Home সংস্কৃতি ও বিনোদন কার্ল: যে বিড়ালটা গোটা পাড়ার ছিল

কার্ল: যে বিড়ালটা গোটা পাড়ার ছিল

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
20 views 3 minutes read
A+A-
Reset

২০০১ সালে আমার বিড়াল এরিক পেটের ক্যানসারে মারা যাওয়ার পর মনে হয়েছিল, জীবনে আর কোনও পোষ্যকে হয়তো জায়গা দিতে পারব না। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই দক্ষিণ লন্ডনের ক্যাম্বারওয়েল কলেজ অব আর্টসের এক পুরনো বন্ধু, যিনি জার্মানিতে ফিরে যাচ্ছিলেন, আমাকে আরেকটি বিড়াল দিয়ে গেলেন।

তার নাম কার্ল।

ছাত্রজীবন থেকেই কার্লকে চিনতাম। তখন সে ছিল এরিকের সঙ্গী। বাদামি ডোরাকাটা, চেহারায় একেবারেই সাধারণ—শুধু চোখ দু’টিতে সব সময় এমন এক দৃষ্টি, যেন সামনে দাঁড়ানো মানুষটিকে সে মনে মনে বিচার করছে। তাকে দেখলেই নব্বইয়ের দশকের ছাত্রাবাসের দিনগুলোর কথা মনে পড়ত।

দক্ষিণ লন্ডনের আর পাঁচটা সাধারণ বিড়ালের মতো দেখতে হলেও, আমাদের শান্ত পাড়ায় কার্ল ছিল রীতিমতো কিংবদন্তি।

প্রতিদিন সকালে সন্তানদের স্কুলে পৌঁছে দিতে বেরোলে কার্লও আমাদের সঙ্গে রওনা দিত। পেট দুলিয়ে দুলিয়ে সামনে হাঁটত, রাস্তার মোড় পর্যন্ত আমাদের এগিয়ে নিয়ে যেত। আমি বাচ্চাদের স্কুলে দিয়ে ফিরে এলে আবার সঙ্গী হয়ে বাড়ি ফিরত।

যেন স্কুলে যাওয়া-আসার দায়িত্বটাও তারই।

কলেজে থাকতেই কার্ল আরও একটি অদ্ভুত কৌশল রপ্ত করেছিল—সে টয়লেট ব্যবহার করতে পারত। টয়লেটের সিটে উঠে দাঁড়িয়ে লেজটা তুলে ঠিকঠাক কমোডেই প্রস্রাব করত। এমন কাণ্ড, যেন কোনও পার্টিতে দেখানোর জন্য বিশেষভাবে শেখানো আশ্চর্য খেলা!

কিন্তু কার্লের আসল প্রতিভা ছিল অন্য জায়গায়।

বাড়ির সামনের ছোট্ট বাগানে বসে প্রতিবেশীদের সঙ্গে তার নিয়মিত আড্ডা চলত। পরিচিত কেউ রাস্তা দিয়ে গেলেই কার্ল তাকে ডাকত, আদর নিত। বাইরে থেকে যতই গম্ভীর দেখাক, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তার।

এমনকি এমন অনেক মানুষও কার্লের বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন, যাদের আমি নিজেই ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম না।

কে কখন বাড়ির সামনে দিয়ে যাবে, কার্ল যেন সব মনে রাখত।

২০০৮ সালে আমি আমার তৃতীয় সন্তানের জন্মের অপেক্ষায়। জানতাম, নতুন শিশুটিকে কার্ল খুব বেশি হলে সহ্য করবে। তার বেশি কিছু আশা করা বোধহয় ঠিকও ছিল না।

সেই সময়েও বাড়ির সামনের দেওয়ালে বসে থাকত সে। যেন গোটা পাড়ার নিজস্ব পাহারাদার।

আর সেখানেই একদিন তার জীবনের শেষ অধ্যায় শুরু হল।

একটি নিয়ন্ত্রণহীন কুকুরের আক্রমণে কার্ল গুরুতর আহত হয়। আমার চিৎকার শুনে প্রতিবেশীরা ছুটে এলেন। যারা বছরের পর বছর কার্লকে আদর করেছেন, তার সঙ্গে কথা বলেছেন, তারাও সেদিন আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

আমার কোলে মাথা রেখেই কার্ল শেষ নিঃশ্বাস ফেলল।

আমার সঙ্গী টিম একসময় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার কাজের প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। পরে অবশ্য পেশা বদলে রাঁধুনি হন। কিন্তু কার্লের জন্য তাঁর মনে হয়েছিল, একটি মর্যাদাপূর্ণ বিদায় প্রাপ্য।

সেই রাতেই শেষকৃত্যের আয়োজন করা হল।

প্রতিবেশীরা সবাই এলেন। গান বাজতে বাজতে জুতোর বাক্স দিয়ে বানানো ছোট্ট কফিনে কার্লকে আমাদের বাড়ির পেছনের বাগানে সমাহিত করা হল।

শোকে তখন এতটাই ডুবে ছিলাম যে বুঝতেই পারিনি, আমাদের পরিবারের বাইরেও কত মানুষ কার্লকে ভালোবাসতেন।

কার্লের মৃত্যুর পর যত সমবেদনার কার্ড পেয়েছিলাম, নিজের মা মারা যাওয়ার সময়ও বোধহয় এত পাইনি।

বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় মানুষ থেমে জিজ্ঞেস করতেন—

“বিড়ালটা কোথায়?”

একসময় টিমের পরিচিত কয়েকজন পাথরশিল্পীর সাহায্যে কার্লের স্মৃতিতে একটি ফলক তৈরি করালাম। বাড়ির দেওয়ালের একেবারে নিচের দিকে সেটি বসানো হল—ঠিক বিড়ালের উচ্চতায়।

যেখানে দাঁড়িয়ে মানুষ একসময় হাঁটু গেড়ে কার্লকে আদর করতেন, সেখান থেকেই যেন তার স্মৃতিফলকটাও সহজে দেখা যায়।

২০১৯ সালে আমরা বাড়ি বদলানোর সময় নতুন ভাড়াটিয়াদের বলেছিলাম, চাইলে ফলকটি খুলে নিয়ে যাব।

তারা রাজি হননি।

কারণ, তাদের কাছেও কার্ল শুধুই একটি বিড়াল ছিল না।

সে ছিল গোটা পাড়ার এক আপনজন।

আর তাই আজও সেই বাড়ির দেওয়ালে কার্লের ছোট্ট স্মৃতিফলকটি রয়ে গেছে—একটি সাধারণ বাদামি ডোরাকাটা বিড়ালের জন্য, যে কোনও এক বাড়ির নয়, পুরো পাড়ার হয়ে উঠেছিল।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles