হাইলাইটস:

  • ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পরবর্তী হিংসার ঘটনায় নতুন করে ৪৫৮টি তদন্ত শুরু হয়েছে।
  • ইতিমধ্যে ১৮১টি নতুন এফআইআর দায়ের করা হয়েছে বলে সরকারি সূত্রের দাবি।
  • আর জি কর মেডিক্যাল কলেজের ঘটনা-সহ একাধিক পুরনো মামলাও পুনরায় তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে।
  • বিজেপি সরকারের দাবি, পূর্ববর্তী প্রশাসনের আমলে বহু অভিযোগ চাপা পড়েছিল; তৃণমূলের অভিযোগ, এটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা।
  • আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, পুনর্তদন্ত আইনসঙ্গত হলেও তা নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক হওয়া জরুরি।

(ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে)

বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গে সরকার বদলের পর প্রশাসনিক অগ্রাধিকারের অন্যতম বিষয় হয়ে উঠেছে অতীতের বিতর্কিত ঘটনাগুলির পুনর্তদন্ত। বিশেষ করে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর সংঘটিত রাজনৈতিক হিংসা, আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ঘটনা এবং বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ—এই সব ক্ষেত্রেই নতুন করে তদন্ত শুরু করেছে রাজ্যের বিজেপি সরকার।

সরকারি সূত্রের দাবি, ২০২১ সালের ভোট-পরবর্তী হিংসার ঘটনায় এ পর্যন্ত ৪৫৮টি নতুন তদন্ত শুরু হয়েছে এবং ১৮১টি নতুন এফআইআর নথিভুক্ত হয়েছে। প্রশাসনের বক্তব্য, আগের সরকারের সময় বহু অভিযোগ হয় নথিভুক্তই হয়নি, অথবা তদন্ত কার্যকরভাবে এগোয়নি। সেই কারণেই পুরনো অভিযোগগুলি পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

রাজনৈতিকভাবে এই পদক্ষেপ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২১ সালের নির্বাচনের পর রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় ব্যাপক হিংসার অভিযোগ উঠেছিল। বহু মানুষ ঘরছাড়া হওয়ার দাবি করেন, খুন, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগও সামনে আসে। পরে কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে কয়েকটি মামলার তদন্ত কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার হাতে যায়। তবে বহু অভিযোগ রাজ্য পুলিশের স্তরেই সীমাবদ্ধ ছিল।

ক্ষমতায় আসার পর বিজেপি সরকার সেই সব অভিযোগের তালিকা পুনরায় খতিয়ে দেখতে শুরু করে। প্রশাসনের বক্তব্য, অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা নতুন করে সাক্ষ্য দিতে এগিয়ে এসেছেন। আবার কোথাও পুরনো নথি পুনর্বিবেচনা করে নতুন অপরাধমূলক অভিযোগ যুক্ত করা হয়েছে।

শুধু ভোট-পরবর্তী হিংসাই নয়, গত কয়েক বছরে রাজ্যজুড়ে আলোড়ন তোলা অন্য ঘটনাগুলিও সরকারের নজরে এসেছে। তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ঘটনা। চিকিৎসক নিরাপত্তা, প্রশাসনিক গাফিলতি এবং সম্ভাব্য প্রমাণ নষ্ট করার অভিযোগকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, সেই মামলারও বিভিন্ন দিক পুনরায় পরীক্ষা করা হচ্ছে বলে সরকারি সূত্রের দাবি।

একই সঙ্গে কয়েকটি দুর্নীতির অভিযোগ, সরকারি প্রকল্পে অনিয়ম, স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা এবং রাজনৈতিক প্রভাব খতিয়ে দেখতে বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন বা পুরনো তদন্ত পুনরুজ্জীবিত করার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।

রাজ্য সরকারের যুক্তি, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য কোনও অভিযোগই শুধুমাত্র সময় পেরিয়ে যাওয়ার কারণে অগ্রাহ্য করা যায় না। যদি অভিযোগ থাকে যে তদন্ত অসম্পূর্ণ ছিল, অথবা রাজনৈতিক চাপে তা প্রভাবিত হয়েছে, তাহলে পুনর্তদন্তের সুযোগ আইনেই রয়েছে। সেই যুক্তিতেই একাধিক মামলার ফাইল নতুন করে খোলা হয়েছে।

তবে বিরোধী তৃণমূল কংগ্রেস এই পদক্ষেপকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিযোগ করেছে। দলের বক্তব্য, বিজেপি সরকার প্রশাসনকে ব্যবহার করে বিরোধীদের চাপে রাখতে চাইছে। তৃণমূল নেতাদের দাবি, যেসব মামলা বহু বছর ধরে নিষ্পত্তির পথে ছিল বা আদালতের পর্যবেক্ষণে চলছিল, সেগুলিকে নতুন করে রাজনৈতিক প্রচারের হাতিয়ার বানানো হচ্ছে।

বিজেপি অবশ্য এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে। তাদের বক্তব্য, যদি কোনও নিরপরাধ ব্যক্তি হয়রানির শিকার হন, আদালত তাঁকে রক্ষা করবে। কিন্তু যদি অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকে এবং তার তদন্ত অসম্পূর্ণ থেকে যায়, তবে সরকারের দায়িত্ব তা সম্পূর্ণ করা।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও মামলায় নতুন তথ্য বা নতুন প্রমাণ সামনে এলে পুনর্তদন্ত বা সম্পূরক তদন্তের সুযোগ রয়েছে। তবে সেই তদন্ত অবশ্যই আদালতের নির্দেশ, ফৌজদারি কার্যবিধি এবং প্রমাণ আইনের কাঠামোর মধ্যে হতে হবে। শুধুমাত্র রাজনৈতিক বক্তব্যের ভিত্তিতে তদন্ত এগোলে তা আদালতে টিকবে না।

প্রশাসনিক স্তরেও এই পুনর্তদন্তের জন্য বিশেষ ব্যবস্থাপনা নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন জেলার পুলিশ সুপারদের পুরনো মামলার নথি পুনরায় পর্যালোচনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোথাও বিশেষ তদন্তকারী দল, কোথাও অপরাধ দমন শাখা বা অপরাধ তদন্ত বিভাগের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। অভিযোগকারীদের সঙ্গে পুনরায় যোগাযোগ, সাক্ষীদের নতুন করে জিজ্ঞাসাবাদ এবং ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহের কাজও চলছে।

বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, সরকার পরিবর্তনের পর অতীতের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা নতুন নয়। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যেই ক্ষমতা বদলের পরে পুরনো মামলা পুনরায় খোলার নজির রয়েছে। তবে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল, কারণ এখানে রাজনৈতিক সংঘর্ষ দীর্ঘদিন ধরেই রাজনীতির কেন্দ্রীয় ইস্যু।

২০২১ সালের ভোট-পরবর্তী হিংসা নিয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, কলকাতা হাইকোর্ট এবং বিভিন্ন তদন্তকারী সংস্থার ভূমিকা ইতিমধ্যেই আলোচনায় এসেছে। সেই প্রেক্ষাপটে নতুন সরকার প্রশাসনিক উদ্যোগকে রাজনৈতিক জবাবদিহির অংশ হিসেবে তুলে ধরছে। অন্যদিকে বিরোধীরা এটিকে নির্বাচনী প্রতিশোধের রাজনীতি বলে আখ্যা দিচ্ছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, এই পুনর্তদন্তগুলির প্রকৃত গুরুত্ব নির্ভর করবে শেষ পর্যন্ত আদালতে কী ধরনের প্রমাণ পেশ করা যায় এবং বিচারিক পরীক্ষায় সেগুলি কতটা টিকে থাকে তার ওপর। কারণ শুধুমাত্র নতুন এফআইআর বা তদন্ত শুরু হওয়া কোনও মামলার চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ করে না।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসের বহু বিতর্কিত অধ্যায় আবারও আলোচনার কেন্দ্রে ফিরে এসেছে। ২০২১ সালের নির্বাচনী হিংসা থেকে শুরু করে আর জি করের মতো বহুচর্চিত ঘটনাগুলি নতুন সরকারের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের অংশ হয়ে উঠেছে। এর ফলে আগামী দিনে রাজ্যের রাজনীতি যেমন আরও সংঘাতপূর্ণ হতে পারে, তেমনি বিচারব্যবস্থার ওপরও বাড়বে নজর। শেষ পর্যন্ত এই পুনর্তদন্তগুলি সত্য উদ্ঘাটনের পথে কতটা এগোতে পারে, নাকি রাজনৈতিক মেরুকরণকেই আরও তীব্র করবে—সেই প্রশ্নের উত্তরই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।