপ্রিয়েলার সামনে ছবিটা স্পষ্ট—ওয়াশিংটনের সমর্থন রয়েছে, হাতে নিরাপত্তা সহায়তার বড় প্রতিশ্রুতি রয়েছে; কিন্তু দেশের ভিতরে বিরোধিতা এবং কংগ্রেসের সমীকরণ সামলানোই হতে পারে তাঁর প্রথম বড় পরীক্ষা।