Table of Contents
গৌতম বুদ্ধ বোধিলাভের পর প্রথম ধর্মদেশনা দিয়েছিলেন বলে যে স্থানটি বিশ্বজুড়ে বৌদ্ধদের কাছে পরম পবিত্র, সেই সারনাথ এবার ইউনেস্কোর বিশ্বঐতিহ্যের (World Heritage) স্বীকৃতি পেল। এর ফলে ভারতের ইউনেস্কো স্বীকৃত বিশ্বঐতিহ্যস্থলের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৪৫।
এ মাসের শুরুতে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর বিশ্বঐতিহ্য কমিটির ৪৮তম অধিবেশনে সারনাথকে এই মর্যাদা দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৯৮৩ সালে অজন্তা গুহা, ইলোরা গুহা এবং আগ্রা ফোর্টকে বিশ্বঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার মধ্য দিয়ে ভারতের যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, সারনাথ তার সর্বশেষ সংযোজন।
বর্তমানে ভারতের ৪৫টি বিশ্বঐতিহ্যস্থলের মধ্যে ৩৭টি সাংস্কৃতিক, ৭টি প্রাকৃতিক এবং ১টি মিশ্র ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত। এই সংখ্যার বিচারে বিশ্বের দেশগুলির মধ্যে ভারতের অবস্থান ষষ্ঠ। গত চার দশকে ভারতের বিশ্বঐতিহ্যের তালিকা শুধু স্থাপত্যকীর্তিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তাতে যুক্ত হয়েছে ঐতিহাসিক নগরী, সাংস্কৃতিক ভূদৃশ্য এবং জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ পরিবেশও।
বিশ্বঐতিহ্য ভাবনার সূচনা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের পরে বিশ্বের নানা প্রান্তের ঐতিহাসিক স্থাপনা, জাদুঘর ও নগরীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি আন্তর্জাতিক মহলে এক নতুন ভাবনার জন্ম দেয়—মানবজাতির অভিন্ন ঐতিহ্য রক্ষায় বৈশ্বিক সহযোগিতা প্রয়োজন।
এই প্রেক্ষাপটে ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ইউনেস্কো, যার অন্যতম লক্ষ্য ছিল শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ।
বিশ্বঐতিহ্য কনভেনশনের প্রত্যক্ষ পূর্বসূরি ছিল ১৯৫৯ সালের একটি ঐতিহাসিক উদ্যোগ। মিশর যখন আসওয়ান হাই ড্যাম নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন নীল নদের জলে ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয় আবু সিম্বেল ও ফিলে-র প্রাচীন মন্দিরগুলির। ইউনেস্কোর আহ্বানে ৫০টিরও বেশি দেশ অর্থ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে এই মন্দিরগুলি স্থানান্তর করে রক্ষা করে। এই সাফল্যই প্রমাণ করে, মানবসভ্যতার অমূল্য ঐতিহ্য রক্ষার দায়িত্ব গোটা বিশ্বের।
এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭২ সালের ১৬ নভেম্বর প্যারিসে ইউনেস্কোর সাধারণ সম্মেলনে গৃহীত হয় বিশ্ব সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ কনভেনশন। এর মাধ্যমে গড়ে ওঠে বিশ্বঐতিহ্য তালিকা এবং এমন এক আন্তর্জাতিক কাঠামো, যার মাধ্যমে ব্যতিক্রমী সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক গুরুত্বসম্পন্ন স্থানগুলিকে চিহ্নিত, সংরক্ষণ ও রক্ষার ব্যবস্থা করা হয়।
কীভাবে বিশ্বঐতিহ্যের স্বীকৃতি মেলে?
