Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: কলকাতায় নেমেই তসলিমা নাসরিনের প্রথম অনুভূতি ছিল অত্যন্ত ব্যক্তিগত। তিনি বললেন, “কলকাতায় ফিরে আসা মানে আমার জীবনের হারিয়ে যাওয়া একটি অধ্যায়ে ফিরে আসা।” এই একটি বাক্যেই যেন ধরা পড়ে গেল প্রায় দুই দশকের নির্বাসন, অপেক্ষা, বেদনা এবং এক শহরের সঙ্গে মানুষের গভীর মানসিক সম্পর্ক।
শহরের বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানাতে জড়ো হয়েছিলেন বহু মানুষ। শঙ্খধ্বনি, ফুলের পাপড়ি, উত্তরীয়—সব মিলিয়ে ছিল এক আবেগঘন পরিবেশ। লাল-সাদা শাড়ি পরা তসলিমা বারবার হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানালেন উপস্থিত মানুষকে। বহু বছর পর যে শহরে তিনি ফিরলেন, সেই শহরকেই তিনি বহুদিন ধরে নিজের ‘বাড়ি’ বলে মনে করে এসেছেন।
নির্বাসনের শুরু
তসলিমা নাসরিনের জীবন আসলে এক লেখকের জীবনের চেয়ে অনেক বেশি কিছু। তিনি চিকিৎসক ছিলেন, পরে লেখালেখিকে পেশা করেন। নারীর অধিকার, ধর্মীয় মৌলবাদ, সমাজের কুসংস্কার—এসব নিয়ে তাঁর স্পষ্ট অবস্থান তাঁকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি দেয়। কিন্তু সেই পরিচিতির মূল্যও তাঁকে দিতে হয়েছে।
১৯৯৩ সালে প্রকাশিত লজ্জা উপন্যাস তাঁকে বাংলাদেশে প্রবল বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। পরে প্রাণনাশের হুমকি বাড়তে থাকায় ১৯৯৪ সালে তাঁকে দেশ ছাড়তে হয়। এরপর ইউরোপ, আমেরিকা, ভারত—বহু জায়গায় থেকেছেন, কিন্তু বাংলা ভাষা এবং বাঙালি সংস্কৃতির টান তাঁকে বারবার টেনে এনেছে কলকাতার দিকে।
কেন কলকাতা?
বাংলাদেশ ছেড়ে আসার পর কলকাতাকেই তিনি নিজের সাংস্কৃতিক আশ্রয় বলে মনে করেছিলেন। ভাষা এক, সাহিত্য এক, সংস্কৃতির শিকড়ও একই। এখানেই তিনি দীর্ঘদিন বাস করেছেন, লিখেছেন, সাহিত্যজগতের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন।
কিন্তু ২০০৭ সালে তাঁর আত্মজীবনী দ্বিখণ্ডিতকে কেন্দ্র করে তীব্র প্রতিবাদ, সহিংসতা এবং রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে তাঁকে কলকাতা ছাড়তে বাধ্য করা হয়। সেই বিদায় ছিল আকস্মিক, অসমাপ্ত এবং বেদনাদায়ক। শহর ছেড়ে যাওয়ার পর তিনি বহুবার বলেছেন, কলকাতায় ফিরতে চান, কিন্তু সেই সুযোগ পাননি।
‘অন্যায় চিরস্থায়ী হয় না’
এবারের সফরে তসলিমা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তাঁর কথায়, “আমার কলকাতায় ফিরে আসা প্রমাণ করে, অন্যায় যত দীর্ঘই হোক, তা চিরস্থায়ী নয়।” এই মন্তব্য কেবল ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকাশ নয়; এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, লেখকের নিরাপত্তা এবং গণতান্ত্রিক সমাজের মূল্যবোধ সম্পর্কেও একটি প্রতীকী বক্তব্য।
দীর্ঘ নির্বাসনের পর ফিরে এসে তিনি বলেছেন, যদি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পান, তবে ভবিষ্যতে কলকাতায় স্থায়ীভাবেও থাকতে চান। কারণ এই শহরেই তিনি নিজের ভাষা, সাহিত্য এবং সংস্কৃতির স্বাভাবিক পরিবেশ খুঁজে পান।
শহরের স্মৃতি কি মুছে যায়?
