ভিআইপি দর্শনের নামে দালালচক্রের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে গিয়েই মুম্বইয়ের বিখ্যাত সিদ্ধিবিনায়ক গণপতি মন্দিরে উঠে এল আরও বড় অনিয়মের অভিযোগ। তদন্তকারীদের নজরে এসেছে দানবাক্স থেকে নিয়মিত নগদ অর্থ সরিয়ে নেওয়ার একটি চক্র। প্রাথমিক অভিযোগের গণ্ডি পেরিয়ে তদন্ত যত এগিয়েছে, ততই সামনে এসেছে মন্দিরের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন।
অভিযোগের সূত্রপাত ছিল ভিআইপি দর্শন নিয়ে। সাধারণ ভক্তদের লম্বা লাইন এড়িয়ে দ্রুত দর্শন করিয়ে দেওয়ার নামে একটি অবৈধ দালালচক্র সক্রিয় ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। অর্থের বিনিময়ে মন্দিরে বিশেষ প্রবেশের ব্যবস্থা করা হচ্ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে শুরু করে পুলিশ ও মন্দির কর্তৃপক্ষ।
সেই তদন্তেই নজর পড়ে দানবাক্সের দিকে।
ভারতের অন্যতম ধনী মন্দির হিসেবে পরিচিত সিদ্ধিবিনায়কে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী দান করেন ভক্তরা। ফলে দান সংগ্রহ ও গণনার প্রক্রিয়ায় সামান্য অনিয়মও বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। সেই আশঙ্কাতেই মন্দিরের সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা শুরু হয়।
তদন্তকারীদের দাবি, ফুটেজে কয়েকজন কর্মীকে দানবাক্স খালি করার সময় কিছু নগদ অর্থ আলাদা করে সরিয়ে রাখতে দেখা যায়। প্রথমে একজন কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর তদন্তের পরিধি বাড়তে থাকে এবং আরও কয়েকজন কর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
ভিআইপি দর্শন থেকে দানবাক্স
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশেষ দর্শনের নামে চলা কথিত অবৈধ র্যাকেটের সূত্র ধরেই আর্থিক অনিয়মের হদিস মেলে। অভিযোগ ছিল, নির্ধারিত নিয়মের বাইরে কিছু ব্যক্তি টাকার বিনিময়ে ভক্তদের দ্রুত মন্দিরে প্রবেশের সুযোগ করে দিচ্ছিলেন।
এই অভিযোগের তদন্তে কর্মীদের ভূমিকা, অর্থের লেনদেন এবং সিসিটিভি রেকর্ড খতিয়ে দেখতে গিয়েই দানবাক্স থেকে অর্থ সরানোর অভিযোগ সামনে আসে।
অর্থাৎ, তদন্ত শুরু হয়েছিল ভিআইপি লাইনের ‘দালাল’ খুঁজতে, আর সেই পথেই সামনে আসে দানবাক্সের টাকা গায়েবের অভিযোগ।
‘১৮ কোটি’ নিয়ে রাজনৈতিক তরজা
তদন্তের পাশাপাশি বিষয়টি দ্রুত রাজনৈতিক রংও পায়। মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনার প্রধান রাজ ঠাকরে অভিযোগ করেন, সিদ্ধিবিনায়ক মন্দিরে প্রতি বছর প্রায় ১৮ কোটি টাকা দানের অর্থ চুরি হচ্ছে। তাঁর এই দাবির পর মন্দিরের প্রশাসন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়।
তবে মন্দির ট্রাস্ট এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ট্রাস্টের বক্তব্য, কয়েকজন কর্মীর বিরুদ্ধে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলেও তার দায় গোটা ট্রাস্টের উপর চাপানো যায় না। পাশাপাশি ট্রাস্টের দাবি, অভিযুক্ত কর্মীদের অনেকেই আগের প্রশাসনের সময় নিয়োগ পেয়েছিলেন।
ফলে তদন্তের পাশাপাশি শুরু হয়েছে দায় কার—তা নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোরও।
বিরোধীদের অভিযোগ, সিদ্ধিবিনায়ক ইস্যুকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডেও বিধানসভায় পূর্ববর্তী সরকারের আমলে মন্দিরে ‘লুট’ চলেছিল বলে অভিযোগ করেন।
তার পাল্টা জবাবে তৎকালীন ট্রাস্ট-প্রধান আদেশ বান্দেকর স্বাধীন তদন্তের দাবি জানান। তাঁর বক্তব্য ছিল, অনিয়ম হয়ে থাকলে তদন্ত করে তা প্রকাশ্যে আনা উচিত।
রামমন্দিরের পর এবার সিদ্ধিবিনায়ক?
সিদ্ধিবিনায়কের ঘটনাকে অনেকেই অযোধ্যার রামমন্দিরে দান-আত্মসাতের অভিযোগের তদন্তের সঙ্গে তুলনা করছেন। সেখানে বিশেষ তদন্তকারী দল বা এসআইটি-র তদন্তে নগদ অর্থ গণনার ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম না মানা, নজরদারির ঘাটতি এবং প্রশাসনিক গাফিলতির সুযোগ নিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ সামনে এসেছিল।
দুই ঘটনার প্রেক্ষাপট এক নয়। তবে একটি প্রশ্ন দুই ক্ষেত্রেই একই—বিপুল পরিমাণ দান কোথায়, কীভাবে এবং কার নজরদারিতে হিসাব হয়?
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে নগদ দানের পরিমাণ যত বাড়ছে, ততই আর্থিক ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, একাধিক স্তরের যাচাই এবং স্বচ্ছ হিসাবরক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে।
কত টাকা, কতদিন, কারা?
এখন তদন্তকারীদের সামনে মূলত তিনটি প্রশ্ন—দানবাক্স থেকে অর্থ সরানোর ঘটনা কতদিন ধরে চলছিল, এই চক্রে মোট কতজন জড়িত এবং সব মিলিয়ে কত টাকা আত্মসাৎ হয়েছে?
এর পাশাপাশি ভিআইপি দর্শনের নামে চলা কথিত অবৈধ ব্যবস্থার সঙ্গে এই আর্থিক অনিয়মের কোনও যোগসূত্র ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মন্দির প্রশাসন নগদ অর্থ সংগ্রহ ও গণনার ক্ষেত্রে বাড়তি নজরদারি, সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ এবং কর্মীদের দায়িত্ব বণ্টনে পরিবর্তনের মতো পদক্ষেপ নিচ্ছে বলেও জানা গেছে।
সিদ্ধিবিনায়কের ঘটনা তাই শুধু দানবাক্স থেকে টাকা সরানোর অভিযোগে আটকে নেই। এটি দেশের বড় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলির আর্থিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
কোটি কোটি ভক্তের বিশ্বাস যে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত, সেখানে দানের এক টাকাও কোথায় গেল—তার হিসাব কি যথেষ্ট স্বচ্ছ?
সিদ্ধিবিনায়ক তদন্তের আসল গুরুত্ব সম্ভবত এই প্রশ্নেই।