নয়াদিল্লি, ২৩ জুলাই: দেশজুড়ে প্রশ্নফাঁস, নিয়োগে অনিয়ম এবং শিক্ষাব্যবস্থায় স্বচ্ছতার দাবিতে ছাত্র আন্দোলন যখন তীব্র হচ্ছে, তখন কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকে সরাসরি আক্রমণ করলেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। তাঁর স্পষ্ট বার্তা, “ছাত্ররা সন্ত্রাসবাদী নয়। তারা দেশের ভবিষ্যৎ।” আন্দোলনরত পড়ুয়াদের ন্যায্য দাবির পাশে থাকার পাশাপাশি তাঁদের দমন না করে সরকারের আলোচনায় বসা উচিত বলেও দাবি করেন তিনি।
সংসদ ভবন চত্বরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে রাহুল বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনায় ছাত্রদের সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে, তা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। তাঁর অভিযোগ, পরীক্ষা ব্যবস্থায় অনিয়ম, প্রশ্নফাঁস এবং শিক্ষাক্ষেত্রের নানা সমস্যার বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করতে নামা ছাত্রদের সঙ্গে এমন আচরণ করা হচ্ছে, যেন তারা দেশের শত্রু।
রাহুলের কথায়, নিজেদের ভবিষ্যৎ রক্ষার দাবিতে রাস্তায় নামা তরুণ-তরুণীদের কণ্ঠস্বর দমন করা হচ্ছে। সরকারের উচিত তাঁদের সঙ্গে আলোচনায় বসা, বলপ্রয়োগের পথ বেছে নেওয়া নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শিক্ষাক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্নেও কেন্দ্রকে নিশানা করেন কংগ্রেস নেতা। তাঁর বক্তব্য, প্রশ্নফাঁস বা পরীক্ষা পরিচালনায় অনিয়মের অভিযোগকে হালকাভাবে দেখলে লক্ষ লক্ষ পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। তাই ছাত্রদের দাবিকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ করা জরুরি।
কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে তোলেন রাহুল গান্ধী। তাঁর অভিযোগ, একের পর এক বিতর্কের পরও সরকার দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে। সংসদের ভিতরে ও বাইরে বিরোধীরা বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুললেও সরকার স্পষ্ট জবাব দিতে চাইছে না বলে দাবি করেন তিনি।
রাহুলের বক্তব্য, কোনও গণতান্ত্রিক দেশে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। সেই অধিকারকে সম্মান করা সরকারের দায়িত্ব। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর পুলিশি পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে এবং সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
কংগ্রেসের পাশাপাশি বিরোধী জোটের একাধিক দলও ছাত্রদের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, প্রশ্নফাঁস ও পরীক্ষা ব্যবস্থার অনিয়ম রুখতে কেন্দ্র যথেষ্ট পদক্ষেপ করতে ব্যর্থ হয়েছে। একই সঙ্গে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশি পদক্ষেপের বিষয়টিও সংসদে জোরালোভাবে তুলছে বিরোধীরা।
কেন্দ্র অবশ্য বিরোধীদের অভিযোগ নাকচ করেছে। সরকারের বক্তব্য, শিক্ষাক্ষেত্রে অনিয়ম রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং পরীক্ষা ব্যবস্থাকে আরও নিরাপদ ও স্বচ্ছ করতে একাধিক সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা প্রশাসনের দায়িত্ব এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে পুলিশকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতেই হয় বলেও জানিয়েছে কেন্দ্র। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে অযথা বলপ্রয়োগের অভিযোগও সরকার অস্বীকার করেছে।
এদিকে, সংসদের চলতি অধিবেশনে ছাত্র আন্দোলন, প্রশ্নফাঁস এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশি পদক্ষেপকে ঘিরে সরকার-বিরোধী সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। বিরোধীরা শিক্ষামন্ত্রীর জবাব এবং বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার দাবি জানিয়ে আসছে। সরকার আলোচনায় রাজি থাকলেও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ছাত্র আন্দোলন এখন আর শুধু শিক্ষাক্ষেত্রের সমস্যায় সীমাবদ্ধ নেই। ধীরে ধীরে তা বৃহত্তর রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে। বিরোধীরা যেখানে এটিকে যুবসমাজের ক্ষোভের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছে, সরকার সেখানে প্রশাসনিক সংস্কারের উপর জোর দিচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে রাহুল গান্ধীর সরাসরি সমর্থনের বার্তা আন্দোলনরত ছাত্রদের মনোবল বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে ছাত্র আন্দোলনকে ঘিরে সংসদ ও দেশের রাজনীতিতে সংঘাত যে আরও তীব্র হতে চলেছে, তাঁর মন্তব্যে সেই ইঙ্গিতও স্পষ্ট।