ইউনেস্কোর বিশ্বঐতিহ্যের স্বীকৃতি পাওয়ার প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও কঠোর।
প্রথমে কোনও স্থানকে সংশ্লিষ্ট দেশের টেন্টেটিভ লিস্ট বা সম্ভাব্য মনোনয়নের তালিকায় থাকতে হয়। এই তালিকায় না থাকলে কোনও স্থানকে মনোনীত করা যায় না।
এরপর ইউনেস্কোর নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রাথমিক মূল্যায়নের মাধ্যমে দেখা হয়, স্থানটি আদৌ ‘অসাধারণ সার্বজনীন মূল্য’ (Outstanding Universal Value বা OUV) প্রমাণ করতে পারবে কি না।
পূর্ণাঙ্গ মনোনয়নপত্র জমা পড়ার পর প্রায় ১৪ মাস ধরে তা পরীক্ষা করে ইউনেস্কোর বিশেষজ্ঞ সংস্থাগুলি। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মূল্যায়ন করে আইকমস (ICOMOS), প্রাকৃতিক ঐতিহ্য পরীক্ষা করে আইইউসিএন (IUCN) এবং সংরক্ষণ সংক্রান্ত পরামর্শ দেয় আইসিসিআরওএম (ICCROM)।
সবশেষে ২১ সদস্যের বিশ্বঐতিহ্য কমিটি সিদ্ধান্ত নেয় কোনও স্থানকে তালিকাভুক্ত করা হবে, আরও তথ্য চাওয়া হবে, স্থগিত রাখা হবে নাকি প্রত্যাখ্যান করা হবে।
স্বীকৃতি পেতে হলে অন্তত ১০টি নির্ধারিত মানদণ্ডের একটিতে উত্তীর্ণ হতে হয়। এর মধ্যে ৬টি সাংস্কৃতিক এবং ৪টি প্রাকৃতিক মানদণ্ড। পাশাপাশি ঐতিহাসিক সত্যতা, অখণ্ডতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের উপযুক্ত ব্যবস্থাও থাকতে হয়।
ভারতের বিশ্বঐতিহ্য অভিযাত্রা
ভারত ১৯৭৭ সালে বিশ্বঐতিহ্য কনভেনশনে যোগ দেয়। এরপর ১৯৮৩ সালে প্রথমবারের মতো অজন্তা গুহা, ইলোরা গুহা এবং আগ্রা ফোর্টইউনেস্কোর বিশ্বঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পায়।
অজন্তা স্বীকৃতি পায় খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক থেকে খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতকের অনন্য বৌদ্ধ চিত্রকলা ও ভাস্কর্যের জন্য। ইলোরা গুহামালায় একই স্থানে বৌদ্ধ, হিন্দু ও জৈন ধর্মীয় শিল্পকলার সহাবস্থান তাকে অনন্য করে তুলেছে। আগ্রা ফোর্ট মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে নির্মিত শক্তিশালী সাম্রাজ্যিক স্থাপত্যের প্রতীক।
১৯৮৪ সালে তালিকায় যুক্ত হয় তাজমহল এবং কোনারকের সূর্য মন্দির। পরে একে একে স্থান পেয়েছে ঐতিহাসিক শহর, পাহাড়ি রেলপথ, জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ অঞ্চল এবং সাংস্কৃতিক ভূদৃশ্য।
দিল্লির কুতুব মিনার ও তার স্মৃতিসৌধ, হুমায়ুনের সমাধি এবং পরে লালকেল্লাও এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
সারনাথের অন্তর্ভুক্তি ভারতের বিশ্বঐতিহ্যের ইতিহাসে নতুন মাইলফলক। এটি শুধু একটি গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধ প্রত্নস্থলই নয়, ধর্মীয় ও বৌদ্ধিক ইতিহাসেও এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই স্বীকৃতি?
ইউনেস্কোর বিশ্বঐতিহ্যের মর্যাদা আন্তর্জাতিক স্তরে কোনও সাংস্কৃতিক বা প্রাকৃতিক স্থানের সর্বোচ্চ স্বীকৃতিগুলির একটি। এর অর্থ, সেই স্থান মানবজাতির যৌথ ঐতিহ্যের অংশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তা সংরক্ষণ করা জরুরি।
এই স্বীকৃতির ফলে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সহায়তা, বৈজ্ঞানিক নথিভুক্তিকরণ এবং অনেক ক্ষেত্রে সংরক্ষণমূলক সহযোগিতা পাওয়ার সুযোগ বাড়ে। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি বৃদ্ধি পাওয়ায় পর্যটনও বাড়তে পারে, যার সুফল মেলে স্থানীয় অর্থনীতি, হোটেল শিল্প, হস্তশিল্প এবং ঐতিহ্যনির্ভর জীবিকায়।
তবে এই মর্যাদা কোনও স্থানের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয় না। অতিরিক্ত পর্যটন, বাণিজ্যিকীকরণ, দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং নগরায়ণের চাপ এখনও বহু বিশ্বঐতিহ্যস্থলের বড় চ্যালেঞ্জ। তাই এই স্বীকৃতির সঙ্গে যুক্ত থাকে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের দায়িত্বও।
অজন্তা-ইলোরার শিলাগুহা থেকে সারনাথের পবিত্র ভূমি—ভারতের বিশ্বঐতিহ্যের এই দীর্ঘ যাত্রা দেখায়, ঐতিহ্য রক্ষার ধারণাও সময়ের সঙ্গে বিস্তৃত হয়েছে। শুধু প্রাচীন স্থাপত্য নয়, ইতিহাস, সংস্কৃতি, প্রকৃতি ও মানবসভ্যতার সম্মিলিত উত্তরাধিকার সংরক্ষণই আজ বিশ্বঐতিহ্য ধারণার মূল ভিত্তি। সারনাথের স্বীকৃতি সেই দীর্ঘ অভিযাত্রায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।