বাংলাস্ফিয়ার: মে মাসের এক ভোর। দক্ষিণ ভারতের এই অঞ্চলে তখন তীব্র তাপপ্রবাহ। সকাল পাঁচটার মধ্যেই বাতাস গরম ও আর্দ্র হয়ে উঠেছিল। রাতের অন্ধকারও যেন গ্রামবাসীদের জন্য কোনও স্বস্তি বয়ে আনতে পারেনি।

অন্ধ্রপ্রদেশের একটি ছোট গ্রাম বুসাভদ্রার বাসিন্দা পল্লি মহালক্ষ্মী প্রতিদিনের মতো ভোরে ঘুম থেকে ওঠেন। ছোট, জানালাবিহীন কংক্রিটের ঘরে একটি মাত্র সিলিং ফ্যানের নিচে স্বামী ও ছেলেকে নিয়ে রাত কাটিয়েছিলেন তিনি। ভোরে উঠে পরিবারের জন্য সকালের খাবার তৈরি করেন। স্টিলের থালায় সবাই মিলে নাশতা সারেন। সূর্য যত ওপরে উঠছিল, ততই ঘাম গড়িয়ে পড়ছিল তাঁদের কপাল বেয়ে।

সকাল ছয়টার কিছু আগে জলভর্তি বোতল নিয়ে কাজে বেরিয়ে পড়েন ৫০ বছরের মহালক্ষ্মী। গ্রামের রঙিন ছোট ছোট বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসা প্রতিবেশীদের হাসিমুখে শুভেচ্ছা জানাতে জানাতে তিনি হাঁটছিলেন মাঠের দিকে। অন্য মহিলাদের মতো তিনিও মুখ ঢেকে নিয়েছিলেন—কারণ সামনে অপেক্ষা করছিল আরেকটি অসহনীয় গরমের দিন।

মহালক্ষ্মীর মতো বুসাভদ্রা গ্রামের বহু মানুষ জীবিকা নির্বাহ করেন কেন্দ্রের গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্পের মাধ্যমে। দুই দশক আগে চালু হওয়া এই প্রকল্প দরিদ্র পরিবারগুলিকে বছরে ১০০ দিনের কাজের নিশ্চয়তা দেয়। বর্তমানে ভারতের ৮ কোটিরও বেশি মানুষ এই প্রকল্পের আওতায় কাজ করেন।

কাজ ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। ক্ষেতের কাজ, রাস্তা নির্মাণ বা অন্যান্য শারীরিক পরিশ্রমের বিনিময়ে দিনে মাত্র ১৮০ টাকা মজুরি মিলত। কিন্তু অসুস্থ স্বামী, প্রতিবন্ধী ছেলে এবং মেয়ের বিয়ের ঋণের বোঝা নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য এই সামান্য আয়ই ছিল মহালক্ষ্মীর পরিবারের একমাত্র ভরসা। তাই কোনও দিন কাজ ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ ছিল না।

সেদিন মহালক্ষ্মী ও তাঁর সহকর্মীরা ধানক্ষেতের পাশে নদীর ধারে একটি জলাধার খননের কাজে নিযুক্ত ছিলেন। চারপাশে কোনও গাছ ছিল না, ছায়ারও ব্যবস্থা ছিল না। তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

মহালক্ষ্মীর সঙ্গে কাজ করছিলেন তাঁর বন্ধু পার্বতী পুরিলা। তিনি বলেন, সেদিন সবাই শুধু গরমের কথাই বলছিলেন। কাজ শুরু করার আগেই অনেকেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর কথায়, “গরম এতটাই অসহনীয় ছিল যে কাজ করাই কঠিন হয়ে উঠেছিল। জল খেলেই সঙ্গে সঙ্গে ঘামে বেরিয়ে যাচ্ছিল। অনেক সময় মাথাও ঘুরছিল। কিন্তু কাজ না করে উপায় কী?” কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁদের সঙ্গে আনা পানীয় জলও শেষ হয়ে যায়।

তবু মহালক্ষ্মীকে কখনও অভিযোগ করতে দেখা যায়নি। পার্বতীর ভাষায়, “আমাদের দলের মধ্যে ও-ই ছিল সবচেয়ে কর্মঠ মানুষ। সব সময় হাসিখুশি থাকত। কখনও ক্লান্তি বা অসুস্থতার কথা বলেনি। আমাদের সবার চেয়ে বেশি পরিশ্রম করত।”

