Home International এফসিআরএ নিয়ে মার্কিন আপত্তি, ভারত–আমেরিকা সম্পর্কে নতুন চাপ?

এফসিআরএ নিয়ে মার্কিন আপত্তি, ভারত–আমেরিকা সম্পর্কে নতুন চাপ?

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
22 views 3 minutes read
A+A-
Reset

ভারতের বিদেশি অনুদান নিয়ন্ত্রণ আইন বা এফসিআরএ সংশোধন ঘিরে এবার বিতর্ক গড়াল আন্তর্জাতিক মঞ্চে। মার্কিন কংগ্রেসের রিপাবলিকান সদস্য রাইলি মুর অভিযোগ করেছেন, প্রস্তাবিত সংশোধনী কার্যকর হলে গির্জা এবং খ্রিস্টান ধর্মীয় দাতব্য সংস্থাগুলির ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাড়তে পারে।

মুরের দাবি, সংশোধনীটি বর্তমান রূপে কার্যকর হলে শুধু ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়েই প্রশ্ন উঠবে না, তার প্রভাব পড়তে পারে ভারত–আমেরিকা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কেও।

সামাজিক মাধ্যমে এবং প্রকাশ্য বিবৃতিতে এই সংশোধনীকে তিনি ‘খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে স্পষ্ট আক্রমণ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, ভারতের মতো গণতান্ত্রিক দেশে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলির স্বাধীনতা সুরক্ষিত থাকা জরুরি। ভারত সরকারকে তাই প্রস্তাবটি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

বিতর্কের কেন্দ্রে ‘ডিজাইনেটেড অথরিটি’

মূল বিতর্কটি ঘুরছে সংশোধনীতে প্রস্তাবিত ‘ডিজাইনেটেড অথরিটি’ বা মনোনীত কর্তৃপক্ষকে ঘিরে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনও সংস্থার এফসিআরএ নিবন্ধন বাতিল হলে, নবীকরণ না হলে কিংবা সংস্থাটি স্বেচ্ছায় নিবন্ধন ছেড়ে দিলে বিদেশি অনুদানে তৈরি সম্পদ এবং অব্যবহৃত অর্থ প্রথমে ওই কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে যাবে।

পরবর্তী সময়ে সংস্থাটি নিবন্ধন পুনরুদ্ধার করতে না পারলে, সেই সম্পদের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনার ক্ষমতাও কর্তৃপক্ষের হাতে থাকবে।

এই ব্যবস্থাতেই আপত্তি রাইলি মুরের। তাঁর আশঙ্কা, এর ফলে গির্জা এবং ধর্মীয় দাতব্য সংস্থাগুলির সম্পত্তিতে সরকারি হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

কেন্দ্রের দাবি, ‘নিয়ন্ত্রণ নয়, স্বচ্ছতা’

তবে ভারত সরকার এই অভিযোগ সরাসরি খারিজ করেছে। কেন্দ্রের বক্তব্য, সংশোধনীর লক্ষ্য কোনও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণ করা নয়; বরং বিদেশি অনুদানের ব্যবহার আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং আইনি কাঠামোর মধ্যে আনা।

প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো বা পিআইবি-র ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মনোনীত কর্তৃপক্ষের ভূমিকা মূলত বিদেশি অনুদানে তৈরি সম্পদের প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

কোনও সংস্থা পরবর্তীতে এফসিআরএ নিবন্ধন ফিরে পেলে তার সম্পদ এবং অব্যবহৃত অর্থ ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। পাশাপাশি উপাসনালয়ের ধর্মীয় চরিত্র অক্ষুণ্ণ রাখার বিষয়টি আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে বলেও সরকারের দাবি।

কেন নজরে পড়ল মার্কিন কংগ্রেসের?

