Table of Contents
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত আপাতত থেমেছে। কিন্তু যুদ্ধবিরতি যে পশ্চিম এশিয়ায় স্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে এনেছে, তা নয়। বরং সংঘাতের ধাক্কায় বদলাতে শুরু করেছে গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তা সমীকরণ। একদিকে উপসাগরীয় দেশগুলি নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে পাকিস্তানের দিকে আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে, অন্যদিকে ফের সক্রিয় হয়ে উঠছে ইয়েমেনের হুথি ফ্রন্ট।
প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত, ইরানে মার্কিন হামলা এবং তার পাল্টা জবাবে উপসাগরীয় আরব দেশগুলিতে ইরানের আঘাতের পর ২৫ জুলাই আপাতত হামলা বন্ধ হয়েছে। কিন্তু হরমুজ প্রণালি, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে মূল বিরোধ এখনও মেটেনি।
বরং যুদ্ধের পরের পর্বে ঢুকে পড়েছে পশ্চিম এশিয়া—যেখানে সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি শুরু হয়েছে নতুন কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশ।
উপসাগরের নতুন ভরসা পাকিস্তান?
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলিকে ফের মনে করিয়ে দিয়েছে, শুধুমাত্র বিদেশি অস্ত্র ও নিরাপত্তা-গ্যারান্টির উপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন। তাই নিজেদের সামরিক দক্ষতা, প্রশিক্ষণ এবং প্রতিরক্ষা অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করার দিকে নজর দিচ্ছে তারা।
এই প্রেক্ষাপটেই ২৬ জুলাই কুয়েত ২০২৩ সালের জুনে পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি পাঁচ বছরের জন্য অনুমোদন করেছে। পরদিন কাতারও দোহায় দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে পাকিস্তানের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও জোরদারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
কুয়েত-পাকিস্তান চুক্তিতে সামরিক প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা থেকে শুরু করে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান, রসদ ব্যবস্থাপনা, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, গবেষণা এবং বিশেষজ্ঞ বিনিময়ের মতো বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তবে এই চুক্তিকে ২০২৫ সালে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক হবে না। কুয়েতের চুক্তিতে এক দেশ আক্রান্ত হলে অন্য দেশকে বাধ্যতামূলকভাবে সামরিক সহায়তা দেওয়ার শর্ত নেই।
তাহলে পাকিস্তানের প্রতি এই বাড়তি আগ্রহ কেন?
উত্তরটা সম্ভবত সরাসরি যুদ্ধ নয়, দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তোলার অংশীদারিত্ব।
সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতার ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। পাকিস্তান সৌদি আরবের হয়ে ইরান বা হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে নামেনি। ফলে উপসাগরীয় দেশগুলির কাছে ইসলামাবাদের গুরুত্ব এখন অনেকটাই সামরিক সক্ষমতা, প্রশিক্ষণ ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার অংশীদার হিসেবে।
হরমুজে ইরানের দখল অটুট
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের আরেকটি বড় প্রশ্ন হরমুজ প্রণালি। মার্কিন সামরিক অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য ছিল এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে ইরানের হস্তক্ষেপের সক্ষমতা দুর্বল করা। কিন্তু এখনও পর্যন্ত সেই লক্ষ্য পুরোপুরি পূরণ হয়েছে বলা যাচ্ছে না।
হরমুজের উপর তেহরানের প্রভাব অটুট রয়েছে। ইরান ও ওমান যৌথ প্রশাসন নিয়ে প্রযুক্তিগত আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি এই আলোচনায় সৌদি আরবকেও যুক্ত করেছে তেহরান।
২৮ জুলাই ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং সৌদি বিদেশমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহানের বৈঠকও সেই পরিবর্তিত কূটনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অর্থাৎ, সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি আঞ্চলিক শক্তিগুলি নিজেদের মধ্যে নতুন সমঝোতার পথও খুঁজছে।
ওয়াশিংটন-তেহরান: যুদ্ধ থামলেও দূরত্ব কমেনি
২৭ জুলাই রাষ্ট্রসংঘে মার্কিন রাষ্ট্রদূত জানান, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফের আলোচনার সুযোগ দিতে চান। ট্রাম্পের দাবি, ইরানের অনুরোধেই ‘বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনা’ শুরু হয়েছে।
তেহরান অবশ্য সেই দাবি অস্বীকার করেছে। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম তাসনিমের বক্তব্য, আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে ওয়াশিংটনই।
ফলে যুদ্ধবিরতি হলেও দুই পক্ষের মধ্যে আস্থার ঘাটতি স্পষ্ট। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কোনও স্থায়ী সমাধান এখনও হয়নি।
এর উপর সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ‘১২৩ চুক্তি’ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার হিসাবকে আরও জটিল করেছে। ২২ জুলাই স্বাক্ষরিত এই চুক্তি দুই দেশের অসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার পথ খুলেছে।
ভবিষ্যতে সৌদি আরব নিজস্ব ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার পেলে ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে আরও অনীহা দেখাতে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
ফলে সামরিক সংঘাত থেমে গেলেও পারমাণবিক প্রতিযোগিতার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
ফের জ্বলছে ইয়েমেন ফ্রন্ট
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলির একটি হল সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুথিদের মধ্যে ফের উত্তেজনা বৃদ্ধি।
২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর সৌদি-হুথি সংঘাত অনেকটাই স্তিমিত ছিল। কিন্তু ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের আবহে পরিস্থিতি ফের বদলাতে শুরু করেছে।
১৪ জুলাই সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনের নির্বাসিত সরকারের সানা বিমানবন্দরে হামলার পর হুথিরা সৌদি ভূখণ্ডে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। পাশাপাশি বাব-এল-মান্দেব প্রণালিতে সৌদি জাহাজ চলাচলের বিরুদ্ধে কার্যত নৌ অবরোধের হুমকি দেয়।
পাল্টা সৌদি আরব হুথি-নিয়ন্ত্রিত হোদেইদা বন্দরে হামলা চালায়। ইয়েমেনের প্রায় ৭০ শতাংশ পণ্য ও ত্রাণ এই বন্দর দিয়ে প্রবেশ করায় হামলার তাৎপর্যও ছিল বড়।
এরপর হুথিদের হামলায় সৌদি আরামকোর জাজান শোধনাগারের কার্যক্রম আংশিকভাবে ব্যাহত হয়। প্রতিদিন প্রায় চার লক্ষ ব্যারেল উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন এই স্থাপনায় হামলা সৌদি আরবের জন্য নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি করেছে।
তবে এই উত্তেজনা সত্ত্বেও রিয়াধ যে পূর্ণমাত্রার ইয়েমেন যুদ্ধে ফিরতে চাইছে, তার স্পষ্ট প্রমাণ এখনও নেই।
২০১৯ সালে আবকাইক ও খুরাইসের আরামকো স্থাপনায় হামলার পর সৌদি আরব বুঝেছিল, ইরান ও তার মিত্রদের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধের চেয়ে কূটনৈতিক যোগাযোগ অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে।
তাই হুথিদের সঙ্গে সরাসরি বড় সংঘাতে না গিয়ে ইরানের অন্যান্য মিত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলাই আপাতত রিয়াধের কৌশল বলে মনে হচ্ছে।
পারমাণবিক স্থাপনাও এখন নতুন চিন্তা
সৌদি আরবের অসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্নটিও ক্রমশ জড়িয়ে যাচ্ছে।
সংযুক্ত আরব আমিরশাহির বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ড্রোন হামলার ঘটনা পারমাণবিক স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। ভবিষ্যতে যদি সৌদি আরবের কোনও পারমাণবিক স্থাপনা হুথিদের হামলার লক্ষ্য হয়, তার পরিণতি তেল স্থাপনায় হামলার তুলনায় অনেক বেশি বিপজ্জনক হতে পারে।
এই কারণেই উপসাগরীয় দেশগুলির কাছে এখন শুধু সামরিক শক্তি নয়, নিরাপত্তা অবকাঠামোর স্থিতিশীলতাও বড় অগ্রাধিকার।
সামনে কী?
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত আপাতত থেমেছে ঠিকই, কিন্তু পশ্চিম এশিয়ায় সংকটের মূল কারণগুলি রয়ে গেছে। হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের অবস্থান, পারমাণবিক কর্মসূচি, সৌদি আরবের নতুন পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং ইয়েমেনে হুথিদের সক্রিয়তা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত অনিশ্চিত।
তার উপর যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়ছে মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডার, সেনা মোতায়েন এবং আঞ্চলিক মিত্রদের উপরও।
ফলে আগামী দিনে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ততটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে উপসাগরীয় দেশগুলির নিজস্ব প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা এবং নতুন মিত্র খোঁজা।
আর সেই নতুন সমীকরণেই পাকিস্তানের গুরুত্ব বাড়ছে।
অর্থাৎ, পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধবিরতি এসেছে ঠিকই—কিন্তু কূটনৈতিক দাবার বোর্ডে খেলা এখনই শুরু হয়েছে।