Home খবর ইথানলের দৌড়ে কে কোথায়? ব্রাজিলের সাফল্য, ভারতের চ্যালেঞ্জ

ইথানলের দৌড়ে কে কোথায়? ব্রাজিলের সাফল্য, ভারতের চ্যালেঞ্জ

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
19 views 8 minutes read
A+A-
Reset

জ্বালানি নিরাপত্তা থেকে কার্বন কমানো—কেন বাড়ছে ইথানল-মিশ্রিত জ্বালানির ব্যবহার, আর বিশ্বের দেশগুলি কতটা এগিয়েছে?

পেট্রোলে ইথানল মেশানো এখন আর শুধু পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ নয়। বিশ্বের বহু দেশের কাছে এটি জ্বালানি নিরাপত্তা, তেল আমদানি কমানো, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং কৃষকদের জন্য নতুন বাজার তৈরির অন্যতম কৌশল। এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে সফল উদাহরণ ব্রাজিল। আর সেই পথ ধরেই দ্রুত এগোচ্ছে ভারত-সহ বিশ্বের একাধিক দেশ।

তবে সবার লক্ষ্য এক হলেও, ইথানলের উৎস, মিশ্রণের হার এবং নীতিতে রয়েছে বড় পার্থক্য।

ব্রাজিল: বিশ্বের সেরা মডেল

ইথানল-ভিত্তিক জ্বালানি ব্যবস্থার কথা উঠলেই প্রথম নাম আসে ব্রাজিলের

১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটের পর দেশটি ‘প্রোআলকোল’ (Proálcool) কর্মসূচি চালু করে। উদ্দেশ্য ছিল বিদেশি তেলের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং দেশীয় আখচাষকে উৎসাহ দেওয়া।

আজ ব্রাজিলে—

  • সাধারণ পেট্রোলে বাধ্যতামূলকভাবে প্রায় ২৭% ইথানল মেশানো হয়।
  • পাম্পে ১০০% হাইড্রাস ইথানল (E100)-ও পাওয়া যায়।
  • অধিকাংশ নতুন গাড়িই ফ্লেক্স-ফুয়েল, অর্থাৎ পেট্রোল, ইথানল বা দুইয়ের যে কোনও মিশ্রণেই চলতে পারে।
  • ইথানলের মূল কাঁচামাল আখ, যা তুলনামূলকভাবে কম কার্বন নিঃসরণকারী বায়োফুয়েল হিসেবে বিবেচিত।

এই দীর্ঘমেয়াদি নীতির ফলে ব্রাজিল আজ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বায়োফুয়েল উৎপাদক এবং তেল আমদানির ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সক্ষম হয়েছে।

ভারত: দ্রুত এগোচ্ছে

গত কয়েক বছরে ভারতে ইথানল মিশ্রণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

প্রথমে ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ মিশ্রণের লক্ষ্য নেওয়া হলেও, পরে তা এগিয়ে এনে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের মধ্যেই অর্জনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

ভারতে ইথানল তৈরি হয় মূলত—

  • আখের রস
  • গুড় ও মোলাসেস
  • ভুট্টা
  • অন্যান্য শস্য থেকে

সরকারের মতে, এই নীতির ফলে অপরিশোধিত তেল আমদানি কমবে, কৃষকের আয় বাড়বে এবং কার্বন নিঃসরণও হ্রাস পাবে।

তবে বিশেষজ্ঞদের একাংশের আশঙ্কা, খাদ্যশস্যের ব্যবহার, জলসম্পদের ওপর বাড়তি চাপ এবং সব গাড়ির উপযোগিতা ভবিষ্যতে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র: উৎপাদনে এক নম্বরে

ইথানল উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

সেখানে—

  • অধিকাংশ পেট্রোলে E10 ব্যবহৃত হয়।
  • ধীরে ধীরে বাড়ছে E15-এর ব্যবহার।
  • ফ্লেক্স-ফুয়েল গাড়ির জন্য রয়েছে E85

