বাংলাস্ফিয়ার: ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে হোয়াইট হাউসের রোজ গার্ডেনে দাঁড়িয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন নতুন শুল্ক আরোপের তালিকা হাতে তুলে ধরেছিলেন, তখন বিশ্বজুড়ে যেন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিশ্ববাজার থেকে লক্ষ লক্ষ কোটি ডলারের সম্পদ উবে যায়। ওয়াশিংটনের পথে ছুটে আসে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা। ৭৫টিরও বেশি দেশ দ্রুত আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়, কেউ কেউ পাল্টা পদক্ষেপের প্রস্তুতিও স্থগিত রেখে সমঝোতার পথ খুঁজতে শুরু করে।
কিন্তু মাত্র ১৬ মাসের ব্যবধানে সেই পরিস্থিতি বদলে গেছে। ট্রাম্প এখনও একের পর এক বিস্ফোরক হুমকি দিচ্ছেন—বাণিজ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার, কানাডা দখল, গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণ, ন্যাটো থেকে সরে যাওয়া, এমনকি ইরানকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়ার মতো কথাও বলছেন। কিন্তু এবার আর বিশ্বজুড়ে আতঙ্কের ঘণ্টা বাজছে না।
বিশ্বনেতারা এখন অনেক বেশি সংযত। কারণ, তারা দেখেছেন—মার্কিন আদালত একাধিক ক্ষেত্রে ট্রাম্পকে আটকে দিয়েছে, কংগ্রেস তাঁর নানা পরিকল্পনায় বাধা সৃষ্টি করেছে, আর ইরানও তাঁর চরমপত্রকে উপেক্ষা করে নিজেদের অবস্থানে অনড় থেকেছে। ফলে তাঁর বহু হুমকিই শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। একই সঙ্গে জনমত সমীক্ষায়ও তাঁর জনপ্রিয়তা কমেছে।
গত মাসে ট্রাম্প আবারও নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। এবার শিশু শ্রমের অভিযোগকে ভিত্তি করে তিনি সুপ্রিম কোর্টের আরোপিত সীমাবদ্ধতা এড়ানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু আগের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর বলেন, এর প্রভাব সীমিত হবে। ব্রিটেন জানায়, তাদের রপ্তানিকারকদের বড় কোনও ক্ষতি হবে না। মেক্সিকোর অর্থমন্ত্রী মন্তব্য করেন, এটি কেবল একটি শুল্কের জায়গায় আরেকটি শুল্ক বসানোর ঘটনা। আর্থিক বাজারও প্রায় নির্বিকার ছিল।
দ্বিতীয় মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে এসে ট্রাম্পের অন্যতম বড় রাজনৈতিক শক্তি—সামাজিক মাধ্যমে হঠাৎ হুমকি দিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা এবং সেই আতঙ্ককে নিজের কূটনৈতিক বা রাজনৈতিক সাফল্যে পরিণত করা—ধীরে ধীরে কার্যকারিতা হারাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর বক্তব্যের গুরুত্ব এখনও রয়েছে, কিন্তু সেই বক্তব্যে আগের মতো বিশ্ব কেঁপে উঠছে না।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য এবং যুক্তরাষ্ট্র-সম্পর্ক বিষয়ক প্রতিনিধিদলের প্রধান ব্র্যান্ডো বেনিফেই বলেন, “আমরা এখন প্রায় প্রতিদিনই এমন ঘোষণা শুনছি। ফলে এগুলোকে আর আগের মতো গুরুত্ব দিই না।”
দেশের অভ্যন্তরেও ট্রাম্প এখনও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে থাকলেও তাঁর সব ইচ্ছা বাস্তবায়িত হচ্ছে না। রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত সিনেটকে তিনি জেফ্রি এপস্টিন-সংক্রান্ত নথি গোপন রাখার ব্যাপারে রাজি করাতে পারেননি। তাঁর বহুল প্রচারিত ‘সেভ আমেরিকা অ্যাক্ট’-ও পাস হয়নি। এমনকি অ্যাটর্নি জেনারেল পদে টড ব্ল্যাঞ্চের মনোনয়ন এগিয়ে নিতে গিয়েও তাঁকে ছাড় দিতে হয়েছে।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও একাধিক ক্ষেত্রে ট্রাম্পের কৌশল ব্যর্থ হয়েছে। ইরান মার্কিন বোমা হামলার পরও হরমুজ প্রণালি খুলতে রাজি হয়নি। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেন যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের নতুন দাবিকে ইউরোপ প্রায় উপেক্ষাই করেছে। নতুন শুল্কের ঘোষণাও বহু দেশের কাছে আর বড় ধাক্কা হয়ে ওঠেনি।
অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, বিশ্বের কাছে এখন ট্রাম্পের আচরণ অনেকটাই অনুমেয় হয়ে উঠেছে। তিনি প্রায়ই কঠোর হুমকি দেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আপস করেন বা পিছিয়ে যান। তাই শেয়ারবাজারে যে ব্যঙ্গাত্মক শব্দবন্ধ ‘টাকো’ (TACO—Trump Always Chickens Out) জনপ্রিয় হয়েছিল, তা এখন বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারকদের মধ্যেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠছে।
ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের মার্কিন কর্মসূচির পরিচালক জেরেমি শ্যাপিরোর মতে, ট্রাম্পের প্রথম দিকের সাফল্যের পেছনে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা ও প্রভাব। কিন্তু তিনি সেই সঞ্চিত শক্তি ক্রমশ ক্ষয় করে ফেলছেন।
শ্যাপিরো বলেন, “বিশ্বের সরকারগুলো এখন বুঝতে শুরু করেছে যে তিনি একজন ভয় দেখানো মানুষ, কিন্তু তাঁকেও সহজেই চাপে ফেলা যায়।”
২০২৫ সালের তথাকথিত ‘লিবারেশন ডে’ শুল্কনীতি কয়েক দিনের মধ্যেই নানা ছাড় ও বিলম্বের কারণে কার্যত দুর্বল হয়ে পড়ে। গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ইউরোপীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর শুল্ক আরোপের হুমকিও পরে প্রত্যাহার করে ডাভোসে একটি অস্পষ্ট ‘ফ্রেমওয়ার্ক’-এর ঘোষণা দেন, যা ডেনমার্ক কখনও আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেনি এবং যার বাস্তব ফলও তেমন দেখা যায়নি।
চীনও ট্রাম্পের ১০০ শতাংশ শুল্কের হুমকির সামনে নতি স্বীকার করেনি। বরং বিরল খনিজ রপ্তানিতে নিজেদের একচেটিয়া অবস্থান এবং মার্কিন সয়াবিন কেনা বন্ধ করার মতো পদক্ষেপ নিয়ে ওয়াশিংটনকে সমঝোতার পথে আসতে বাধ্য করে। এই ঘটনাকে অনেক দেশই শিক্ষা হিসেবে দেখেছে।
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভাও ট্রাম্পের ৫০ শতাংশ শুল্কের হুমকি উপেক্ষা করেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর বিরুদ্ধে মামলায় প্রভাব ফেলতে চেয়েছিলেন ট্রাম্প, কিন্তু আদালত শেষ পর্যন্ত বলসোনারোকে ২৭ বছরের কারাদণ্ড দেয়।
সবচেয়ে বড় উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা এবং আরও কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হলেও ইসলামি শাসনব্যবস্থা টিকে থাকে এবং হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণও বজায় থাকে।
ট্রাম্প একের পর এক চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইরান যদি প্রণালি না খোলে তবে দেশটির ‘সভ্যতা ধ্বংস করে দেওয়া হবে’। কিন্তু প্রণালি বন্ধই থাকে। ইরান নতি স্বীকার করেনি। শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পও শাসন পরিবর্তন এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে নিজের ঘোষিত অবস্থান নরম করেন।
মার্কিন কূটনীতিক রোনাল্ড ই. নিউম্যানের ভাষায়, “হুমকি, তারপর বোমা হামলা, তারপর আবার পিছিয়ে আসা—এসব দেখে ইরান বুঝছে যে ট্রাম্পই আসলে সমঝোতার জন্য বেশি আগ্রহী। অভিজ্ঞ দরকষাকষিকারীদের কাছে এর অর্থ, নিজের দাবি কমানোর দরকার নেই।”
তিনি আরও কটাক্ষ করে বলেন, “ট্রাম্প যেভাবে দরকষাকষি করেন, তাতে তাঁকে আমি বাজারে গিয়ে কার্পেট কিনতেও পাঠাতাম না।”
ইউরোপকেও ইরানবিরোধী অভিযানে পুরোপুরি পাশে টানতে পারেননি ট্রাম্প। স্পেন সহযোগিতা না করায় তাকে বাণিজ্যিক অবরোধের হুমকি দেন। ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানির ওপরও জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের জন্য চাপ সৃষ্টি করেন এবং ন্যাটোর প্রতিশ্রুতি রক্ষা নিয়েও ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেন। কিন্তু ইউরোপীয় দেশগুলো আরও গভীরভাবে যুদ্ধে জড়াতে অস্বীকার করে। স্পেন ও ইতালির মতো কয়েকটি দেশ তাদের ঘাঁটি বা আকাশপথ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা আরোপ করে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক কূটনীতিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ট্রাম্প স্পেনের বিরুদ্ধে বাণিজ্য বন্ধের হুমকি দেওয়ার পর অনেকেই সেটিকে কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে দেখেছেন। তাঁদের অভিজ্ঞতা বলছে, এসব হুমকি উপেক্ষা করলে অনেক ক্ষেত্রেই তা নিজে থেকেই স্তিমিত হয়ে যায়। তবে তিনি স্বীকার করেন, ট্রাম্পের অনিশ্চিত আচরণের কারণে তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া এখনও সহজ নয়।