জাপানে ৬.৮-এর তাণ্ডব, মৃত অন্তত ১৩

যা জানা জরুরি
- টোকিও: মঙ্গলবার বিকেলে শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল দক্ষিণ জাপানের কিউশু দ্বীপ।
- কুমামোতো প্রিফেকচারে ৬.৮ মাত্রার ভূমিকম্পে অন্তত ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে, আহত শতাধিক।
- এখনও বহু মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
টোকিও: মঙ্গলবার বিকেলে শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল দক্ষিণ জাপানের কিউশু দ্বীপ। কুমামোতো প্রিফেকচারে ৬.৮ মাত্রার ভূমিকম্পে অন্তত ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে, আহত শতাধিক। এখনও বহু মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা। ফলে রাতভর উদ্ধারকারীদের লড়াই চলেছে সময়ের সঙ্গে।
বুধবার প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি জানিয়েছেন, এখনও বহু মানুষ উদ্ধারের অপেক্ষায় রয়েছেন। তাঁর কথায়, যত বেশি সম্ভব মানুষকে জীবিত উদ্ধার করতে প্রশাসন সর্বশক্তি দিয়ে কাজ করছে।
কেঁপে উঠল কিউশু
মঙ্গলবার বিকেলে কিউশু দ্বীপের কুমামোতো প্রিফেকচারে আঘাত হানে ভূমিকম্পটি। জাপানের শিন্দো তীব্রতা সূচকে সর্বোচ্চ ৭ মাত্রার কম্পন রেকর্ড করা হয়েছে, যা অত্যন্ত ভয়াবহ কম্পনের ইঙ্গিত দেয়।
বুধবার সকাল পর্যন্ত কুমামোতো, ফুকুওকা-সহ পাঁচটি প্রিফেকচারের ৫০৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৯,১৮৬ জন আশ্রয় নিয়েছেন।
সরকারি মুখপাত্র মিনোরু কিহারা জানিয়েছেন, সাতজন গুরুতর এবং ২৯ জন সামান্য আহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া গিয়েছে। তবে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মানুষের সংখ্যা ৩৫০ ছাড়িয়েছে। বিদ্যুৎ ও জল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় হাসপাতালগুলিতেও পরিষেবা চালাতে সমস্যা হচ্ছে।
ধ্বংসস্তূপে আটকে বহু মানুষ
ইয়াতসুশিরোর একটি কাগজকলের বিশাল চিমনি ভেঙে পড়ে। সেখান থেকে দু’জন শ্রমিককে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এখনও নয়জন নিখোঁজ বলে জানা গিয়েছে।
কুমামোতোর একটি বড় শপিং মলেও ভূমিকম্পের পর বিস্ফোরণ ঘটে এবং ভবনের উপরের অংশ আংশিক ধসে পড়ে। ঘটনায় দুই তরুণীর মৃত্যু হয়েছে। আরও একজনের হৃদ্যন্ত্র বিকল হওয়ার খবর মিলেছে। প্রাথমিকভাবে গ্যাস লিকের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া হয়নি, যদিও বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ এখনও স্পষ্ট নয়।
উদ্ধারকাজে হাজার হাজার কর্মী
পরিস্থিতি সামাল দিতে জাপানের আত্মরক্ষা বাহিনীর ৩,৬০০ সদস্য, ২০টি বিমান এবং শত শত দমকল ও জরুরি পরিষেবা কর্মীকে মোতায়েন করা হয়েছে। প্রতিবেশী প্রিফেকচার থেকেও অতিরিক্ত উদ্ধারকারী দল পাঠানো হয়েছে।
জাপান আবহাওয়া সংস্থা সতর্ক করেছে, অগভীর উৎসের এই ভূমিকম্পের পর আগামী এক সপ্তাহ আরও শক্তিশালী কম্পন ও ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে। বুধবার সকাল পর্যন্ত ১ থেকে ৪ মাত্রার ৬০টিরও বেশি আফটারশক রেকর্ড হয়েছে।
ভূমিকম্পের পর সুনামি সতর্কতা জারি করা হলেও প্রায় দুই ঘণ্টার মধ্যে তা প্রত্যাহার করা হয়।
বিদ্যুৎ-জল নেই, বাড়ছে গরমের দুশ্চিন্তা
ভূমিকম্পের পর পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তুলেছে তীব্র গরম। মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত প্রায় ৫০ হাজার পরিবার বিদ্যুৎহীন এবং ১ লক্ষ ৪০ হাজার পরিবার জলহীন অবস্থায় ছিল।
বুধবার তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়ানোর পূর্বাভাস থাকায় হিটস্ট্রোকের আশঙ্কাও বেড়েছে। আফটারশকের আতঙ্কে বহু মানুষ রাত কাটিয়েছেন নিজেদের গাড়ির ভিতর।
প্রায় তিন লক্ষ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রেল পরিষেবা ব্যাহত হয়েছে, কুমামোতো বিমানবন্দরের রানওয়ে বন্ধ থাকায় বহু বিমান বাতিল বা অন্যত্র ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে। মোবাইল পরিষেবাতেও দেখা দিয়েছে সমস্যা।
বড় বিপর্যয় এড়াল পরমাণু কেন্দ্র
তীব্র কম্পনের পরও এলাকার কোনও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে অস্বাভাবিকতার খবর পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে জাপানের পারমাণবিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
ভূমিকম্পের পর সোনি, ফুজিফিল্ম এবং টিএসএমসি-সহ একাধিক সংস্থা নিজেদের কারখানা থেকে কর্মীদের নিরাপদে সরিয়ে নেয়।
অন্যদিকে, তুলনামূলকভাবে কম সংখ্যক ভবন ধসে পড়ায় বিশেষজ্ঞদের মতে জাপানের কঠোর ভূমিকম্প-প্রতিরোধী নির্মাণবিধি বড় ভূমিকা রেখেছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও শক্তিশালী নির্মাণ কাঠামোর কারণে আরও বড় প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
৮৪ সেন্টিমিটার সরে গেল ভূত্বক!
ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল কুমামোতো শহরের প্রায় ২০ কিলোমিটার দক্ষিণে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা প্রথমে কম্পনের মাত্রা ৭.১ জানালেও পরে তা সংশোধন করে ৬.৮ করে। জাপান আবহাওয়া সংস্থার হিসাবে অবশ্য মাত্রা ৭.১ এবং শিন্দো সূচকে সর্বোচ্চ তীব্রতা ৭।
এরপর আরও ৬.১ মাত্রার শক্তিশালী আফটারশক অনুভূত হয়।
জাপানের ভূ-স্থানিক তথ্য সংস্থার হিসাবে, ইয়াতসুশিরো শহরে ভূত্বক সর্বোচ্চ ৮৪ সেন্টিমিটার এবং কুমামোতো শহরে প্রায় ৪০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত সরে গিয়েছে।
ফের মনে পড়ছে ২০১৬-এর ভয়াবহতা
‘রিং অব ফায়ার’-এর ওপর অবস্থিত জাপান বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ। বিশ্বের ৬ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্পের প্রায় ২০ শতাংশই এই অঞ্চলে ঘটে।
কুমামোতোয় শেষ বড় বিপর্যয়ের স্মৃতিও এখনও টাটকা। ২০১৬ সালের ভূমিকম্পে ২৭৫ জনের মৃত্যু এবং ২,৭৩৯ জন আহত হয়েছিলেন।
এবারও তাই ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষদের দ্রুত উদ্ধারের দিকেই সব নজর। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে উদ্ধারকারী দল—সবার সামনে এখন একটাই লক্ষ্য, সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই যত বেশি সম্ভব প্রাণ বাঁচানো।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



