দিল্লির গোপন কক্ষ। চারটি মাস্টার প্রশ্নপত্র। হাতে গোনা কয়েক জন বিশেষজ্ঞ। আর সেই প্রশ্নই কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পৌঁছে গেল পুণে, লাতুর, নাসিক থেকে রাজস্থান পর্যন্ত।
নিট-ইউজি ২০২৬-এর প্রশ্নফাঁস মামলায় সিবিআইয়ের প্রায় ২০ হাজার পাতার চার্জশিটে যে ছবি উঠে এসেছে, তা শুধু কয়েক জনের প্রশ্ন চুরির গল্প নয়। বরং প্রশ্ন তৈরি থেকে শুরু করে তা পরীক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছনো পর্যন্ত একের পর এক নিরাপত্তা-ফাঁকের গল্প।
সবচেয়ে বড় অভিযোগ, প্রশ্নপত্রের মতো অত্যন্ত গোপন নথির ক্ষেত্রে যে বিচ্ছিন্নতা ও ‘ফায়ারওয়াল’ থাকার কথা ছিল, বাস্তবে তা কার্যকর ছিল না। একই বিশেষজ্ঞকে একাধিক পর্যায়ে কাজে লাগানো হয়েছে। তাঁদের মধ্যে এক জন প্রশ্ন তৈরি থেকে শুরু করে অনুবাদ এবং পুনরায় অনুবাদ—চারটি পর্যায়েই ছিলেন। শেষ পর্যায়ে চারটি মাস্টার সেটই দেখার সুযোগ মিলেছিল বলে অভিযোগ।
আর সেই সুযোগই শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছিল প্রশ্ন বাইরে বেরোনোর রাস্তা।
দিল্লির গোপন কক্ষেই শুরু
সিবিআইয়ের তদন্ত অনুযায়ী, প্রশ্নফাঁসের সূত্রপাত দিল্লির ওখলায় এনটিএ-র এনএসআইসি ভবনের গোপনীয় বিভাগ থেকে। অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে নিটের প্রশ্ন তৈরির কাজ চলেছিল সেখানে।
কিন্তু তদন্তকারীদের অভিযোগ, নিরাপত্তাব্যবস্থার একাধিক জায়গায় বড় ফাঁক ছিল।
পুণের তিন বিষয়-বিশেষজ্ঞ—উদ্ভিদবিদ্যা ও প্রাণিবিদ্যার মণীষা গুরুনাথ মান্ধারে, রসায়নের প্রহ্লাদ বিঠলরাও কুলকার্নি এবং পদার্থবিদ্যার মণীষা সঞ্জয় হাভালদার—প্রশ্ন তৈরির বিভিন্ন পর্যায়ে যুক্ত ছিলেন।
মান্ধারে ছিলেন সবচেয়ে বেশি সময়। ২০ থেকে ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রশ্ন তৈরি, ৫ থেকে ৭ মার্চ ভেটিং, ৯ থেকে ১৪ মার্চ অনুবাদ এবং ৩১ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পুনরায় অনুবাদের কাজে তিনি ছিলেন বলে চার্জশিটে উল্লেখ রয়েছে।
কুলকার্নি ২২ থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রশ্ন তৈরির কাজে এবং ৩১ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পুনরায় অনুবাদের কাজে ছিলেন।
হাভালদার ১৪ মার্চ অনুবাদ এবং ৩১ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পুনরায় অনুবাদের কাজে যুক্ত ছিলেন।
অর্থাৎ, শেষ পর্যায়ে তিন জনের সামনেই ছিল চারটি চূড়ান্ত মাস্টার সেট—‘কৈলাস’, ‘শিবালিক’, ‘সেট ২’ এবং ‘সেট ৩’।
সিবিআইয়ের অভিযোগ, একটি সেটের প্রশ্ন অন্য সেট থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার মতো কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না।
চার সেট একসঙ্গে, বাইরে যাওয়ার পথও খোলা