যুক্তরাষ্ট্রে ইথানলের প্রধান কাঁচামাল ভুট্টা। তবে উৎপাদনে শীর্ষে থাকলেও বাধ্যতামূলক মিশ্রণের হার এখনও ব্রাজিলের তুলনায় অনেক কম।

ইউরোপ: নির্গমন কমানোর লক্ষ্য

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব দেশে একই নীতি নেই।

ফ্রান্স, জার্মানি, বেলজিয়াম-সহ বহু দেশে E10 সাধারণভাবে ব্যবহৃত হয়। কিছু দেশে E85-ও পাওয়া যায়, তবে তা মূলত ফ্লেক্স-ফুয়েল গাড়ির জন্য।

ইউরোপে ইথানল তৈরি হয় প্রধানত গম, বিট এবং অন্যান্য শস্য থেকে। তাদের মূল লক্ষ্য জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার

চীন: পরিকল্পনা বড়, বাস্তবায়ন সীমিত

চীন একসময় দেশজুড়ে ইথানল মিশ্রণের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নিয়েছিল।

কিন্তু খাদ্যশস্যের প্রাপ্যতা এবং উৎপাদন-সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার কারণে সেই কর্মসূচি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমানে কিছু প্রদেশেই সীমিত পরিসরে ইথানল-মিশ্রিত জ্বালানি ব্যবহার করা হয়।

থাইল্যান্ড: এশিয়ার অগ্রণী দেশ

বায়োফুয়েলের ব্যবহার বাড়াতে থাইল্যান্ডও উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে।

সেখানে বাজারে E10, E20 এবং E85—তিন ধরনের জ্বালানিই পাওয়া যায়।

ইথানলের উৎস মূলত আখ ও কাসাভা। সরকার কর-ছাড় ও মূল্যছাড় দিয়ে এই জ্বালানির ব্যবহারকে উৎসাহিত করে।

অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা

অস্ট্রেলিয়ার কিছু রাজ্যে নির্দিষ্ট পরিমাণ ইথানল মিশ্রণ বাধ্যতামূলক হলেও সারা দেশে একক নীতি নেই।

অন্যদিকে, কানাডার বিভিন্ন প্রদেশে সাধারণত ৫ থেকে ১০ শতাংশ ইথানল মিশ্রণের বিধান রয়েছে। সেখানে প্রধান কাঁচামাল ভুট্টা ও গম

কেন বাড়ছে ইথানলের ব্যবহার?

বিশ্বজুড়ে ইথানল ব্যবহারের পিছনে রয়েছে কয়েকটি বড় কারণ—

  • অপরিশোধিত তেল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো
  • গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ হ্রাস
  • কৃষকদের জন্য নতুন বাজার তৈরি
  • গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা
  • দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা

বিতর্কও রয়েছে

ইথানলকে ঘিরে সমালোচনাও কম নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে—

  • খাদ্যশস্য জ্বালানি তৈরিতে ব্যবহার হলে খাদ্যনিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
  • আখ ও ভুট্টার মতো ফসলের জন্য বিপুল পরিমাণ জল প্রয়োজন।
  • সব গাড়ি উচ্চমাত্রার ইথানল-সমৃদ্ধ জ্বালানির উপযোগী নয়।
  • ইথানলের শক্তিঘনত্ব পেট্রোলের তুলনায় কম হওয়ায় কিছু ক্ষেত্রে জ্বালানি দক্ষতাও কমতে পারে।

ভারতের সামনে ব্রাজিলের শিক্ষা

বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রাজিলের সাফল্য শুধু উচ্চ ইথানল মিশ্রণের ফল নয়। এর পিছনে রয়েছে কয়েক দশকের ধারাবাহিক নীতি, আখ উৎপাদনের শক্তিশালী ভিত্তি, ফ্লেক্স-ফুয়েল গাড়ির ব্যাপক ব্যবহার এবং উন্নত জ্বালানি অবকাঠামো।

ভারতও সেই পথেই এগোতে চাইছে। তবে ব্রাজিলের মতো সাফল্য পেতে হলে শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না; কৃষি, জলসম্পদ, গাড়ির প্রযুক্তি, জ্বালানি অবকাঠামো এবং খাদ্যনিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles