১৯৪৫ সালের ৬ অগস্ট। সকাল ৮টা ১৫ মিনিট। হিরোশিমার অধিকাংশ মানুষ কোনও বিমান দেখেননি, কোনও বিস্ফোরণের শব্দও শোনেননি। তাঁরা শুধু দিনের আলোয় এক অস্বাভাবিক ঝলকানি দেখেছিলেন, অথবা তার প্রতিফলন অনুভব করেছিলেন। কিন্তু সেই মুহূর্তেই পৃথিবীর ইতিহাস বদলে গিয়েছিল। শহরের উপর নেমে এসেছিল মানবসভ্যতার প্রথম পরমাণু বোমা।
হিরোশিমার নাগারেকাওয়া চার্চের যাজক কিয়োশি তানিমোতো তাঁর সদ্য আবিষ্কৃত স্মৃতিকথায় সেই দিনের বিভীষিকার প্রত্যক্ষ বিবরণ তুলে ধরেছেন। তাঁর লেখা থেকে উঠে আসে শুধু ধ্বংসের ছবি নয়, একজন স্বামী, পিতা এবং ধর্মযাজকের অন্তর্দ্বন্দ্বও।
চার্চের সদস্য মি. কোন্ডার বাবা-মা বিস্ফোরণের সময় ইয়োকোগাওয়া স্টেশনে ট্রেনের অপেক্ষায় ছিলেন, বিস্ফোরণস্থল থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে। তাঁরা একটি বি-২৯ বোমারু বিমান এবং আকাশে ভেসে নামতে থাকা একটি প্যারাসুট দেখেছিলেন। এরপর কী ঘটেছিল, তাঁদের কিছুই মনে নেই। জ্ঞান ফিরলে দেখেন, তাঁরা মাটিতে পড়ে আছেন, শরীর পুড়ে গেছে, গায়ে কোনও পোশাক নেই। চারপাশের সমস্ত বাড়ি মাটির সঙ্গে মিশে গেছে।
তানিমোতো যখন শহরের দিকে এগোচ্ছিলেন, দেখলেন বিস্ফোরণকেন্দ্রের কাছাকাছি সমস্ত বাড়ি যেন হাতুড়ির আঘাতে গুঁড়িয়ে যাওয়া খেলনার বাড়ির মতো সমতল হয়ে পড়ে আছে। ভাঙা কাঠ ও ইটের স্তূপের নীচ থেকে অসহায় মানুষের আর্তনাদ ভেসে আসছিল— “তাসুকেতে! তাসুকেতে!” অর্থাৎ, “বাঁচান!”
তিনি জানতেন, একা একজন মানুষের পক্ষে ওই ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে কাউকে উদ্ধার করা কার্যত অসম্ভব। তবুও চারদিকে চাপা পড়ে থাকা মানুষদের ফেলে চলে আসা তাঁর পক্ষে ছিল অসহনীয়। কিন্তু একই সঙ্গে মনে পড়ল নিজের স্ত্রী, ছোট্ট কন্যা এবং প্রতিবেশীদের কথা। পাড়ার সিভিল ডিফেন্স সমন্বয়কারী হিসেবে ১২০ জন মানুষের দায়িত্বও ছিল তাঁর কাঁধে।
চোখে জল নিয়ে তিনি বারবার বলতে বলতে দৌড়ে চললেন— “আমাকে ক্ষমা করুন… আমাকে ক্ষমা করুন…”
তিনি লিখেছেন, শহরের পথে পথে অসংখ্য আহত মানুষ পড়ে ছিলেন। কেউ আর হাঁটার শক্তি পাচ্ছিলেন না। যত শহরের গভীরে যাচ্ছিলেন, আহত মানুষের সংখ্যা তত বাড়ছিল। একসময় তিনি মাথার পানামা টুপিটি খুলে মাটিতে ছুড়ে ফেলেন। নিজের মনে বলতে থাকেন, “আমাকে ক্ষমা করো। আমি কেন অক্ষত রয়ে গেলাম?” তাঁর মনে হচ্ছিল, তাঁর স্ত্রী ও সন্তানও হয়তো একইভাবে ধ্বংসস্তূপের নীচে চাপা পড়ে আছেন, আর তিনি তাঁদের পাশে নেই।
বাড়ি ফেরার স্বাভাবিক রাস্তা আগুনে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নেন ওতা নদী সাঁতরে পার হবেন। তখন তিনি ঘণ্টাখানেক ধরে একটানা দৌড়ে ক্লান্ত। নদীর স্রোত প্রবল ছিল। কিছু দূর যেতেই তিনি ডুবতে শুরু করেন। জল নাক-মুখে ঢুকে যায়। ভারী পোশাক তাঁকে আরও নিচে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল।
সেই সময় তিনি প্রার্থনা করেন, “হে ঈশ্বর, আমাকে রক্ষা করো। আমার স্ত্রী, সন্তান আর প্রতিবেশীদের বাঁচানোর আগ পর্যন্ত আমার শরীরটাকে টিকিয়ে রাখো।”
এরপর তিনি জুতো, গেটার ও কোট খুলে ফেলেন। সমস্ত শক্তি দিয়ে সাঁতরে শেষ পর্যন্ত নদীর অপর পারে পৌঁছতে সক্ষম হন।
ওপারে উঠে কিছুক্ষণ মাটিতে মাথা রেখে বিশ্রাম নেওয়ার পর আবার হাঁটা শুরু করেন। তাঁর গায়ে তখন আর কোনও পোশাক নেই। আশপাশের অন্যদের থেকে তাঁর একমাত্র পার্থক্য ছিল— তাঁর শরীরে পোড়ার ক্ষত ছিল না।
তিনি পথে একটি পরিচিত বাড়িতে গিয়েও কাউকে পেলেন না। মনে হল সবাই পালিয়ে গিয়েছেন। এরপর তিনি ভাবলেন, হয়তো তাঁর স্ত্রী মিসেস তাদার বাড়িতে রয়েছেন। সেই আশায় কয়েক কদম এগোতেই শরণার্থীদের সারির মধ্যে দেখতে পেলেন স্ত্রীকে। কোলে তাঁদের ছোট্ট মেয়ে কোকো।
স্ত্রীর পরনে রক্তমাখা অন্তর্বাস, এলোমেলো চুল, মুখে মৃত্যুভয়ের ছাপ। যেন কোনও ভূতের মতো দেখাচ্ছিল তাঁকে।
তিনি ডাক দিতেই স্ত্রী ঘুরে দাঁড়ালেন। দু’জনেই কিছুক্ষণ নীরবে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইলেন। স্ত্রীর চোখে জল।
তিনি শুধু জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার কী হয়েছিল?”
স্ত্রী জানালেন, বাড়িতে ঢোকার মুহূর্তেই প্রতিবেশী মিসেস তাকাকি এসেছিলেন। কথা বলতে বলতেই মুহূর্তের মধ্যে গোটা বাড়ি তাঁদের উপর ভেঙে পড়ে। মিসেস তাকাকির কী হয়েছে, তিনি জানেন না।
স্ত্রী ও সন্তানকে জীবিত দেখে আনন্দে ভেঙে পড়ার পরিবর্তে তানিমোতোর মনে জন্ম নেয় তীব্র অপরাধবোধ ও ক্ষোভ। তিনি লিখেছেন, একজন চার্চ সদস্য প্রাণ হারালেন, অথচ যাজকের পরিবার বেঁচে গেল— এই সত্য তিনি সহজে মেনে নিতে পারেননি। তাঁর মনে হয়েছিল, তাঁর স্ত্রীরও সেই সদস্যের সঙ্গে মারা যাওয়া উচিত ছিল। পরে অবশ্য তিনি উপলব্ধি করেন, সেই ভাবনা ছিল গভীর মানসিক আঘাতের ফল।
পরে তিনি জানতে পারেন, তাঁর স্ত্রী ধ্বংসস্তূপের নীচে চাপা পড়ে শ্বাস নিতে পারছিলেন না। কোলে থাকা ছোট্ট কোকোর কান্না তাঁকে নতুন শক্তি দেয়। ভাঙা ছাদের একটি ছোট ফাঁক দেখতে পেয়ে তিনি প্রাণপণ চেষ্টা করে সেটি বড় করেন। একসময় সেই ফাঁক দিয়ে প্রথমে শিশুকন্যাকে বাইরে ঠেলে দেন, তারপর নিজেও বেরিয়ে আসেন।
ততক্ষণে পাশের বাড়িতে আগুন লেগে গেছে। চারদিকে ধোঁয়া। কোলে সন্তান নিয়ে তিনি মিসেস তাকাকিকে উদ্ধার করতে ফিরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু চারপাশে সব বাড়ি ভেঙে পড়েছে, কোথাও কোনও মানুষ নেই। আগুন ও ধোঁয়ার তাড়া খেয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি নিরাপদ স্থানের দিকে চলে যেতে বাধ্য হন। কিন্তু সারাক্ষণ তাঁর মনে ঘুরছিল একটাই প্রশ্ন— প্রতিবেশী কি বাঁচতে পেরেছিলেন?
এই স্মৃতিকথা শুধু হিরোশিমার ধ্বংসের ইতিহাস নয়; এটি মানুষের অপরাধবোধ, দায়িত্ববোধ, ভালোবাসা এবং বেঁচে থাকার সংগ্রামের এক অনন্য দলিল।