বাংলাস্ফিয়ার: রাজা রঘুবংশী হত্যা মামলায় বড় ধাক্কা খেলেন প্রধান অভিযুক্ত সোনম রঘুবংশী। বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্ট মেঘালয় হাই কোর্টের দেওয়া তাঁর জামিন বাতিল করে তিন সপ্তাহের মধ্যে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে শীর্ষ আদালত জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সোনম জামিনে থাকলে বিচারপ্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিচারপতি এম এম সুন্দরেশ এবং বিচারপতি পি বি ভারালের বেঞ্চ মেঘালয় হাই কোর্টের ২৯ জুনের জামিনের আদেশ খারিজ করে দেয়। তবে আদালত সোনমকে একটি সীমিত সুযোগও দিয়েছে। বিচারপতিরা বলেছেন, যদি আগামী ছয় মাসের মধ্যে মামলার বিচার শেষ না হয়, তাহলে তিনি সংশ্লিষ্ট ট্রায়াল কোর্টে নতুন করে জামিনের আবেদন করতে পারবেন।
রায়ে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টভাবে পর্যবেক্ষণ করে, “বর্তমান পরিস্থিতিতে অভিযুক্তকে জামিনে মুক্ত রাখলে চলমান বিচারপ্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।” আদালতের এই মন্তব্য থেকেই স্পষ্ট যে বিচার প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কাকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে শীর্ষ আদালত।
মেঘালয় সরকার আদালতে জানায়, মামলার চার্জশিট ইতিমধ্যেই ফেব্রুয়ারি মাসে দাখিল করা হয়েছে। এখন অভিযোগ গঠনের পর্যায়ে পৌঁছেছে মামলা। এই অবস্থায় প্রধান অভিযুক্ত জামিনে বাইরে থাকলে সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং বিচার প্রক্রিয়ার উপর প্রভাব পড়তে পারে বলে রাজ্যের পক্ষ থেকে যুক্তি তুলে ধরা হয়।
এই মামলাটি গোটা দেশে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল। ২০২৫ সালে বিয়ের পর মধুচন্দ্রিমার জন্য মেঘালয়ে গিয়েছিলেন ইন্দোরের নবদম্পতি রাজা ও সোনম রঘুবংশী। সেই সফরেই রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যান রাজা। পরে গভীর খাদ থেকে তাঁর দেহ উদ্ধার হয়। তদন্তে উঠে আসে, এটি কোনও দুর্ঘটনা নয়, বরং সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
তদন্তকারী সংস্থার অভিযোগ, সোনম রঘুবংশী পূর্বপরিকল্পিতভাবে স্বামীকে খুনের ষড়যন্ত্র করেন এবং ভাড়াটে খুনিদের সাহায্যে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। পরে তিনি অন্য রাজ্যে পালিয়ে যান। কয়েক দিন পর উত্তরপ্রদেশের গাজিপুর থেকে তাঁকে আটক করা হয়। তদন্তে একাধিক অভিযুক্তের নাম উঠে আসে এবং পুলিশ দাবি করে, পুরো ঘটনাটি ছিল পরিকল্পিত।
মেঘালয় পুলিশ দীর্ঘ তদন্তের পর আদালতে চার্জশিট দাখিল করে। তদন্তকারীদের দাবি, ডিজিটাল প্রমাণ, মোবাইল ফোনের অবস্থান, আর্থিক লেনদেন এবং বিভিন্ন সাক্ষ্যের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে।
এর আগে মেঘালয় হাই কোর্ট সোনমকে জামিন দিয়েছিল। সেই আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয় মেঘালয় সরকার। রাজ্যের যুক্তি ছিল, মামলার বিচার এখনও শুরুই হয়নি এবং এই অবস্থায় প্রধান অভিযুক্তকে মুক্ত রাখলে সাক্ষীদের উপর প্রভাব বিস্তার বা বিচার ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
সুপ্রিম কোর্ট রাজ্যের সেই যুক্তিকেই গুরুত্ব দিয়ে হাই কোর্টের আদেশ বাতিল করেছে। তবে একই সঙ্গে আদালত ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানও নিয়েছে। বিচার দীর্ঘায়িত হলে যাতে অভিযুক্তের অধিকার ক্ষুণ্ণ না হয়, সে কারণেই ছয় মাসের মধ্যে বিচার শেষ না হলে নতুন করে জামিনের আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নির্দেশে সুপ্রিম কোর্ট একদিকে যেমন দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার বার্তা দিয়েছে, তেমনই বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বজায় রাখার বিষয়টিকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে।
এখন সোনম রঘুবংশীকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আত্মসমর্পণ করতে হবে। এরপর ট্রায়াল কোর্টে অভিযোগ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই পর্ব শেষ হলে সাক্ষ্যগ্রহণ ও বিচার আনুষ্ঠানিকভাবে এগোবে। দেশজুড়ে আলোড়ন তোলা এই হত্যাকাণ্ডের চূড়ান্ত বিচার কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই এখন নজর আইন মহল এবং সাধারণ মানুষের।