ভারতীয় সিনেমার আন্তর্জাতিক যাত্রা গত কয়েক বছরে যেন নতুন গতি পেয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসব ও পুরস্কারের মঞ্চে জায়গা করে নিচ্ছে ভারতীয় ছবি। কেউ আবার প্রবাসী দর্শকের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশের বক্স অফিসেও সাফল্য পাচ্ছে। ‘আরআরআর’, ‘কিল’-এর মতো মূলধারার ছবি থেকে ‘অল উই ইমাজিন অ্যাজ লাইট’, ‘সংস অব ফরগটেন ট্রিজ’-এর মতো স্বাধীন সিনেমা—ভারতীয় গল্প এখন পৌঁছে যাচ্ছে বিশ্বের নানা প্রান্তে।
অভিনেতা পঙ্কজ ত্রিপাঠীর মতে, এই পরিবর্তনের অন্যতম কারণ হল ভারতীয় সিনেমার নিজের শিকড়ে ফিরে আসা। তাঁর মতে, গল্প যত বেশি স্থানীয় জীবন, সংস্কৃতি, ভাষা এবং মানুষের নিজস্ব আবেগ থেকে উঠে আসে, তার আবেদন তত বেশি হয়ে ওঠে বিশ্বজনীন।
হিন্দুস্তান টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দু’বারের জাতীয় পুরস্কারজয়ী অভিনেতা বলেন, “ভারতীয় আবেগের মূল মূল্যবোধ হল সহমর্মিতা।” তাঁর মতে, ভারতের প্রতিটি অঞ্চলেই রয়েছে নিজস্ব উৎসব, সংস্কৃতি এবং জীবনযাপনের ধারা। সেই বৈচিত্র্য যখন কোনও গল্পে প্রামাণিক ভাবে ধরা পড়ে, তখন তার সঙ্গে বিশ্বের অন্য প্রান্তের দর্শকরাও নিজেদের সম্পর্ক খুঁজে পান।
পঙ্কজের মতে, ভারতীয় গল্পের আসল শক্তি এখানেই—নিজের মতো করে বলা গল্পই শেষ পর্যন্ত সবার গল্প হয়ে উঠতে পারে।
শহুরে গল্পের বাইরে
পঙ্কজ মনে করেন, একটা সময় ভারতীয় সিনেমা অনেকটাই শহুরে ও মাল্টিপ্লেক্স-কেন্দ্রিক হয়ে পড়েছিল। মুম্বইয়ে বসে গোটা ভারতকে বোঝার চেষ্টা চলত। ফলে দেশের ছোট শহর, মফস্সল এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের জীবন ও সংস্কৃতির অনেকটাই সিনেমার বাইরে থেকে যেত।
অভিনেতার কথায়, “একটা সময় আমাদের গল্প একটু বেশি শহুরে হয়ে গিয়েছিল। এমন লেখকেরা ছিলেন, যাঁরা মুম্বইয়ে বসে ভারতকে বোঝার চেষ্টা করতেন।”
তবে সেই পরিস্থিতি এখন বদলাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লেখক ও পরিচালকরা উঠে আসছেন। তাঁরা সঙ্গে করে নিয়ে আসছেন নিজেদের শহর, সংস্কৃতি, সাহিত্য এবং মানুষের সঙ্গে কাছ থেকে পরিচিত হওয়ার অভিজ্ঞতা।
পঙ্কজ উদাহরণ হিসেবে অনুরাগ বসু, ইমতিয়াজ আলি এবং তিগমাংশু ধুলিয়ার নাম করেন। তিনি বলেন, “এখন সময় বদলেছে। ভিলাই থেকে অনুরাগ বসু এসেছেন, জামশেদপুর থেকে ইমতিয়াজ আলি এবং এলাহাবাদ থেকে তিগমাংশু ধুলিয়া। সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বুঝে এবং পৃথিবীকে দেখে তাঁরা এসেছেন।”
তাঁর বক্তব্য স্পষ্ট—ভারতীয় সিনেমাকে আন্তর্জাতিক করে তুলতে গল্পকে বিদেশি করে তোলার প্রয়োজন নেই। বরং নিজের মাটি, ভাষা ও মানুষের আরও কাছে গেলেই সেই গল্পের আবেদন দেশের সীমানা পেরোতে পারে।
এ বার ‘ওহ মাই ডগ’
পঙ্কজ ত্রিপাঠীকে এবার দেখা যাচ্ছে পরীক্ষামূলক ছবি ‘ওহ মাই ডগ’-এ। ছবির কেন্দ্রে রয়েছে একটি কুকুর। পঙ্কজ-সহ একাধিক অভিজ্ঞ অভিনেতা রয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক চরিত্রে।
ছবিটি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে পঙ্কজ বলেন, অনেক মানুষ কুকুর বা অন্যান্য প্রাণী পছন্দ করেন না। কিন্তু সব সময় তার কারণ অপছন্দ নয়—অনেক ক্ষেত্রেই এর পিছনে থাকে ভয়।
অভিনেতার কথায়, “কিছু মানুষ কুকুর বা প্রাণী পছন্দ করেন না। আসল সমস্যা হল, তাঁরা প্রাণীদের ভয় পান। কিন্তু একবার প্রাণীটিকে বুঝতে শুরু করলে সেই ভয় শরীর থেকে চলে যাবে।”
তাঁর আশা, ছবিটি দেখার পরে মানুষের মধ্যে প্রাণীদের প্রতি সহমর্মিতা বাড়বে। পঙ্কজ বলেন, “এই প্রাণীরা হাজার হাজার বছর ধরে আমাদের সঙ্গে বাস করছে। শুধু ওদের বোঝার চেষ্টা করুন, তা হলেই ৯৯ শতাংশ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।”
অমিত রাই পরিচালিত ‘ওহ মাই ডগ’ ৭ আগস্ট প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে।
এর পর পঙ্কজকে ফের দেখা যাবে তাঁর জনপ্রিয় চরিত্র অখণ্ডানন্দ ত্রিপাঠী ওরফে কালীন ভাইয়ার ভূমিকায়। ‘মির্জাপুর’-এর চলচ্চিত্র সংস্করণটি জনপ্রিয় সিরিজের প্রিকুয়েল-স্পিনঅফ হিসেবে তৈরি হয়েছে। সেপ্টেম্বরে ছবিটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়ার কথা।
পঙ্কজের বক্তব্যে তাই ভারতীয় সিনেমার আন্তর্জাতিক সাফল্যের একটি সহজ সূত্রই উঠে আসে—বিশ্বকে ছুঁতে গেলে আগে নিজের মাটিকে চিনতে হবে।