হাইলাইটস:
- গত বছরের তুলনায় আকারে ছোট হলেও ২১ জুলাইয়ের সমাবেশ থেকে আক্রমণাত্মক রাজনৈতিক বার্তা দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
- দিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ছাত্র আন্দোলনে পুলিশের অভিযানের পর প্রতিবাদীদের পাশে থাকার বার্তা দেন তিনি।
- বিজেপির পাশাপাশি তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবির ও কংগ্রেসকেও কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন।
- বিরোধী ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার কথা বললেও বাংলায় বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নেতৃত্বের দাবিও তুলে ধরেন।
বাংলাস্ফিয়ার: কলকাতার ২১ জুলাইয়ের সমাবেশ এ বার আগের বছরের তুলনায় অনেকটাই সীমিত পরিসরে অনুষ্ঠিত হলেও রাজনৈতিক বার্তার দিক থেকে কোনও আপস করলেন না তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, দলের ভাঙন এবং দিল্লিতে ছাত্র আন্দোলন ঘিরে উত্তেজনার আবহে তিনি একযোগে বিজেপি, বিদ্রোহী তৃণমূল শিবির এবং কংগ্রেসকে আক্রমণ করেন। একই সঙ্গে ছাত্রদের আন্দোলনের প্রতি প্রকাশ্যে সংহতি জানিয়ে জাতীয় রাজনীতিতেও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে দেন।
সমাবেশে বক্তব্যের শুরুতেই মমতা বলেন, গণতান্ত্রিক প্রতিবাদকে দমন করার চেষ্টা দেশের পক্ষে শুভ নয়। দিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ডাকে ছাত্র-যুবদের বিক্ষোভে পুলিশি কড়াকড়ির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, যাঁরা শিক্ষা, পরীক্ষা ব্যবস্থা এবং যুবসমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, তাঁদের কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে। গণতন্ত্রে মতপ্রকাশের অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সাম্প্রতিক সময়ে সোনম ওয়াংচুকের অনশন এবং শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আন্দোলনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে মমতা বলেন, ছাত্রদের দাবি শুনতে হবে, তাদের বিরুদ্ধে লাঠিচার্জ বা দমননীতি গ্রহণ করলে ক্ষোভ আরও বাড়বে। তিনি অভিযোগ করেন, কেন্দ্রীয় সরকার বিরোধী মতকে অপরাধ হিসেবে দেখছে।
এর পরেই বিজেপির বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণে যান তৃণমূল নেত্রী। তাঁর অভিযোগ, দেশের বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। নির্বাচন থেকে তদন্ত—সব ক্ষেত্রেই বিরোধীদের চাপে রাখার চেষ্টা চলছে বলে দাবি করেন তিনি। বাংলার মানুষ বিজেপির এই রাজনীতি মেনে নেবেন না বলেও মন্তব্য করেন।
শুধু বিজেপিই নয়, দলত্যাগী তৃণমূল নেতাদের বিরুদ্ধেও এ দিন ছিল তাঁর কড়া বার্তা। নাম না করে তিনি বলেন, যাঁরা ব্যক্তিস্বার্থে দল ছেড়েছেন, তাঁদের মানুষই জবাব দেবেন। আদর্শের কথা বলে অন্য শিবিরে যাওয়া নেতাদের উদ্দেশে তাঁর কটাক্ষ, ক্ষমতার জন্য দল বদল করলে জনসমর্থন ফিরে পাওয়া যায় না। তৃণমূলের সংগঠন নতুন করে গড়ে তোলা হবে এবং কর্মীদের মনোবল ভাঙতে দেওয়া হবে না বলেও তিনি জানান।
কংগ্রেসকেও ছেড়ে কথা বলেননি মমতা। তিনি অভিযোগ করেন, বিজেপির বিরুদ্ধে প্রকৃত লড়াইয়ের বদলে কংগ্রেস অনেক ক্ষেত্রেই বিভ্রান্তিকর রাজনীতি করছে। যদিও জাতীয় স্তরে বিরোধী শক্তির ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি স্বীকার করেন, তবু বাংলার রাজনৈতিক বাস্তবতায় তৃণমূলই বিজেপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী—এই বার্তাও স্পষ্ট করে দেন।
সমাবেশে তিনি কর্মীদের উদ্দেশে সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান। বুথ স্তর থেকে জনসংযোগ বাড়ানো, মানুষের সমস্যা নিয়ে আন্দোলন গড়ে তোলা এবং রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকার নির্দেশ দেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল, সাম্প্রতিক দলীয় ভাঙনের পরেও তৃণমূল আত্মরক্ষার অবস্থানে নয়; বরং নতুন রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
মমতা কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন নীতিরও সমালোচনা করেন। বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, শিক্ষাক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা এবং পরীক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশের যুবসমাজ ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। সেই উদ্বেগের উত্তর দেওয়ার পরিবর্তে সরকার দমননীতির পথ বেছে নিচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ দিনের সমাবেশের মূল লক্ষ্য ছিল সমর্থকদের মনোবল পুনরুদ্ধার করা এবং জাতীয় রাজনীতিতে তৃণমূলের অবস্থান পুনরায় তুলে ধরা। উপস্থিতির নিরিখে অনুষ্ঠান আগের বছরের তুলনায় ছোট হলেও মমতার বক্তব্যে আক্রমণাত্মক সুর ছিল স্পষ্ট। বিশেষ করে দিল্লির ছাত্র আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি বিরোধী রাজনীতিতে নতুন একটি ইস্যুকে সামনে আনতে চেয়েছেন।
একই সঙ্গে দলের বিদ্রোহী অংশকে বিচ্ছিন্ন, বিজেপিকে গণতন্ত্রবিরোধী এবং কংগ্রেসকে অকার্যকর বিরোধী হিসেবে তুলে ধরে তিনি নিজের রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও দৃঢ় করার চেষ্টা করেছেন। ফলে এ বারের ২১ জুলাইয়ের সমাবেশ কেবল স্মরণসভা হয়ে থাকেনি; বরং তা হয়ে উঠেছে আগামী দিনের রাজনৈতিক সংঘর্ষের রূপরেখা ঘোষণা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ।