হাইলাইটস:

  • বিদ্যুৎকেন্দ্র বা গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোয় মার্কিন হামলা হলে বাব এল-মান্দেব প্রণালী বন্ধের প্রস্তুতি নিতে হুথিদের নির্দেশ দিয়েছে তেহরান।
  • হরমুজের পাশাপাশি বাব এল-মান্দেবও অচল হলে বিশ্ব জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনে নজিরবিহীন বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।
  • ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম সপ্তাহে প্রায় ১২ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপিছু ৮৫ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
  • সুয়েজ খাল, লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগরকে যুক্ত করা এই জলপথ বন্ধ হলে ইউরোপ-এশিয়ার বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বাংলাস্ফিয়ারমধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ক্রমশ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে শুধু যুদ্ধক্ষেত্র নয়, বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথগুলিও সরাসরি সংঘাতের কেন্দ্রে চলে আসছে। ইতিমধ্যেই হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনায় আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এবার নতুন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বাব এল-মান্দেব প্রণালীকে ঘিরে। ইরান জানিয়েছে, আমেরিকা যদি তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু বা জলশোধনাগারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোয় হামলা চালায়, তাহলে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের মাধ্যমে বাব এল-মান্দেব প্রণালীও বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে।

এই হুঁশিয়ারি কার্যকর হলে বিশ্বের দুটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রবেশপথ—হরমুজ ও বাব এল-মান্দেব—একসঙ্গে বিপর্যস্ত হবে। আন্তর্জাতিক অর্থনীতির জন্য এর অভিঘাত হবে সুদূরপ্রসারী। জ্বালানি, খাদ্য, শিল্পপণ্য থেকে শুরু করে কনটেনার পরিবহন—সব ক্ষেত্রেই সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।

বাব এল-মান্দেব প্রণালী লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। একদিকে ইয়েমেন, অন্যদিকে জিবুতি ও ইরিত্রিয়ার মাঝখানে অবস্থিত এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়েই সুয়েজ খাল হয়ে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে বিপুল পরিমাণ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করে। প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ ব্যারেল তেল, তরল প্রাকৃতিক গ্যাস এবং বিপুল পরিমাণ কনটেনারবাহী জাহাজ এই পথ ব্যবহার করে। ফলে এই প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে জাহাজগুলিকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে কেপ অব গুড হোপ হয়ে যাতায়াত করতে হবে। এতে পরিবহনের সময় অন্তত ১০ থেকে ১৫ দিন বেড়ে যাবে, পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়ও কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ-র মাধ্যমে প্রকাশিত বিবৃতিতে দেশটির কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ডের এক মুখপাত্র বলেছেন, আমেরিকা যদি ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোয় হামলা চালায়, তাহলে “এখনও পর্যন্ত যা ইরানের সংযমের কারণে অক্ষত রয়েছে, তা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হবে।” একইসঙ্গে ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পসও সতর্ক করে জানিয়েছে, আমেরিকা ও তার মিত্রদের সুবিধা দেয় এমন সমস্ত জ্বালানি রফতানির করিডর লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। তাদের বক্তব্য, “আঞ্চলিক জ্বালানি রফতানি হয় সবার জন্য থাকবে, নয়তো কারও জন্যই থাকবে না।”

এই বক্তব্যের তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। এতদিন ইরান মূলত হরমুজ প্রণালীকে কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার ইঙ্গিত দিত। কিন্তু এবার প্রথমবারের মতো বাব এল-মান্দেবকে একই সংঘাতের অংশ করার স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হল। এর অর্থ, যুদ্ধের ভৌগোলিক বিস্তার আরও বাড়তে পারে এবং ইয়েমেনের হুথিরাও সরাসরি আমেরিকা–ইরান সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে পারে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক দিনগুলিতে বারবার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালীতে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়া বন্ধ না করে, তাহলে তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু ও জলশোধনাগারের মতো গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক পরিকাঠামোয় হামলা চালানো হবে। এই হুমকিরই পাল্টা জবাব হিসেবে ইরানের সামরিক নেতৃত্ব আরও বিস্তৃত প্রতিশোধের ইঙ্গিত দিয়েছে।

যুদ্ধের এই পরিস্থিতির প্রভাব ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে পড়তে শুরু করেছে। ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম এক সপ্তাহেই প্রায় ১২ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপিছু ৮৫ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। বীমা সংস্থাগুলি ঝুঁকিপূর্ণ জলপথে জাহাজ পাঠানোর অতিরিক্ত প্রিমিয়াম বাড়িয়েছে। বহু বাণিজ্যিক জাহাজ ইতিমধ্যেই হরমুজ এড়িয়ে বিকল্প পথ খুঁজছে। বাব এল-মান্দেবও যদি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার মধ্যে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।

ভারতের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলির জন্যও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেল এবং অন্যান্য পণ্য পরিবহনের একটি বড় অংশ এই অঞ্চল দিয়েই আসে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বাড়লে ভারতের আমদানি ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং জ্বালানির ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি একই সময়ে হরমুজ ও বাব এল-মান্দেব—দুটি সামুদ্রিক প্রবেশপথই কার্যত অচল হয়ে যায়, তাহলে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের নতুন অধ্যায়ই হবে না, বরং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় সামুদ্রিক সংকটগুলির একটি হিসেবে ইতিহাসে স্থান পেতে পারে। এই কারণেই আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল এখন শুধু যুদ্ধবিরতির দিকেই নয়, বিশ্বের এই দুই কৌশলগত জলপথকে সচল রাখার দিকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।