Table of Contents
বিশ্ব জ্বালানি বাজারে ফের অস্থিরতা। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের নতুন উত্তেজনায় ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের হুমকির মুখে পড়েছে সৌদি আরবের তেল রপ্তানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ বাব আল-মান্দাব। আর তার জেরেই মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ১৩ শতাংশেরও বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের গণ্ডি পেরিয়েছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, হরমুজ প্রণালীর অনিশ্চয়তার পাশাপাশি বাব আল-মান্দাবও যদি কার্যত অচল হয়ে পড়ে, তাহলে তেলের দাম ১২০ ডলার—এমনকি তারও বেশি—হতে পারে।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব?
আরব উপদ্বীপ ও আফ্রিকার শৃঙ্গ অঞ্চলের মাঝখানে অবস্থিত বাব আল-মান্দাব বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগরের মধ্যে সংযোগকারী এই প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও অন্যান্য পণ্য পরিবহণ হয়।
গত বছর এই পথ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪১ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত ও পরিশোধিত তেল পরিবহণ হয়েছে—বিশ্বের মোট তেল পরিবহণের প্রায় ৫ শতাংশ।
হরমুজ প্রণালীতে সংঘাতের কারণে জাহাজ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় বাব আল-মান্দাবের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। অর্থাৎ, একটি পথ বিপজ্জনক হলে অন্য পথের উপর চাপ বাড়ে—আর এখন সেই দ্বিতীয় পথটিও হুমকির মুখে।
রিস্টাড এনার্জির ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক জর্জে লিওনের মতে, হরমুজে অনিশ্চয়তা বজায় থাকলে এবং একই সঙ্গে বাব আল-মান্দাবে হুথিদের হামলার আশঙ্কা বাড়লে তেলের বাজারে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি প্রায় অনিবার্য।
হুথিদের হুমকি কী?
সোমবার আন্তর্জাতিক জাহাজ পরিবহণ সংস্থাগুলিকে ই-মেল পাঠিয়ে হুথিরা সতর্ক করে, সৌদি আরবের বন্দর থেকে তেল ওঠানো বা নামানোর সঙ্গে যুক্ত জাহাজকে তারা “যেখানেই পাওয়া যাবে” আক্রমণ করবে।
পরদিন সেই হুমকি ফের দেওয়া হয়। হুথিদের দাবি, সতর্কবার্তার পর অন্তত ছয়টি জাহাজ ইতিমধ্যেই তাদের গন্তব্য বদলেছে।
বৃহস্পতিবার হুথিরা দাবি করে, তারা দুটি সৌদি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালিয়েছে। পরে সৌদি সংবাদ সংস্থার তরফেও অন্তত একটি জাহাজে আগুন লাগার কথা জানানো হয়।
এই ঘটনাগুলিই বাজারে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কা, বিষয়টি শুধু তেল সরবরাহের নয়—সমুদ্রপথে পরিবহণ ব্যবস্থাই বড় ধাক্কা খেতে পারে।
সৌদি আরব কেন এই পথের উপর এত নির্ভরশীল?
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের পর সৌদি আরব তাদের পূর্বাঞ্চলের আবকাইক তেল প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে পশ্চিম উপকূলের ইয়ানবু বন্দরে তেল পাঠাতে শুরু করেছে।
বর্তমানে দেশটির মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৭৫ শতাংশ এই পথেই আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছচ্ছে। ইয়ানবু থেকে প্রতিদিন প্রায় ২৫ লাখ ব্যারেল তেল বাব আল-মান্দাব হয়ে ভারত, চিনসহ এশিয়ার বিভিন্ন বাজারে যায়।
ফলে এই সমুদ্রপথে বড় ধরনের বাধা তৈরি হলে সৌদি আরবের রপ্তানি ব্যবস্থায় সরাসরি চাপ পড়বে।
বিকল্প পথ আছে, কিন্তু খরচও আকাশছোঁয়া
তেলবাহী জাহাজগুলির সামনে এখন কার্যত দুটি পথ—ঝুঁকি নিয়ে বাব আল-মান্দাব পার হওয়া, অথবা পুরো পথ বদলে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্তের কেপ অব গুড হোপ ঘুরে যাওয়া।
দ্বিতীয় পথটি অনেক বেশি নিরাপদ হতে পারে, কিন্তু সময় ও খরচ—দুই-ই বাড়ে। যাত্রাপথ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে এবং প্রতিটি যাত্রায় অতিরিক্ত ২০ থেকে ২৫ লাখ ডলার পর্যন্ত খরচ হতে পারে।
এই কারণেই কিছু জাহাজ ঝুঁকি নিয়েই পুরনো পথে চলাচল করছে। আবার কিছু জাহাজ মাঝপথে ফিরে যাচ্ছে। এমনকি কয়েকটি জাহাজ নিরাপত্তার কারণে তাদের স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা (AIS) বন্ধ করে দিয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
যুদ্ধবিরতি ভাঙতেই বাজারে আগুন
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির সময় হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭১ ডলারে নেমে এসেছিল।
কিন্তু যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়া এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেটিকে “সমাপ্ত” ঘোষণা করার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। ব্রেন্টের দাম এক পর্যায়ে ২৫ শতাংশেরও বেশি বেড়ে যায়।
ওয়াশিংটনের দাবি, হরমুজ প্রণালী আনুষ্ঠানিকভাবে খোলা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে হামলা-পাল্টা হামলার আশঙ্কায় জাহাজ চলাচল অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়েছে।
এর মধ্যেই হুথিদের এক শীর্ষ নেতা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, সৌদি তেল রপ্তানি আটকে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলারেও পৌঁছতে পারে। রাজনৈতিক হুমকি হলেও এমন বক্তব্য বাজারের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
শুধু তেল নয়, ডিজেল-পেট্রোলেও চাপ
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (IEA) প্রধান ফাতিহ বিরোল সতর্ক করেছেন, সংকটের প্রভাব শুধু অপরিশোধিত তেলের বাজারে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
তেলের দাম বাড়ায় বিশ্বের বহু শোধনাগার উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। ফলে ডিজেল ও পেট্রোলের মতো পরিশোধিত জ্বালানির বাজারে চাপ আরও তীব্র হতে পারে।
রাশিয়ার শোধনাগারগুলিও ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে বিশ্ববাজারে পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহ আগে থেকেই চাপে রয়েছে।
অর্থাৎ, তেল পরিবহণে বাধা, শোধনাগারে উৎপাদন কমে যাওয়া এবং ভূরাজনৈতিক সংঘাত—সব মিলিয়ে জ্বালানি বাজারে তৈরি হয়েছে একাধিক স্তরের সংকট।
সাধারণ মানুষের পকেটে পড়বে ধাক্কা
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব দ্রুত পড়ে পরিবহণ, বিদ্যুৎ, শিল্প এবং দৈনন্দিন পণ্যের দামে।
যুক্তরাজ্যে গত দুই সপ্তাহে ডিজেলের গড় খুচরা দাম প্রতি লিটারে প্রায় ৮ পেন্স এবং পেট্রোলের দাম প্রায় ৫ পেন্স বেড়েছে। অন্য দেশগুলিতেও জ্বালানির দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারেও নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। শীতের আগে ইউরোপ যখন গ্যাসের মজুত বাড়াতে চাইবে, তখন মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ ব্যাহত হলে বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।
এক নয়, দুই সমুদ্রপথই যদি ঝুঁকিতে পড়ে?
বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহণপথ—হরমুজ—ইতিমধ্যেই অনিশ্চয়তায়। এবার বাব আল-মান্দাবেও যদি হামলা ও অবরোধের আশঙ্কা বাড়ে, তাহলে বিশ্ব জ্বালানি ব্যবস্থার দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
পরিবেশবিদদের মতে, এই সংকট আবারও দেখিয়ে দিচ্ছে জীবাশ্ম জ্বালানির উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। একটি সংঘাত কয়েক হাজার মাইল দূরে হলেও তার প্রভাব পড়তে পারে জ্বালানির দাম, পরিবহণ খরচ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।
তাই বাব আল-মান্দাবকে ঘিরে বর্তমান সংকট শুধু একটি সমুদ্রপথের নিরাপত্তা সমস্যা নয়। এটি এখন বিশ্ব জ্বালানি বাজারের সামনে এক বড় প্রশ্ন—হরমুজের পর বাব আল-মান্দাবও যদি আটকে যায়, তাহলে তেলের বাজারকে সামলাবে কে?