রাইলি মুর তাঁর বক্তব্যে ভারতের খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের দীর্ঘ ইতিহাসের কথাও তুলে ধরেছেন। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, প্রথম শতাব্দীতে সেন্ট থমাস মালাবার উপকূলে এসে খ্রিস্টধর্ম প্রচার শুরু করেছিলেন।

এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে মুরের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে ভারতে থাকা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলির স্বাধীনতা কোনওভাবেই খর্ব করা উচিত নয়।

ভারত–আমেরিকা সম্পর্ক বর্তমানে প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, বাণিজ্য এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলগত সহযোগিতার মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রের ওপর দাঁড়িয়ে। তবে মানবাধিকার এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্নও মাঝেমধ্যে দুই দেশের আলোচনায় উঠে আসে।

সেই প্রেক্ষাপটে মার্কিন কংগ্রেসের একজন সদস্যের এই মন্তব্য নতুন করে কূটনৈতিক বিতর্কের দরজা খুলে দিয়েছে।

অভিযোগ বনাম সরকারের ব্যাখ্যা

সমালোচকদের বক্তব্য, সংশোধনী কার্যকর হলে বিদেশি অনুদানের ওপর নির্ভরশীল স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, চার্চ এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলির ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়তে পারে।

তাঁদের আশঙ্কা, কোনও সংস্থার নিবন্ধন বাতিলের ক্ষেত্রে প্রশাসনের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা চলে আসবে এবং সেই সঙ্গে সম্পত্তি নিয়েও সরকারি হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা তৈরি হবে।

কেন্দ্র অবশ্য ভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছে।

সরকারের দাবি, ২০১০ সালের মূল এফসিআরএ আইনে সম্পদ হস্তান্তরের ধারণা থাকলেও তা বাস্তবায়নের জন্য স্পষ্ট প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ছিল না। নতুন সংশোধনী সেই আইনি ফাঁকই পূরণ করতে চাইছে।

অর্থাৎ সরকারের যুক্তি, এটি সম্পত্তি দখলের ব্যবস্থা নয়; বরং কোনও সংস্থার এফসিআরএ মর্যাদা বাতিল হলে বিদেশি অনুদানে তৈরি সম্পদ যাতে অনিয়ন্ত্রিত অবস্থায় না থাকে, তা নিশ্চিত করার আইনি কাঠামো।

কূটনৈতিক সম্পর্কে কতটা প্রভাব?

রাইলি মুরের মন্তব্য নিঃসন্দেহে রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তবে এটিকে আপাতত মার্কিন সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

ফলে অবিলম্বে ভারত–আমেরিকা সম্পর্কে বড় কোনও পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। কিন্তু মার্কিন কংগ্রেসের আরও সদস্য যদি একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেন, তাহলে বিষয়টি ভবিষ্যতে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় জায়গা করে নিতে পারে।

বিশেষ করে মানবাধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতার মতো বিষয় যদি বাণিজ্য, প্রযুক্তি বা কৌশলগত সহযোগিতার আলোচনার সঙ্গে জুড়ে যায়, তাহলে তা সম্পর্কের সমীকরণকে কিছুটা জটিল করে তুলতে পারে।

এফসিআরএ বিতর্ক কি আরও বড় হবে?

এখনও পর্যন্ত বিষয়টি মূলত একটি প্রস্তাবিত আইনি সংশোধনী নিয়ে বিতর্ক। কিন্তু এর পরিধি ভারতের অভ্যন্তরীণ নীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

বিদেশি অনুদানের ওপর সরকারি নজরদারি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা, নাগরিক সমাজের ভূমিকা এবং ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক—সবকটি প্রশ্নই এখন একই আলোচনায় এসে পড়েছে।

তাই এফসিআরএ সংশোধনী শেষ পর্যন্ত কী রূপ নেয়, শুধু ভারতীয় স্বেচ্ছাসেবী ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলিই নয়, নজর থাকবে ওয়াশিংটনেরও। আর মার্কিন কংগ্রেসে এই বিতর্ক যত বাড়বে, ততই প্রশ্ন উঠবে—বিদেশি অনুদান নিয়ন্ত্রণের একটি অভ্যন্তরীণ আইন কি শেষ পর্যন্ত ভারত–আমেরিকা সম্পর্কের নতুন কূটনৈতিক পরীক্ষায় পরিণত হবে?

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles