বাংলাস্ফিয়ার: দিল্লি হাইকোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি এ পি শাহ শুক্রবার অভিযোগ করেন, দেশে কর্মী, ভিন্নমতাবলম্বী, ছাত্র, সাংবাদিক ও সরকারের সমালোচকদের মুখ বন্ধ করতে নানান ধরনের আইন এবং প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি ২০২০ সালের দিল্লি দাঙ্গা-সংক্রান্ত বেআইনি কার্যকলাপ (নিবারণ) আইন (ইউএপিএ) মামলায় অভিযুক্ত উমর খালিদের দীর্ঘ কারাবাসের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, তিনি মূলত একজন “রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বী” হওয়ার কারণেই এখনও কারাগারে বন্দি।

গোয়া হাইকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে ‘নাগরিক স্বাধীনতা রক্ষায় বিচারব্যবস্থার ভূমিকা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে গিয়ে বিচারপতি শাহ বলেন, “আমি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। সারা দেশে এখনও কিছু স্বাধীনচেতা বিচারক অবশ্যই রয়েছেন। কিন্তু আমাদের উদ্বেগের বিষয় হওয়া উচিত, তাঁদের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে।”

তিনি বলেন, “সবচেয়ে আলোচিত আটক ব্যক্তিদের মধ্যে একজন হলেন উমর খালিদ। বিচার শুরু না হয়েই তিনি সাত বছর ধরে কারাগারে রয়েছেন। অথচ বহু ভয়ঙ্কর অপরাধী, এমনকি নৃশংস হত্যাকারীরাও সহজেই জামিন বা সাজা মকুবের সুবিধা পাচ্ছেন। উত্তর ভারতের এক স্বঘোষিত ধর্মগুরুকেও সেই সুবিধা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু উমর খালিদের মতো রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীরা বছরের পর বছর জেলেই থেকে যাচ্ছেন।”

মতপ্রকাশের স্বাধীনতার গুরুত্ব তুলে ধরে বিচারপতি শাহ বলেন, ইতিহাস জুড়ে সুপ্রিম কোর্ট বারবার স্বীকার করেছে যে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। মুক্ত রাজনৈতিক বিতর্ক মানুষের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তোলে এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির কার্যকারিতা নিশ্চিত করে। একটি সুস্থ গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে ভিন্নমতকে সম্মান এবং সহনশীলতার সঙ্গে গ্রহণ করা অপরিহার্য।

তিনি বলেন, “সমালোচনার জবাব দেওয়ার সর্বোত্তম উপায় তা বন্ধ করে দেওয়া নয়; বরং সমালোচকের সঙ্গে সংলাপে বসা এবং তাঁর বক্তব্যের উত্তর দেওয়া। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আজ দেশের ক্ষমতাসীনদের কাছে এই নীতি যেন বিস্মৃত হয়েছে।”

বিচারপতি শাহের অভিযোগ, বর্তমানে সমাজকর্মী, ভিন্নমতাবলম্বী, রাজনৈতিক কার্টুনশিল্পী এবং সরকারের সমালোচকদের চুপ করিয়ে দিতে নানান আইন ও প্রশাসনিক হাতিয়ার ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “যদি একদল তরুণ কোনও রাজনীতিকের জবাবদিহি দাবি করে তাঁর পদত্যাগ চায়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের হয়, লাঠিচার্জ করা হয়।”

সাম্প্রতিক নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে দেশজুড়ে ছাত্র আন্দোলনের প্রসঙ্গও টেনে আনেন বিচারপতি শাহ। তাঁর মতে, এই আন্দোলন কেবল একটি পরীক্ষাকে ঘিরে ক্ষোভ নয়, বরং “গণতান্ত্রিক শক্তির পুনর্জাগরণের প্রতীক”। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মনে করা হচ্ছিল দেশে ভিন্নমত প্রকাশের পরিসর সংকুচিত হয়েছে, নাগরিক সমাজ ক্লান্ত, রাজনৈতিক বিরোধীরা দুর্বল এবং সমালোচনার জায়গা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু তরুণ প্রজন্ম দেখিয়ে দিয়েছে যে ভারতের গণতান্ত্রিক চেতনা এখনও জীবন্ত। তাঁর দাবি, আন্দোলন শান্তিপূর্ণ ছিল এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মতো যুক্তিসঙ্গত দাবির ভিত্তিতেই গড়ে উঠেছিল।