এখানেই প্রশ্নফাঁসের গল্পে আসে প্রথম বড় মোড়।
৩১ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল—এই তিন দিনে বিশেষজ্ঞদের সামনে চারটি মাস্টার প্রশ্নপত্রই ছিল বলে তদন্তকারীদের দাবি। অর্থাৎ, পরীক্ষার আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে গোপন রাখা প্রশ্নের বিপুল অংশ দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন এমন কয়েক জন, যাঁদের কাজের ক্ষেত্র মূলত ছিল প্রশ্ন তৈরি ও পরিমার্জন।
সিবিআইয়ের অভিযোগ, এখান থেকেই প্রশ্নের বিষয়বস্তু বাইরে যেতে শুরু করে।
প্রহ্লাদ কুলকার্নির বিরুদ্ধে অভিযোগ আরও সরাসরি। গোপন কক্ষে রাফ কাজের জন্য দেওয়া সাধারণ কাগজের ছোট ছোট টুকরোয় তিনি ১৩৫টি রসায়নের প্রশ্ন এবং উত্তর বেছে নেওয়ার বিকল্প লিখে নেন। পরে সেই কাগজের টুকরো নিয়েই তিনি বেরিয়ে যান বলে দাবি তদন্তকারীদের।
মান্ধারে ও হাভালদার নাকি অন্য কৌশল নেন। তাঁরা প্রশ্নের ভাষা, কাঠামো এবং নির্দিষ্ট সংখ্যা বা তথ্য মনে রাখেন। পরে দিল্লির হোটেলে ফিরে পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে মিলিয়ে সেই প্রশ্নগুলি নিজেদের খাতায় পুনর্গঠন করেন বলে অভিযোগ।
এক জন প্রশ্ন নিয়ে বেরোলেন কাগজে। অন্য দু’জন নিয়ে গেলেন স্মৃতিতে।
পুণেতে খুলল ‘প্রাইভেট ক্লাস’
দিল্লি থেকে পুণেতে পৌঁছনোর পর প্রশ্নের দ্বিতীয় জীবন শুরু হয়।
সিবিআইয়ের দাবি, মণীষা মান্ধারে নিজের বাড়িতে আট জন ছাত্রছাত্রীকে নিয়ে বিশেষ জীববিদ্যার ক্লাস চালাতেন। যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপটির নাম ছিল—‘Fifa world cup 2026’।
নাম দেখে নিট প্রস্তুতির কোনও আভাসই পাওয়া যেত না।
কিন্তু গ্রুপে চলছিল অন্য খেলা।
মান্ধারে ছাত্রছাত্রীদের নতুন করে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির এনসিইআরটি বই কিনতে বলেছিলেন বলে চার্জশিটে দাবি। সরাসরি প্রশ্ন লিখে দেওয়ার বদলে তিনি বইয়ের নির্দিষ্ট অনুচ্ছেদ বা অংশ চিহ্নিত করে দিতেন। সঙ্গে বলে দিতেন, প্রশ্নটি পরীক্ষায় কী ভাবে আসতে পারে।
ছাত্রছাত্রীরা সেই প্রশ্ন বইয়ের মার্জিনে লিখে রাখতেন। পরে সেগুলি আলাদা ‘ফেয়ার নোটবুক’-এ লিখে মান্ধারের কাছে দেখাতেন। তিনি সেগুলি পরীক্ষা করে সংশোধন করতেন বলেও অভিযোগ।
অর্থাৎ, ফাঁস হওয়া প্রশ্নের কোনও ছাপানো কপি হাতে দেওয়ার প্রয়োজনই পড়েনি। পাঠ্যবই আর খাতার পাতাতেই তৈরি হয়েছিল প্রশ্নের নতুন ‘আর্কাইভ’।
হাতে লেখা থেকে ডিজিটাল ফাইল
এই ব্যবস্থার পরবর্তী ধাপে ছিলেন মণীষা সঞ্জয় ওয়াঘমারে বলে সিবিআইয়ের অভিযোগ।
মান্ধারের ছাত্রছাত্রীদের খাতা সংগ্রহ করে সেগুলিকে ডিজিটাল নথিতে রূপ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন। দিয়া শিন্ডে ও স্নেহাঞ্জলি দেশমুখ-সহ কয়েক জন ছাত্রছাত্রীর খাতার উল্লেখও রয়েছে চার্জশিটে।
অর্থাৎ দিল্লিতে দেখা প্রশ্ন প্রথমে স্মৃতি বা কাগজে এল, পুণেতে তা ঢুকল পাঠ্যবই ও খাতায়, তার পর শুরু হল ডিজিটাল রূপান্তর।
কুলকার্নির বাড়িতে ন’জনের ক্লাস
রসায়নের প্রশ্নের পথ ছিল আরও সরাসরি।
চার্জশিট অনুযায়ী, কুলকার্নি ২৫ থেকে ২৭ এপ্রিল পুণের নান্দেড সিটির নিজের বাড়িতে ন’জন ছাত্রছাত্রীকে নিয়ে বিশেষ ক্লাস নেন। তাঁদের ব্যবস্থা করেছিলেন ওয়াঘমারে বলে অভিযোগ।
সিবিআই এই ক্লাসের প্রমাণ হিসেবে শুধু সাক্ষ্যের উপর নির্ভর করেনি। কুলকার্নির আবাসনের ‘মাইগেট’ ব্যবস্থায় থাকা প্রবেশ ও বেরোনোর তথ্য, বায়োমেট্রিক রেকর্ড, কল ডিটেল এবং ফোনের অবস্থান—সব মিলিয়ে ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতি যাচাই করা হয়েছে বলে চার্জশিটে দাবি।
কুলকার্নির ফোন থেকেও রসায়নের প্রশ্ন ও উত্তর লেখা ন’টি ছবি উদ্ধার হয়েছে বলে সিবিআই জানিয়েছে।
এক অভিভাবক তাঁকে ঠিকানা জানতে চেয়েছিলেন। কারণ, প্রশ্ন পাওয়ার বিনিময়ে একটি ঘড়ি দেওয়ার কথা ছিল বলে তদন্তকারীদের দাবি।
৬৮ প্রশ্নের দাম—২৫ হাজার টাকা আর এক বাক্স আম
পদার্থবিদ্যার ক্ষেত্রে অভিযোগ আরও চমকপ্রদ।
১৪ এপ্রিল মণীষা হাভালদার নিজের বাড়িতে তেজস হর্ষদকুমার শাহকে ৬৮টি পদার্থবিদ্যার প্রশ্ন মুখে বলে লিখিয়েছিলেন বলে সিবিআইয়ের দাবি।
শাহ ১৬ পাতায় সেগুলি লিখে নেন।
বিনিময়ে হাভালদার পেয়েছিলেন বলে অভিযোগ—২৫ হাজার টাকা নগদ এবং এক বাক্স আম।
পরে ২৫ এপ্রিল সেই ১৬ পাতার উচ্চমানের ছবি তুলে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো হয় হাভালদারের স্বামী সঞ্জয় সুধাকর হাভালদারকে। সেখান থেকে প্রশ্নের ছবি পৌঁছে যায় মান্ধারের কাছে।
অর্থাৎ, দিল্লির গোপন কক্ষ থেকে বেরোনো প্রশ্নের নতুন যাত্রাপথ ছিল—
স্মৃতি → হাতে লেখা খাতা → ছবি → হোয়াটসঅ্যাপ।
আরও ২৫ হাজারে ছাপা হল প্রশ্ন
২৭ এপ্রিল প্রশ্ন পৌঁছে যায় আরও এক ধাপে।
সিবিআইয়ের অভিযোগ, মান্ধারে চিকিৎসক উষা আঢবকে নিয়ে হাভালদারের দফতরে যান। সেখানে হাভালদার হোয়াটসঅ্যাপে থাকা প্রশ্নের ছবিগুলি ইউএসবি-তে কম্পিউটারে নেন এবং সেগুলির প্রিন্ট বার করে দেন।
এর বিনিময়ে নেওয়া হয়েছিল আরও ২৫ হাজার টাকা বলে চার্জশিটে দাবি।
এখানে তদন্তকারীদের হাতে রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ—প্রশ্নের প্রিন্ট হস্তান্তরের ঘটনাটি সিসিটিভিতে ধরা পড়েছিল।
লাতুরে পৌঁছে গেল প্রশ্ন
এর পর ফাঁস হওয়া প্রশ্ন আর পুণেতে আটকে থাকেনি।
সিবিআইয়ের অভিযোগ, কুলকার্নির কাছ থেকে পাওয়া প্রশ্ন তাঁর ছাত্রের মাধ্যমে পৌঁছয় লাতুরের কোচিং কর্তা শিবরাজ মোতেগাঁওকরের কাছে। তিনি ‘রেণুকাই কেরিয়ার সেন্টার’ চালান।
সেখানেও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে প্রশ্ন ছাত্রছাত্রীদের কাছে পৌঁছেছিল বলে তদন্তকারীদের দাবি।
তার পর এপ্রিল মাসে নেওয়া একটি মক টেস্টে সেই প্রশ্নের উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যবহার করা হয় বলে অভিযোগ।
পরীক্ষার পরে মোতেগাঁওকর সমাজমাধ্যমে দাবি করেছিলেন, তিনি নিটের ‘পুরো কেমিস্ট্রি পেপার’ আগেই অনুমান করেছিলেন।
কিন্তু সিবিআইয়ের তত্ত্ব অন্য। তদন্তকারীদের দাবি, সেটি নিছক প্রশ্ন অনুমান ছিল না; ফাঁস হওয়া প্রশ্নই তাঁর হাতে পৌঁছেছিল।
৬৮টির মধ্যে ৬৬টি—মিলল আসল প্রশ্নে
এখানেই তদন্তের সবচেয়ে শক্তিশালী দাবিগুলির একটি সামনে আসে।
সিবিআইয়ের অনুরোধে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি উদ্ধার হওয়া প্রশ্নগুলির সঙ্গে নিটের চারটি মাস্টার সেট মিলিয়ে দেখে।
হাভালদারের কাছ থেকে শাহ লিখে নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ করা ৬৮টি প্রশ্নের মধ্যে ৬৬টি চারটি মাস্টার সেটের কোনও না কোনওটিতে পাওয়া যায়।
মাত্র দু’টি প্রশ্ন মেলেনি।
সিবিআইয়ের দাবি, বিভিন্ন অভিযুক্ত, পরীক্ষার্থী ও মধ্যস্থতাকারীর কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া অন্য প্রশ্নগুলির ক্ষেত্রেও মাস্টার সেটের সঙ্গে মিল কোনও কোনও ক্ষেত্রে ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছিল।
তদন্তকারীদের কাছে এটাই প্রশ্নফাঁসের অভিযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
কারণ, কয়েকটি সাধারণ প্রশ্ন মিলে যাওয়ার ঘটনা এক জিনিস। কিন্তু ৬৮টির মধ্যে ৬৬টি প্রশ্ন মিলে যাওয়া সম্পূর্ণ অন্য মাত্রার বিষয়।
প্রশ্ন এবার পুণে ছাড়িয়ে রাজস্থানেও
ফাঁস হওয়া প্রশ্নের পিডিএফ শেষ পর্যন্ত রাজস্থানের সিকরেও পৌঁছয়।
সিবিআইয়ের দাবি, কেরলের এক এমবিবিএস ছাত্র সেই পিডিএফ তাঁর বাবার বাড়িওয়ালাকে পাঠিয়েছিলেন। ওই বাড়িওয়ালা সিকরে থাকতেন। তিনি পিডিএফগুলি স্থানীয় রসায়ন শিক্ষক শশীকান্ত সুতারের কাছে নিয়ে যান।
সুতার প্রশ্নগুলি দেখে সন্দেহ করেন, এগুলি আসল নিট প্রশ্ন হতে পারে।
তিনি বিষয়টি চেপে না রেখে ৭ মে সরাসরি এনটিএ-র মহাপরিচালককে জানান।
পাঁচ দিন পরে, ১২ মে, নিট-ইউজি ২০২৬ পরীক্ষা বাতিল করা হয় এবং তদন্তভার যায় সিবিআইয়ের হাতে।
তার পর শুরু প্রমাণ মুছতে দৌড়
তদন্তের আঁচ পাওয়ার পর প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে যুক্তদের একাংশ প্রমাণ নষ্ট করার চেষ্টা করেছিলেন বলেও সিবিআইয়ের অভিযোগ।
হাভালদার নিজের বাড়ির রান্নাঘরে তাঁর মূল পদার্থবিদ্যার খাতা পুড়িয়ে ফেলেছিলেন বলে দাবি তদন্তকারীদের।
শাহ ১৬ পাতার হাতে লেখা নোট নষ্ট করেন বলেও অভিযোগ।
এক অভিযুক্ত নিজের আইফোন হাইওয়েতে ছুড়ে ফেলেছিলেন বলে চার্জশিটে দাবি। আর একটি ফোন চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে পড়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