একজন লেখকের কাছে শহর কেবল ভৌগোলিক স্থান নয়। শহর মানে স্মৃতি, সম্পর্ক, ভাষা, পাঠক এবং সৃষ্টির পরিসর।
কলকাতার রাস্তাঘাট, কলেজ স্ট্রিট, বইমেলা, রবীন্দ্রসদন, সাহিত্যসভা—এসবই তসলিমার লেখকজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই তাঁর কাছে কলকাতায় ফেরা মানে শুধু বিমান থেকে নামা নয়; বরং নিজের হারিয়ে যাওয়া সময়কে আবার স্পর্শ করা।
নির্বাসিত মানুষের জীবনে ‘বাড়ি’ শব্দটির অর্থ আলাদা। অনেক সময় একটি শহর পাসপোর্টে থাকে না, কিন্তু স্মৃতিতে থেকে যায়। তসলিমার ক্ষেত্রেও কলকাতা সেই রকমই এক মানসিক ঠিকানা।
বিতর্কের কেন্দ্রেও একজন লেখক
তসলিমা নাসরিনকে ঘিরে বিতর্ক নতুন নয়। তাঁর লেখাকে কেউ সাহসী বলেন, কেউ বিতর্কিত। তাঁর ধর্ম, রাজনীতি কিংবা সমাজ নিয়ে মতামত নিয়ে তীব্র মতভেদ রয়েছে।
কিন্তু মতভেদ থাকলেও একটি বিষয় অস্বীকার করা কঠিন—তিনি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আলোচিত লেখক এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ মুখ।
এই কারণেই তাঁর কলকাতায় প্রত্যাবর্তন শুধু সাহিত্যজগতের ঘটনা নয়; এটি নাগরিক স্বাধীনতা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর নিয়েও নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
বদলে যাওয়া রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
এবারের সফরে রাজ্য সরকারের তরফে তাঁর নিরাপত্তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং জানানো হয়েছে, তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। এই পরিবর্তনও অনেকের নজর কেড়েছে, কারণ ২০০৭ সালে যে পরিস্থিতিতে তাঁকে শহর ছাড়তে হয়েছিল, আজকের ছবি তার সম্পূর্ণ বিপরীত।
তবে এই প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও কম নয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিজেদের অবস্থান থেকে মন্তব্য করেছে। ফলে তসলিমার সফর সাহিত্যিক ঘটনার পাশাপাশি রাজনৈতিক তাৎপর্যও পেয়েছে।
প্রত্যাবর্তনের আসল অর্থ
তসলিমা নাসরিনের কলকাতায় ফেরা আসলে এক লেখকের বাড়ি ফেরা, আবার একই সঙ্গে এক অসমাপ্ত ইতিহাসেরও পুনরারম্ভ।
একসময় যে শহর তাঁকে আশ্রয় দিয়েছিল, আবার রাজনৈতিক চাপে বিদায়ও দিয়েছিল, সেই শহরেই তিনি ফিরে এসে বললেন—“কলকাতায় ফিরে আসা মানে আমার জীবনের হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়ে ফিরে আসা।”
এই বাক্যের মধ্যে শুধু ব্যক্তিগত আবেগ নেই; আছে বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসা, নির্বাসনের দীর্ঘ যন্ত্রণা, স্মৃতির অমোচনীয় টান এবং মানুষের সেই চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা—যেখানেই থাকি, শেষ পর্যন্ত ফিরতে চাই নিজের পরিচিত আকাশের নীচে, নিজের ভাষার মানুষের কাছে।
তসলিমার এই প্রত্যাবর্তন ইতিহাসের সব বিতর্কের অবসান ঘটাবে কি না, তা সময় বলবে। কিন্তু এটুকু নিশ্চিত, উনিশ বছরের অপেক্ষার পর তাঁর কলকাতায় ফেরা বাংলা সাহিত্য ও উপমহাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে একটি স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।