বাংলাস্ফিয়ার: গভীর ঘুমের মধ্যে হঠাৎ উঠে বসে চিৎকার করা, আতঙ্কে হাত-পা ছোড়াছুড়ি করা, ঘরের মধ্যে দৌড়ে বেড়ানো—এমন দৃশ্য অনেকের কাছেই ভয়াবহ মনে হতে পারে। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে বলা হয় ‘নাইট টেরর’ (Night Terror) বা রাত্রিকালীন আতঙ্কজনিত ঘুমের ব্যাধি। এটি দুঃস্বপ্ন বা ঘুমের মধ্যে হাঁটা (স্লিপওয়াকিং)-এর মতো নয়; বরং গভীর, ধীর-তরঙ্গ (স্লো-ওয়েভ) ঘুম থেকে আংশিক জেগে ওঠার সময় মস্তিষ্কের এক অদ্ভুত অবস্থার ফল।
প্যারিসের পিতিয়ে-সালপেত্রিয়ের হাসপাতালের ঘুমজনিত রোগ বিশেষজ্ঞ স্নায়ুবিজ্ঞানী ইসাবেল আর্নুলফ একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন। এক তরুণী গভীর ঘুমে ছিলেন। হঠাৎ উঠে বসে চোখ বড় বড় করে চিৎকার করতে শুরু করেন এবং আতঙ্কে নিজের চুল হাত দিয়ে ঝাড়তে থাকেন, যেন চুলে ভয়ংকর কিছু লেগে আছে। ঘুম পরীক্ষার সময় ঘটনাটি ভিডিওতে ধরা পড়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নাইট টেরর সাধারণত রাতের প্রথম ভাগে, গভীর ঘুমের পর্ব শেষ হওয়ার সময় শুরু হয়। এর আগে শরীরে হঠাৎ তীব্র ‘ফাইট অর ফ্লাইট’ প্রতিক্রিয়া সক্রিয় হয়। হৃদস্পন্দন দ্রুত বেড়ে যায়, চোখের মণি বড় হয়ে যায়, রক্তনালি সংকুচিত হয় এবং শরীর বিপদের জন্য প্রস্তুত হয়ে ওঠে।
মস্তিষ্কের অর্ধেক জাগে, অর্ধেক ঘুমিয়ে থাকে
নাইট টেররের সময় মস্তিষ্কের সব অংশ একসঙ্গে জাগে না। বিচার-বিবেচনা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত ফ্রন্টাল লোব এবং স্মৃতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিপোক্যাম্পাস তখনও ঘুমিয়ে থাকে। কিন্তু শরীরের নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণকারী অংশ এবং ভয়-আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী অ্যামিগডালা ও লিম্বিক সিস্টেম জেগে ওঠে। ফলে ব্যক্তি চোখ খুলে নড়াচড়া করলেও বাস্তব পরিস্থিতি বুঝতে পারেন না।
দুঃস্বপ্ন নয়
অনেকে নাইট টেররকে দুঃস্বপ্ন বলে মনে করেন। কিন্তু দুটির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
দুঃস্বপ্ন সাধারণত র্যাপিড আই মুভমেন্ট (REM) ঘুমের সময় হয় এবং ঘুম ভাঙার পর মানুষ স্বপ্নের কাহিনি মনে রাখতে পারেন। অন্যদিকে নাইট টেরর হয় গভীর স্লো-ওয়েভ ঘুমে। এর সময় মানুষ ভয়াবহ বিপদের অনুভূতি পেলেও পরে সাধারণত কিছুই মনে থাকে না।
গবেষণায় দেখা গেছে, নাইট টেররের সময় অনেকেই মনে করেন ছাদ ভেঙে পড়ছে, কেউ আক্রমণ করছে, শিশু খাট থেকে পড়ে যাচ্ছে বা শরীরে মাকড়সা উঠে এসেছে। আতঙ্কের অনুভূতি এতটাই বাস্তব হয় যে তাঁরা নিজের বা অন্যের প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করেন।
শিশুদের মধ্যে বেশি
প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে একটি পর্ব সাধারণত এক মিনিটেরও কম স্থায়ী হয়। কিন্তু শিশুদের ক্ষেত্রে তা প্রায় ১০ মিনিট পর্যন্ত চলতে পারে।
৩ থেকে ১০ বছর বয়সি প্রায় ১৫ শতাংশ শিশুর জীবনে অন্তত একবার নাইট টেরর হয়। এদের এক-তৃতীয়াংশ পরবর্তীকালে স্লিপওয়াকিংয়ের সমস্যায়ও ভোগে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সমস্যা কমে যায়। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে এর হার মাত্র ২.২ শতাংশ, এবং প্রধানত ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সিদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
যাঁদের পরিবারে এই সমস্যার ইতিহাস রয়েছে, যাঁরা পর্যাপ্ত ঘুমান না, রাতের শিফটে কাজ করেন অথবা পুলিশ, দমকলকর্মী বা জরুরি পরিষেবার কর্মীদের মতো অত্যন্ত চাপের পেশায় যুক্ত—তাঁদের নাইট টেররের ঝুঁকি বেশি।
তবে গবেষকদের মতে, সাধারণ উদ্বেগ বা উৎকণ্ঠায় ভোগা ব্যক্তিদের মধ্যে এই সমস্যা অন্যদের তুলনায় বেশি দেখা যায়—এমন প্রমাণ মেলেনি।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি
নাইট টেরর নিজে প্রাণঘাতী নয়। কিন্তু ওই অবস্থায় মানুষ নিজের অজান্তেই দুর্ঘটনার শিকার হতে পারেন।
যুক্তরাষ্ট্রের এক শেরিফ ঘুমের মধ্যে আতঙ্কে ভেবেছিলেন, ঘরে ডাকাত ঢুকেছে। তিনি রিভলভার তুলে গুলি চালান। পরে সকালে ঘুম ভেঙে দেখেন, তিনি নিজের পায়েই গুলি করেছেন।
কী করবেন?
চিকিৎসকদের পরামর্শ—
পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন।
অতিরিক্ত ঘুমের ঘাটতি এড়িয়ে চলুন।
যাঁদের এই সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে দোতলা খাট ব্যবহার না করাই ভালো।
রাতে দরজা-জানালা নিরাপদে বন্ধ রাখুন।
নাইট টেররের সময় জোর করে ঘুম ভাঙানোর চেষ্টা করবেন না। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। বরং ব্যক্তি যাতে নিজে বা অন্যের ক্ষতি না করেন, সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।