ডিজিটাল প্রমাণ মুছতেও চলেছিল চেষ্টা।
হোয়াটসঅ্যাপে ‘Delete for Everyone’ ব্যবহার করে বার্তা সরানো, পিডিএফ মুছে ফেলা এবং সাইবার ক্যাফের কম্পিউটার থেকে প্রশ্নের ফাইল ডিলিট করার নির্দেশ—সবই তদন্তে এসেছে বলে সিবিআই জানিয়েছে।
টেলিগ্রামেও প্রকৃত নামের বদলে ছদ্মনাম ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। যশ যাদব ব্যবহার করতেন ‘hunter23i’, আর মঙ্গিলাল বিওয়াল ব্যবহার করতেন ‘@Hindustan8360’।
২৫ লক্ষ টাকায় প্রশ্নের ‘ডিজিটাল বাজার’
তদন্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল অর্থের লেনদেন।
সিবিআইয়ের অভিযোগ, নাসিকের শুভম মধুকর খৈরনার ফাঁস হওয়া প্রশ্নের ডিজিটাল প্রতিলিপির জন্য পুণের মধ্যস্থতাকারী ধনঞ্জয় নিবৃত্তি লোখান্ডেকে ২৫ লক্ষ টাকা দিয়েছিলেন।
এই লেনদেন প্রশ্নফাঁসের অভিযোগকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যায়।
অভিযোগটি আর শুধু ‘প্রশ্ন চুরি’তে আটকে থাকে না। প্রশ্ন বাইরে আসার পরে তা অর্থের বিনিময়ে এক হাত থেকে অন্য হাতে গিয়েছে কি না, সেই সম্ভাব্য বাণিজ্যিক চক্রের ছবিও সামনে আসে।
তদন্তকারীদের অভিযোগ অনুযায়ী, প্রশ্নের যাত্রাপথে একাধিক মধ্যস্থতাকারী ছিল—কেউ প্রশ্ন সংগ্রহ করেছেন, কেউ হাতে লেখা নোট ডিজিটাল করেছেন, কেউ ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, কেউ আবার তা পরীক্ষার্থী বা কোচিং সেন্টারের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।
এনটিএ-র নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন
তবে এই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হয়তো অভিযুক্ত ১৩ জনের বাইরেও।
সিবিআই জানিয়েছে, চার্জশিটে নাম থাকা ১৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হলেও কোনও সরকারি আধিকারিক বা এনটিএ-র পদাধিকারী এই ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকার প্রমাণ তদন্তে পাওয়া যায়নি।
কিন্তু একই সঙ্গে তদন্তে উঠে এসেছে এনটিএ-র ব্যবস্থাপনার একাধিক গুরুতর ত্রুটি।
৪ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টে কেন্দ্র জানিয়েছিল, প্রশ্ন তৈরির জায়গা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ও নিরাপদ ছিল। সেখানে ইলেকট্রনিক যন্ত্র নিয়ে ঢোকার সুযোগ ছিল না, দেহতল্লাশি হত, সিসিটিভি নজরদারি ছিল এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী ২৪ ঘণ্টা পাহারা দিত।
সিবিআইয়ের চার্জশিটে অবশ্য অন্য ছবি।
তদন্তকারীদের দাবি, ঢোকা-বেরোনোর সময় বিশেষজ্ঞদের দেহতল্লাশি হয়নি। মেটাল ডিটেক্টরেও পরীক্ষা হয়নি। সিসিটিভি থাকলেও তা সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা হত না।
