বাংলাস্ফিয়ার: যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার অন্যতম বড় আকর্ষণ ছিল Optional Practical Training (OPT)। পড়াশোনা শেষ করে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সেখানে কাজ করার সুযোগই হাজার হাজার আন্তর্জাতিক ছাত্রছাত্রীকে, বিশেষ করে ভারতীয়দের, আমেরিকামুখী করেছে। কিন্তু OPT-এর জন্য ১ লক্ষ মার্কিন ডলার ফি ধার্যের যে প্রস্তাব সামনে এসেছে, তা শুধু ভারতীয় ছাত্রছাত্রীদের জন্যই নয়, মার্কিন অর্থনীতি, বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রযুক্তি শিল্পের জন্যও দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ভারত বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের অন্যতম বৃহত্তম উৎস। প্রতি বছর লক্ষাধিক ভারতীয় ছাত্রছাত্রী উচ্চশিক্ষার জন্য আমেরিকায় যান। তাঁদের বড় অংশই STEM (Science, Technology, Engineering and Mathematics) বিষয়ের শিক্ষার্থী। এই পড়ুয়াদের অধিকাংশই শিক্ষাঋণ নিয়ে বিদেশে পড়তে যান। পড়াশোনা শেষ করে OPT-র মাধ্যমে চাকরি করে সেই ঋণ শোধ করার পরিকল্পনাই তাঁদের আর্থিক হিসাবের মূল ভিত্তি।
যদি OPT-এর জন্য ১ লক্ষ ডলার অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়, তবে এই সমীকরণ এক ধাক্কায় ভেঙে পড়বে। অধিকাংশ মধ্যবিত্ত ভারতীয় পরিবারের পক্ষে এই অর্থ জোগাড় করা কার্যত অসম্ভব। ফলে বহু মেধাবী ছাত্রছাত্রী আমেরিকার পরিবর্তে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, জার্মানি কিংবা সিঙ্গাপুরের মতো বিকল্প গন্তব্য বেছে নিতে পারেন।
এর প্রভাব শুধু ছাত্রছাত্রীদের ওপর সীমাবদ্ধ থাকবে না। মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলিও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি-র উপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। বিদেশি পড়ুয়ারা সাধারণত দেশীয় শিক্ষার্থীদের তুলনায় অনেক বেশি ফি দেন। ভারতীয় ছাত্রসংখ্যা কমে গেলে বহু বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক চাপ বাড়বে, গবেষণা প্রকল্পেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
আরও বড় প্রশ্ন প্রযুক্তি শিল্পকে ঘিরে। সিলিকন ভ্যালির অসংখ্য সংস্থা, স্টার্ট-আপ এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক প্রতিভার উপর নির্ভরশীল। OPT হল সেই সেতুবন্ধন, যার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিল্পক্ষেত্রে দক্ষ মানবসম্পদ প্রবেশ করে। এই পথ যদি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে সংস্থাগুলির দক্ষ কর্মী পাওয়া কঠিন হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, সাইবার নিরাপত্তা এবং বায়োটেকের মতো কৌশলগত ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
ভারতীয় শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও ক্ষতির পরিমাণ কম নয়। অনেকেই মার্কিন চাকরির অভিজ্ঞতা অর্জন করে দেশে ফিরে আসেন অথবা আন্তর্জাতিক কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। সেই অভিজ্ঞতা ভারতের প্রযুক্তি ও স্টার্ট-আপ ইকোসিস্টেমকেও সমৃদ্ধ করে। OPT ব্যয়বহুল হয়ে গেলে এই আন্তর্জাতিক দক্ষতা বিনিময়ের প্রবাহও কমে যেতে পারে।
সমর্থকদের যুক্তি, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা মার্কিন চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ান এবং দেশীয় কর্মীদের সুযোগ কমিয়ে দেন। কিন্তু অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশের মতে, বাস্তব চিত্র এতটা সরল নয়। উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন বিদেশি কর্মীরা নতুন উদ্ভাবন, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বহু ভারতীয় শিক্ষার্থী পরবর্তীকালে উদ্যোক্তা হয়ে মার্কিন অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন।
এমন একটি বিপুল অঙ্কের ফি কার্যকর হলে আরেকটি সমস্যা দেখা দিতে পারে। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা হয়তো পড়াশোনার জন্যই অন্য দেশ বেছে নেবেন। একবার যদি এই প্রবণতা তৈরি হয়, তা ফিরিয়ে আনা সহজ হবে না। শিক্ষা বাজারে প্রতিযোগিতা এখন বৈশ্বিক। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন কিংবা ইউরোপের বহু দেশ ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক মেধা আকর্ষণে নানা সুবিধা দিচ্ছে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র যদি প্রবেশের খরচ অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেয়, তবে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকবে।
ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে যাওয়া ভারতীয়দের বড় অংশই প্রথম প্রজন্মের বিদেশে উচ্চশিক্ষাপ্রার্থী। তাঁদের জন্য OPT শুধু চাকরির সুযোগ নয়, শিক্ষার ব্যয় পুনরুদ্ধারের একটি বাস্তব উপায়। সেই পথ কার্যত বন্ধ হয়ে গেলে বিদেশে উচ্চশিক্ষা আবারও সীমিত কয়েকটি সচ্ছল পরিবারের নাগালের মধ্যে আটকে যেতে পারে।
সব মিলিয়ে, OPT-এর জন্য ১ লক্ষ ডলারের ফি কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষা, বৈশ্বিক মেধা প্রবাহ এবং মার্কিন প্রতিযোগিতামূলক শক্তির উপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। ভারতীয় শিক্ষার্থীরা এর প্রথম বড় ভুক্তভোগী হবেন ঠিকই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে সেই যুক্তরাষ্ট্রই, যে দেশ দশকের পর দশক ধরে বিশ্বের সেরা মেধাকে আকর্ষণ করে নিজের অর্থনীতি ও উদ্ভাবনের শক্তি বাড়িয়েছে।
এক লক্ষ ডলারের OPT ফি: ভারতীয় পড়ুয়াদের ধাক্কা, আমেরিকারও আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত
15