খবর

ভোটে জেন-জি, সংসদে কোথায়?

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • রাস্তায় আন্দোলন, সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড়, ভোটের সময় রাজনৈতিক দলগুলির বাড়তি নজর—ভারতের রাজনীতিতে জেনারেশন জেড বা জেন-জি-র উপস্থিতি ক্রমশ স্পষ্ট।
  • কিন্তু ভোটের বাক্সে যাদের গুরুত্ব এত বেশি, দেশের আইনসভায় তাদের প্রতিনিধিত্ব কোথায়?
  • ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া এই প্রজন্ম এখন ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

রাস্তায় আন্দোলন, সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড়, ভোটের সময় রাজনৈতিক দলগুলির বাড়তি নজর—ভারতের রাজনীতিতে জেনারেশন জেড বা জেন-জি-র উপস্থিতি ক্রমশ স্পষ্ট। কিন্তু ভোটের বাক্সে যাদের গুরুত্ব এত বেশি, দেশের আইনসভায় তাদের প্রতিনিধিত্ব কোথায়? সেখানেই তৈরি হচ্ছে বড় এক শূন্যতা।

১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া এই প্রজন্ম এখন ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, পরিবেশ, নাগরিক অধিকার, নারী নিরাপত্তা থেকে শুরু করে নতুন প্রযুক্তি—বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলন ও জনমত তৈরিতে জেন-জি-র সক্রিয়তা চোখে পড়ার মতো। সামাজিক মাধ্যমের শর্ট ভিডিও, মিম, ইনফ্লুয়েন্সার এবং ডিজিটাল প্রচারের দৌলতে তাদের কাছে পৌঁছতে রাজনৈতিক দলগুলিও এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি মরিয়া।

কিন্তু ছবির অন্য দিকটি বেশ চমকপ্রদ। ভোটার হিসেবে জেন-জি গুরুত্বপূর্ণ, প্রার্থী হিসেবে যেন তারা এখনও ‘অপেক্ষমাণ’।

ভারতের সংবিধান অনুযায়ী লোকসভা বা বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ন্যূনতম বয়স ২৫ বছর। অর্থাৎ জেন-জি-র একটি বড় অংশই নির্বাচনী রাজনীতিতে সরাসরি নামার যোগ্য। তবু বাস্তবে সংসদে ৩০ বছরের নিচে সাংসদের সংখ্যা অত্যন্ত কম। রাজ্য বিধানসভাগুলিতেও ছবিটা খুব একটা আলাদা নয়।

প্রশ্ন হল, কেন?

রাজনীতির দরজায় প্রথম বাধা টাকা

নির্বাচনে লড়াই মানে শুধু জনপ্রিয়তা নয়। দরকার অর্থ, সংগঠন, কর্মী, প্রচারযন্ত্র এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক। একজন সাধারণ তরুণের পক্ষে এই সবকিছু একসঙ্গে তৈরি করা কঠিন। ফলে ছাত্র রাজনীতি বা যুব সংগঠনে উঠে এলেও অনেক তরুণের রাজনৈতিক যাত্রা মূল দলের দরজায় এসে থমকে যায়।

আরেকটি বড় কারণ দলের অভ্যন্তরীণ কাঠামো। ভারতের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল এখনও প্রবীণ নেতৃত্বনির্ভর। সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ স্তরে তরুণদের জায়গা সীমিত। যুব সংগঠনের নেতাদেরও অনেক সময় মূল দলে গুরুত্বপূর্ণ পদ বা নির্বাচনী টিকিটের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়।

তবে রাজনৈতিক পরিবারের সন্তানদের ক্ষেত্রে ছবিটা অনেক সময় অন্যরকম। পরিচিতি, সংগঠন এবং রাজনৈতিক যোগাযোগের উত্তরাধিকার তাঁদের জন্য প্রবেশের দরজা তুলনামূলকভাবে সহজ করে দেয়।

আন্দোলন আছে, ভোটের ময়দানে রূপান্তর কোথায়?

সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ছাত্র আন্দোলন, চাকরির দাবিতে বিক্ষোভ, পরিবেশ রক্ষা, নারী নিরাপত্তা কিংবা নাগরিক অধিকারের মতো নানা ইস্যুতে জেন-জি-র সক্রিয়তা সামনে এসেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় দ্রুত জনমত তৈরি করা, প্রচার ছড়িয়ে দেওয়া এবং কোনও ইস্যুকে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসার ক্ষমতা এই প্রজন্মের অন্যতম শক্তি।

কিন্তু সেই আন্দোলনের নেতৃত্ব খুব কম ক্ষেত্রেই নির্বাচনী রাজনীতিতে পৌঁছেছে।

এখানেই তৈরি হচ্ছে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফাঁক—আন্দোলনের নেতৃত্ব আর নির্বাচনী নেতৃত্ব এক জিনিস নয়।

রাস্তায় যে তরুণ হাজার মানুষকে সংগঠিত করতে পারেন, ভোটের ময়দানে তাঁকেই প্রার্থী হিসেবে বেছে নিতে রাজনৈতিক দলগুলি কতটা প্রস্তুত? উত্তর এখনও খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়।

তরুণ ভোট চাই, তরুণ নেতা নয়?

রাজনৈতিক দলগুলির দ্বিধাটাও কম নয়। তরুণ ভোটারদের কাছে পৌঁছতে তারা নতুন ভাষা, নতুন প্ল্যাটফর্ম এবং নতুন মুখ ব্যবহার করছে। কিন্তু নির্বাচনে জয়ের প্রশ্ন এলেই অনেক দল ফিরে যায় ‘পরীক্ষিত’ প্রার্থীদের কাছেই।

অর্থাৎ, ক্যাম্পেনের পোস্টারে তরুণ, কিন্তু প্রার্থী তালিকায় পুরনো মুখ—এই বৈপরীত্যই যেন বাস্তবতা।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও তরুণ প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন দেশে তরুণ প্রার্থীদের জন্য দলীয় উদ্যোগ, রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ এবং নির্বাচনী অর্থায়নে সহায়তার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ভারতে অবশ্য এই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা এখনও তুলনামূলকভাবে সীমিত।

যে প্রজন্মের সমস্যা, তারাই কোথায়?

প্রতিনিধিত্বের এই ঘাটতি শুধু সংখ্যার প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নীতিনির্ধারণের প্রশ্নও।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গিগ অর্থনীতি, ডিজিটাল কর্মসংস্থান, জলবায়ু পরিবর্তন, শিক্ষার বদলে যাওয়া কাঠামো, মানসিক সুস্থতা কিংবা অনলাইন নিরাপত্তা—এই বিষয়গুলির সঙ্গে জেন-জি-র দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা সরাসরি যুক্ত। অথচ আইনসভায় এই প্রজন্মের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি যথেষ্ট জায়গা না পেলে নীতিনির্ধারণ এবং তরুণদের প্রত্যাশার মধ্যে দূরত্ব বাড়তেই পারে।

তবে পরিবর্তনের ইঙ্গিত একেবারে নেই, এমনও নয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তরুণ মুখকে মুখপাত্র, প্রচারক এবং সাংগঠনিক দায়িত্বে সামনে আনছে। পঞ্চায়েত ও পুরসভা স্তরেও নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ছে। সম্ভবত এই স্থানীয় রাজনীতিই আগামী দিনে নতুন নেতৃত্বের ‘ট্রেনিং গ্রাউন্ড’ হয়ে উঠতে পারে।

শেষ পর্যন্ত ভারতের জেন-জি এখন এক অদ্ভুত রাজনৈতিক অবস্থানে দাঁড়িয়ে। তারা রাস্তায় দৃশ্যমান, ডিজিটালে প্রভাবশালী, ভোটে গুরুত্বপূর্ণ—শুধু আইনসভায় এখনও যেন অদৃশ্য।

যে প্রজন্মকে জিততে রাজনৈতিক দলগুলির এত চেষ্টা, সেই প্রজন্মকেই যদি সিদ্ধান্ত নেওয়ার টেবিলে জায়গা না দেওয়া হয়, তবে ভারতের গণতন্ত্রে প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নটি ক্রমেই আরও জোরালো হয়ে উঠবে।

আগামী এক দশকে তাই আসল প্রশ্ন শুধু জেন-জি কাকে ভোট দেবে নয়।
প্রশ্নটা আরও বড়—জেন-জি-র মধ্যে থেকে কে ভোট চাইতে দাঁড়াবে?

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles