ভোটের আগেই দেশছাড়া! রাশিয়া ছেড়ে ফ্রান্সে যুদ্ধবিরোধী নেতা বরিস নাদেঝদিন

যা জানা জরুরি
- রাশিয়ায় সংসদীয় নির্বাচনের আগে বিরোধী কণ্ঠে আরও কড়া লাগাম।
- ক্রেমলিনের চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত দেশ ছাড়লেন যুদ্ধবিরোধী রাজনীতিক বরিস নাদেঝদিন।
- বর্তমানে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে রয়েছেন ৬৩ বছরের এই নেতা।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
রাশিয়ায় সংসদীয় নির্বাচনের আগে বিরোধী কণ্ঠে আরও কড়া লাগাম। ক্রেমলিনের চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত দেশ ছাড়লেন যুদ্ধবিরোধী রাজনীতিক বরিস নাদেঝদিন। বর্তমানে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে রয়েছেন ৬৩ বছরের এই নেতা। নিজেই আইফেল টাওয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে ভিডিও বার্তায় জানিয়েছেন, আপাতত তিনি রাশিয়ার বাইরে।
“একটা ভালো খবর আছে—আমি বেঁচে আছি এবং স্বাধীন আছি। তবে আপাতত আমি রাশিয়ায় নেই,” ভিডিও বার্তায় বলেন নাদেঝদিন। এরপরই তাঁর ইঙ্গিত, এখন বিদেশে থেকেই পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করতে হবে।
পুতিনের বিরুদ্ধে, এবার দেশও ছাড়লেন
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে প্রার্থী হওয়ার চেষ্টা করে আন্তর্জাতিক পরিচিতি পান নাদেঝদিন। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রকাশ্য বিরোধিতা ছিল তাঁর প্রচারের অন্যতম প্রধান বার্তা।
তাঁর প্রচারাভিযান শুরুতে প্রত্যাশার তুলনায় অনেক বেশি জনসমর্থন পেতে শুরু করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রুশ নির্বাচন কমিশন তাঁকে নির্বাচনে লড়ার অনুমতি দেয়নি।
তারপরও যুদ্ধবিরোধী অবস্থান থেকে সরে আসেননি নাদেঝদিন। রাশিয়ার রাজনৈতিক পরিসরে যেখানে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রকাশ্য সমালোচনা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠেছে, সেখানে তাঁর অবস্থান তাঁকে ক্রেমলিনের জন্য আরও অস্বস্তিকর করে তোলে।
নির্বাচনের আগেই তালা
সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় সংসদীয় নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে নাম নথিভুক্ত করার তিন সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে নাদেঝদিনকে অল্প সময়ের জন্য আটক করা হয়।
তাঁর বিরুদ্ধে সামান্য প্রশাসনিক আইনভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়েছিল। তবে রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এর পেছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল তাঁকে ভয় দেখানো এবং নির্বাচনী লড়াই থেকে দূরে রাখা।
এরপরই আরও বড় ধাক্কা আসে। রাশিয়ার বিচার মন্ত্রক তাঁকে ‘বিদেশি এজেন্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করে।
এই তকমার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে কঠোর সরকারি নজরদারি, আর্থিক ও প্রশাসনিক রিপোর্ট জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা এবং রাজনৈতিকভাবে নেতিবাচক পরিচয়ের বোঝা।
ভোটে দাঁড়ানোর পথও বন্ধ
শুধু ‘বিদেশি এজেন্ট’ তকমাতেই থামেনি চাপ। ‘চরমপন্থা-সংক্রান্ত’ একটি প্রশাসনিক মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর সংসদীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার আইনি অধিকারও হারান নাদেঝদিন।
অর্থাৎ ভোটের লড়াইয়ে নামার পথ একেবারেই বন্ধ।
গত মাসে স্বাধীন রুশ সংবাদমাধ্যম মেদুজাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নাদেঝদিন নিজেই বলেছিলেন, সরকারের বাড়তে থাকা চাপের কারণে তিনি এবং তাঁর পরিবার দেশ ছাড়ার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবছেন।
তাঁর ইচ্ছা ছিল রাশিয়াতেই থেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার। কিন্তু কারাবন্দি হওয়ার আশঙ্কা ক্রমশ বাড়তে থাকায় শেষ পর্যন্ত দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
যুদ্ধের বিরোধিতা, শাস্তির ঝুঁকি
২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর রাশিয়ায় বিরোধী মত দমনের মাত্রা আরও বেড়েছে। স্বাধীন সংবাদমাধ্যম, মানবাধিকারকর্মী, নাগরিক সমাজ এবং যুদ্ধবিরোধী রাজনৈতিক কণ্ঠ—সব ক্ষেত্রেই সরকারি চাপ বেড়েছে।
শতাধিক সমালোচক কারাবন্দি হয়েছেন এবং হাজার হাজার রুশ নাগরিক দেশ ছেড়ে বিদেশে আশ্রয় নিয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে নাদেঝদিনের দেশত্যাগকে শুধুমাত্র একজন রাজনীতিকের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন না পর্যবেক্ষকদের একাংশ। তাঁদের মতে, নির্বাচনের আগে এই ঘটনা রাশিয়ার রাজনৈতিক পরিসরে বিরোধীদের জন্য সংকুচিত হয়ে আসা জায়গার আরও একটি নজির।
পুতিনের দুর্গে বিরোধী কে?
সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় সংসদীয় নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পুতিনের শাসক দল ইউনাইটেড রাশিয়া নিম্নকক্ষে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে মরিয়া।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কঠোর সরকারি নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই হবে এই নির্বাচন। ফলে প্রকৃত বিরোধী শক্তির অংশগ্রহণ কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে।
অন্যদিকে ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় রাশিয়ায় মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি-সংক্রান্ত চাপ এবং অর্থনৈতিক উদ্বেগও বাড়ছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষের সম্ভাবনা তৈরি হলেও ক্রেমলিন যে কোনও সংগঠিত রাজনৈতিক বিকল্পকে শক্তিশালী হওয়ার আগেই নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইছে—এমনটাই মনে করছেন পর্যবেক্ষকদের একাংশ।
নাদেঝদিন আপাতত প্যারিসে। রাশিয়ার রাজনীতির বাইরে দাঁড়িয়ে তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। তবে তাঁর দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে নির্বাচনের আগে রাশিয়ার বিরোধী রাজনীতির ছবিটা আরও স্পষ্ট হয়ে গেল—ভোটের ময়দানে নামার আগেই অনেকের লড়াই শেষ হয়ে যাচ্ছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



