হাইলাইটস:
- টানা কয়েক সপ্তাহের ছাত্র আন্দোলনের পর কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা ধর্মেন্দ্র প্রধানের।
- এক্স-এ পদত্যাগপত্র প্রকাশ করে তিনি বলেন, পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ ও দেশের ঐক্যের স্বার্থেই এই সিদ্ধান্ত।
- NEET-UG প্রশ্নফাঁস-সহ একাধিক পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগে দেশজুড়ে তৈরি হয়েছিল তীব্র ক্ষোভ।
- আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কেন্দ্রের বৈঠকের পরদিনই এল এই ঘোষণা।
- ধর্মেন্দ্র প্রধান সরে দাঁড়ালেও পরীক্ষা সংস্কার ও জবাবদিহির দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে ছাত্র নেতৃত্ব।
NEET-UG প্রশ্নফাঁস এবং একের পর এক পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগে টানা কয়েক সপ্তাহের ছাত্র আন্দোলনের পর অবশেষে পদত্যাগ করলেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। শনিবার এক্স-এ নিজের পদত্যাগের কথা ঘোষণা করেন তিনি। দিল্লির যন্তর-মন্তর থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া ছাত্রবিক্ষোভের পর তাঁর এই সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
নিজের পদত্যাগপত্রে ধর্মেন্দ্র প্রধান জানান, দেশের ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ, জাতীয় ঐক্য এবং পরিস্থিতিকে আরও জটিল হয়ে ওঠা থেকে রক্ষা করতেই তিনি সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, দেশের যুবসমাজ যেন দীর্ঘ আইনি ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনে আটকে না পড়ে এবং নিজেদের পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে এগিয়ে যেতে পারে, সেই কারণেই তিনি প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগপত্র দিয়েছেন।
তিনি আরও দাবি করেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তৈরি হওয়া অস্থিরতার সুযোগ যেন কোনও ‘দেশবিরোধী শক্তি’ নিতে না পারে, সেটিও তাঁর সিদ্ধান্তের অন্যতম কারণ। নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সরাসরি স্বীকার না করলেও, বর্তমান পরিস্থিতিতে নৈতিক দায়িত্বের প্রশ্নকে গুরুত্ব দিয়েই সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান তিনি।
ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এমন এক সময়ে এল, যখন NEET-UG প্রশ্নফাঁস কাণ্ডকে ঘিরে কেন্দ্রীয় সরকারের উপর চাপ ক্রমশ বাড়ছিল। পরীক্ষা পরিচালনায় স্বচ্ছতার অভাব, জাতীয় পরীক্ষার নিরাপত্তা এবং ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (NTA)-র ভূমিকা নিয়ে ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক ও বিরোধীরা লাগাতার প্রশ্ন তুলছিলেন।
দিল্লির যন্তর-মন্তরে চলা আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল অভিজিৎ দীপকের নেতৃত্বাধীন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। NEET প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদ দিয়ে শুরু হলেও আন্দোলন দ্রুত বৃহত্তর যুব আন্দোলনের রূপ নেয়। পরীক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার, প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের কঠোর শাস্তি এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ—এই তিনটি দাবিই আন্দোলনের কেন্দ্রে ছিল।
গত রবিবার ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচিকে ঘিরে দিল্লিতে পুলিশি লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস এবং সংঘর্ষের ঘটনায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়। বহু ছাত্র আহত হন বলে আন্দোলনকারীদের দাবি। এর পরেই সরকারের উপর রাজনৈতিক চাপ আরও বেড়ে যায়।
অচলাবস্থা কাটানোর চেষ্টা হিসেবে শুক্রবার আন্দোলনকারী সিজেপি প্রতিনিধিদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা এবং জিতেন্দ্র সিংয়ের বৈঠক হয়। বৈঠকের পর সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। তার ঠিক পরদিনই ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের ঘোষণা সেই আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
তবে শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফাতেই আন্দোলনের ইতি হচ্ছে না। আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, তাঁদের দাবি কেবল একজন মন্ত্রীর পদত্যাগে সীমাবদ্ধ নয়। NTA-র জবাবদিহি, পরীক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার, প্রশ্নফাঁস চক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরীক্ষার্থীদের স্বার্থরক্ষা—এই দাবিগুলিও পূরণ করতে হবে।
বিরোধীরা অবশ্য ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগকে সরকারের ‘নৈতিক পরাজয়’ হিসেবে দেখছে। তাদের দাবি, ছাত্রদের ক্ষোভকে প্রথম থেকেই গুরুত্ব দিয়ে ব্যবস্থা নিলে পরিস্থিতি এতদূর গড়াত না।
অন্যদিকে বিজেপির একাংশের বক্তব্য, ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ এবং দেশের বৃহত্তর স্বার্থের কথা ভেবেই ধর্মেন্দ্র প্রধান দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সরকারের দাবি, পরীক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কারের কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে এবং প্রশ্নফাঁস রুখতে আরও কঠোর আইনি পদক্ষেপও নেওয়া হচ্ছে।
এখন প্রশ্ন, নতুন শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে কে দায়িত্ব নেবেন এবং পরীক্ষা ব্যবস্থার উপর হারিয়ে যাওয়া আস্থা কত দ্রুত ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। কারণ NEET-UG বিতর্ক এখন আর একটি পরীক্ষার গণ্ডিতে আটকে নেই—দেশের উচ্চশিক্ষা ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার গোটা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রশ্নের মুখে।
ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগে রাজনৈতিক সংকটের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল ঠিকই। কিন্তু ছাত্রদের বার্তা স্পষ্ট—মুখ বদল নয়, এবার চাই ব্যবস্থার বদল।