আর তদন্তের সময় যখন ফুটেজ চাওয়া হয়, তখন মাত্র ২০ থেকে ২৫ দিনের রেকর্ড পাওয়া যায় বলে দাবি সিবিআইয়ের।
গোপন কক্ষে প্রশ্ন তৈরির কাজ শেষ হয়েছিল ৭ এপ্রিল। মামলা হয় ১২ মে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ সময়ের ফুটেজ আর সংরক্ষিত ছিল না।
‘কেউ পুরো প্রশ্নপত্র দেখতে পারেন না’—দাবিও প্রশ্নের মুখে
কেন্দ্র সুপ্রিম কোর্টে আরও জানিয়েছিল, প্রশ্ন তৈরির কোনও পর্যায়েই এক জন ব্যক্তির পক্ষে সম্পূর্ণ প্রশ্নপত্র দেখা সম্ভব নয়।
কিন্তু সিবিআইয়ের তদন্ত অনুযায়ী, বাস্তবে ‘মডারেশন’-এর পর সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের চূড়ান্ত সেটগুলির সম্পূর্ণ অংশ দেখার সুযোগ ছিল। অনুবাদ এবং পুনরায় অনুবাদের পর্যায়ে চারটি মাস্টার সেটই তাঁদের সামনে ছিল বলে অভিযোগ।
অর্থাৎ, প্রশ্নফাঁসের জন্য বাইরে থেকে কোনও জটিল সাইবার হ্যাকিংয়ের প্রয়োজন হয়নি—তদন্তের দাবি অন্তত এমনই।
প্রশ্ন ছিল গোপন কক্ষে।
দরজার ওপাশে ছিলেন অনুমোদিত বিশেষজ্ঞরা।
আর সেই অনুমোদিত প্রবেশাধিকারই, সিবিআইয়ের অভিযোগ অনুযায়ী, শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছিল সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।
শেষ কথা: প্রশ্ন শুধু কে ফাঁস করল নয়
এই মামলায় ১৩ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তার বিচার এখনও বাকি। চার্জশিটে থাকা কোনও অভিযোগই আদালতে প্রমাণিত অপরাধ নয়। অভিযুক্তদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ, সাক্ষ্য, ডিজিটাল প্রমাণ এবং ফরেন্সিক তথ্য বিচারপর্বে পৃথক ভাবে পরীক্ষা হবে।
কিন্তু তদন্তের ছবিটি ইতিমধ্যেই একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে।
নিটের মতো কোটি মানুষের ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত একটি জাতীয় পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরির প্রক্রিয়ায় কী ভাবে একই ব্যক্তির হাতে এতগুলি পর্যায়ের প্রবেশাধিকার গেল?
কী ভাবে চারটি মাস্টার সেট একসঙ্গে দেখা সম্ভব হল?
কী ভাবে প্রশ্ন কাগজ, স্মৃতি, খাতা, মোবাইল, হোয়াটসঅ্যাপ, পিডিএফ এবং শেষ পর্যন্ত টাকার বিনিময়ে একাধিক শহরে পৌঁছে গেল?
আর সবচেয়ে বড় কথা—যে নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রশ্নকে গোপন রাখার জন্য তৈরি হয়েছিল, সেই ব্যবস্থার ফাঁক দিয়েই যদি প্রশ্ন বাইরে চলে যায়, তা হলে আসল ব্যর্থতা কি শুধু কয়েক জনের?
নিট-ইউজি ২০২৬-এর প্রশ্নফাঁস মামলার বিচার এগোতে এগোতে এই প্রশ্নগুলিই সম্ভবত সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে।
কারণ গল্পটা শুধু প্রশ্ন ফাঁসের নয়।
এটা সেই প্রশ্নেরও—প্রশ্নপত্র এত সহজে বাইরে এল কী ভাবে?