সকাল ১১টার দিকে প্রথম পর্বের কাজ শেষ হয়। ক্লান্ত মহিলারা বাড়ির পথে ফেরেন। বাড়ি ফিরে মহালক্ষ্মী কোনও কথা না বলে সরাসরি শোবার ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়েন।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গেলেও তিনি আর জেগে ওঠেননি। উদ্বিগ্ন স্বামী পল্লি শ্যাম সুন্দর রাও চিকিৎসককে ডাকেন। চিকিৎসক পরীক্ষা করে জানান, মহালক্ষ্মীর মৃত্যু হয়েছে তাপাঘাতে।

বন্ধু পার্বতী বলেন, “আমরা সবাই ভীষণ হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। এত শক্তিশালী একজন মানুষ যদি গরমে মারা যেতে পারেন, তাহলে আমাদের কারও জীবনই নিরাপদ নয়।”

মহালক্ষ্মীর পরিবার সরকারের কাছে এই মৃত্যুর দায় স্বীকার করার দাবি তুলেছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত তারা কোনও সরকারি সহায়তা বা ক্ষতিপূরণ পায়নি। প্রতিবেশীদের সাহায্যেই কোনওরকমে দিন কাটছে। স্বামী রাও বলেন, “ও ছাড়া আমরা সম্পূর্ণ অসহায়।”

মহালক্ষ্মীর মৃত্যু একক ঘটনা নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভারতে তাপপ্রবাহ ক্রমশ আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশটির বহু অঞ্চলে তাপমাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে, যা মানুষের বেঁচে থাকার সীমার কাছাকাছি। এ বছর একটি শহরে তাপমাত্রা ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠেছে। এপ্রিলের একদিন বিশ্বের সবচেয়ে উষ্ণ ৫০টি শহরের সবকটিই ছিল ভারতে।

ভারতের প্রায় ৯০ শতাংশ শ্রমিক অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করেন। তাঁদের অধিকাংশেরই তীব্র গরম থেকে সুরক্ষার কোনও ব্যবস্থা নেই। কৃষক, নির্মাণশ্রমিক, পথবিক্রেতা, নিরাপত্তারক্ষী—লক্ষ লক্ষ মানুষ ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি তাপমাত্রায় খোলা আকাশের নিচে কাজ করতে বাধ্য হন। অন্যদিকে বহু নারীকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অগ্নিগর্ভ রান্নাঘরে কাজ করতে হয়। বড় শহরগুলিতে রাতেও তাপমাত্রা খুব একটা কমে না, ফলে শরীরের স্বাভাবিক বিশ্রাম ও পুনরুদ্ধারের সুযোগও নষ্ট হয়। চিকিৎসকদের মতে, সময়মতো চিকিৎসা না পেলে তাপাঘাতে মৃত্যুর আশঙ্কা প্রায় ৮০ শতাংশ।

তবে মহালক্ষ্মীর মৃত্যুর একটি বিশেষ দিক রয়েছে—তাঁর মৃত্যুর সরকারি কারণ হিসেবে তাপাঘাতকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ভারতে তাপপ্রবাহে প্রকৃতপক্ষে কত মানুষ মারা যান, তা এখনও স্পষ্ট নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি পরিসংখ্যানে এই মৃত্যুর সংখ্যা প্রকৃত বাস্তবতার তুলনায় অনেক কম দেখানো হয়।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে তাপজনিত কারণে ৪৬০ জনের মৃত্যু হয়েছিল এবং ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা ছিল মাত্র ৮৪। অথচ রাষ্ট্রসংঘের তথ্য বলছে, ভারতের অর্ধেক জনসংখ্যার ইউরোপে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১ লক্ষ ৭৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় অতিরিক্ত গরমের কারণে।

সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলের গবেষকেরা একটি সমীক্ষায় অনুমান করেছেন, ভারতে এক দিনের চরম তাপপ্রবাহেই অতিরিক্ত প্রায় ৩,৪০০ জনের মৃত্যু হতে পারে। আর টানা পাঁচ দিনের তাপপ্রবাহে প্রাণহানি ৩০ হাজারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।

গবেষণার অন্যতম সহ-লেখক অশোক গদগিলের অভিযোগ, ভারতের প্রকৃত তাপজনিত মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহে তাঁরা বারবার বাধার মুখে পড়েছেন। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে তাঁরা সরকারি তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করলেও, প্রতিটি স্তরেই সেই প্রচেষ্টা ব্যাহত হয়েছে বলে তিনি দাবি করেছেন।