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রসঙ্গ টেনে বিচারপতি শাহ বলেন, “যদি কোনও সংবাদমাধ্যম ক্ষমতাসীন সরকারের সমালোচনা করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কর-সংক্রান্ত মামলা বা আর্থিক তদন্ত শুরু হয়। বহু বছর ধরে হয়রানির পর শেষ পর্যন্ত তারা আদালত থেকে স্বস্তি পায়। পরে আদালতই বলে অভিযোগের কোনও ভিত্তি ছিল না। কিন্তু ততদিনে তারা দীর্ঘদিন ভোগান্তির শিকার হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, আজ এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে, কেউ যদি কোনও স্ট্যান্ড-আপ কৌতুক অভিনেতার বক্তব্যে আপত্তি তোলেন, তাহলে শুধু শিল্পীকেই নয়, অনুষ্ঠানের আয়োজকদেরও গ্রেফতার করা হচ্ছে। জামিন পেতেও অনেক সময় সপ্তাহ বা মাস কেটে যাচ্ছে।

বিচারপতি শাহের মতে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা, বিচারবহির্ভূত বুলডোজার অভিযান ঠেকানো, তথাকথিত ‘এনকাউন্টার’ হত্যার বিরুদ্ধে নাগরিকদের সুরক্ষা এবং সম্প্রতি ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলির ক্ষেত্রে বিচারব্যবস্থা প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করতে পারেনি। এর ফলে নাগরিকের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা রক্ষায় বিচারব্যবস্থা তার সাংবিধানিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠছে।

বুলডোজার অভিযান নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বিচারপতি শাহ। তাঁর বক্তব্য, সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশিকা জারি করলেও বিভিন্ন রাজ্য সরকার তা “নির্ভয়ে অমান্য” করে চলেছে।

তিনি বলেন, “আজ বুলডোজার এমন এক ক্ষমতার প্রতীক, যা আইনগত অনুমোদন বা বৈধ কর্তৃত্ব ছাড়াই প্রয়োগ করা হচ্ছে। এখানে রাষ্ট্র একই সঙ্গে তদন্তকারী, অভিযোগকারী, বিচারক এবং শাস্তি কার্যকরকারী—সব ভূমিকাই পালন করছে। বিচার ছাড়াই অভিযুক্তদের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। শুধু বাড়ি ভাঙাই নয়, এর ফলে গোটা পরিবার ও সম্প্রদায়ের জীবন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।”

তিনি দাবি করেন, ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে জোরপূর্বক উচ্ছেদের ঘটনা ৩১৭ শতাংশ বেড়েছে। ২০২২ ও ২০২৩ সালে যেসব বাড়ি ভাঙা হয়েছে, তার ৮৯ শতাংশই মুসলিম, তফসিলি জাতি (এসসি), তফসিলি জনজাতি (এসটি) অথবা অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির (ওবিসি) মানুষের।

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টে দায়ের হওয়া একাধিক আদালত অবমাননার মামলায় অভিযোগ ছিল যে, রাজ্য প্রশাসন নির্বিচারে বাড়ি ভাঙার বিরুদ্ধে আদালতের নির্দেশ মানেনি। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট সেই মামলাগুলি সংশ্লিষ্ট হাইকোর্টে পাঠিয়ে চার মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দেয়, মূল প্রশ্নে কোনও মত প্রকাশ করেনি।

এ প্রসঙ্গে বিচারপতি শাহ বলেন, “আইনজীবীরা যুক্তি দিয়েছিলেন যে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদেরই বেছে বেছে নিশানা করা হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, একটি নির্দেশমূলক রায়ের প্রকৃত মূল্য কী, যদি সেই রায়দানকারী আদালতই তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে না চায়? আমরা দেখেছি, হাইকোর্টে এই ধরনের মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। এদিকে বুলডোজারের শিকার মানুষ তাঁদের বাড়িঘর ও আশ্রয় হারান। তাঁদের প্রয়োজনীয় প্রতিকার কে দেবে?”

তিনি আরও বলেন, সরকার যখনই নিজেদের জন্য কোনও হুমকি অনুভব করে, তখনই নাগরিকদের মৌলিক যোগাযোগের অধিকার সীমিত করা হয়। “বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করার ঘটনা ভারতে ঘটে। সম্প্রতি দিল্লিতেও কিছু সময়ের জন্য মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ রাখা হয়েছিল। সব মিলিয়ে রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত জনপরিসর গড়ে তোলার একটি প্রবণতা স্পষ্ট। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর এক ধরনের ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আদালতও অনেক ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলির দ্রুত শুনানি করতে অনীহা দেখায়।”

বিচারপতি শাহ বলেন, রাস্তা, আদালত এবং সংসদ—এই তিনটিই একটি গণতান্ত্রিক সমাজের পরস্পর-পরিপূরক স্তম্ভ।

বক্তব্যের শেষে তিনি বলেন, “বিচারকদের বীরোচিত কর্মী হয়ে ওঠার প্রয়োজন নেই। তাঁদের শুধু স্বাধীন ও নির্ভীকভাবে নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। আইনের শাসন, প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতি এবং সংবিধানের নৈতিক মূল্যবোধের প্রতি অবিচল থেকে বিচার করাই তাঁদের কর্তব্য।”