হাইলাইটস:
- ক্রিস্টোফার নোলানের বহুল প্রতীক্ষিত ‘The Odyssey’ মুক্তির আগেই সমালোচনার মুখে পড়েছে।
- গ্রিক সাহিত্য, পুরাণ ও ভাষার একাধিক গবেষক অভিযোগ তুলেছেন, ছবির প্রচারে ওডিসিউস চরিত্রকে যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে, তা হোমারের মূল চরিত্রের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
- লেখক ও অনুবাদকদের মতে, ওডিসিউসের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য—চাতুর্য, রসবোধ ও কূটনৈতিক বুদ্ধিমত্তা—ট্রেলারে অনুপস্থিত।
- সমালোচকদের দাবি, নোলানের সংস্করণে চরিত্রটি অতিরিক্ত গম্ভীর ও বিষণ্ণ, ফলে মহাকাব্যের প্রাণশক্তি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।
- অন্যদিকে, ছবির সমর্থকদের বক্তব্য, কয়েক মিনিটের ট্রেলার দেখে চূড়ান্ত রায় দেওয়া ঠিক নয়; পূর্ণাঙ্গ ছবি মুক্তির পরেই বিচার হওয়া উচিত।
ক্রিস্টোফার নোলানের নতুন ছবি ‘The Odyssey’ এখনও মুক্তি পায়নি। কিন্তু মুক্তির আগেই তা নিয়ে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়েছে। হোমারের অমর গ্রিক মহাকাব্য অবলম্বনে নির্মিত এই ছবিকে ঘিরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের গ্রিক ভাষা, সাহিত্য ও পুরাণবিশেষজ্ঞদের একাংশ প্রশ্ন তুলেছেন—নোলান কি মূল কাহিনির আত্মাকেই বদলে দিচ্ছেন?
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ওডিসিউস চরিত্রের উপস্থাপনা। ট্রেলার ও প্রচারসামগ্রী দেখে বহু গবেষকের অভিযোগ, ছবিতে নায়ককে এক কঠোর, যুদ্ধবিধ্বস্ত ও প্রায় নির্বাক যোদ্ধা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। অথচ হোমারের মহাকাব্যে ওডিসিউস শুধু বীর যোদ্ধা নন; তিনি অসাধারণ বুদ্ধিমান, কৌশলী, রসিক এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেকে বদলে নেওয়ার অদ্ভুত ক্ষমতার অধিকারী।
একজন লেখক ও অনুবাদক এপি-কে বলেন, ট্রেলারে দেখা ওডিসিউসের মধ্যে “কোনও চাতুর্য নেই, কোনও রসবোধ নেই, সেই ধূর্ত আকর্ষণও নেই।” তাঁর মতে, এই তিনটি বৈশিষ্ট্য বাদ দিলে চরিত্রটির মৌলিক পরিচয়ই হারিয়ে যায়।
গ্রিক ভাষায় ওডিসিউসকে প্রায়ই ‘পলিমেটিস’ বা বহুবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ট্রয় যুদ্ধ জেতার জন্য বিখ্যাত ট্রোজান হর্সের পরিকল্পনা থেকে শুরু করে সাইক্লোপস পলিফেমাসকে ফাঁকি দেওয়া কিংবা সাইরেনদের প্রলোভন এড়িয়ে যাওয়া—সব ক্ষেত্রেই তাঁর শক্তির চেয়ে বুদ্ধির জয়ই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেই কারণেই বহু গবেষকের প্রশ্ন, নোলানের ছবিতে যদি চরিত্রটির বুদ্ধিদীপ্ত ও মানবিক দিক আড়ালে চলে যায়, তবে তা হোমারের রচনার সঙ্গে কতটা সুবিচার করবে?
তবে এই সমালোচনার পাল্টা যুক্তিও রয়েছে। চলচ্চিত্রবিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করিয়ে দিচ্ছেন, নোলান বরাবরই পরিচিত ক্লাসিক কাহিনিকে নিজের দৃষ্টিভঙ্গিতে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেন। ‘ডানকার্ক’, ‘ওপেনহাইমার’ কিংবা ‘ইন্টারস্টেলার’—সব ক্ষেত্রেই তিনি ঐতিহাসিক বা পরিচিত বিষয়কে নিজস্ব ভাষায় উপস্থাপন করেছেন। ফলে ‘দ্য ওডিসি’-তেও তিনি হুবহু পাঠ্যবই অনুসরণ করবেন, এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।
অনেকেই বলছেন, ট্রেলার মাত্র কয়েক মিনিটের একটি ঝলক। সেখানে চরিত্রের সমস্ত স্তর তুলে ধরা সম্ভব নয়। ওডিসিউসের বুদ্ধি, কূটনীতি ও রসবোধ ছবির গুরুত্বপূর্ণ অংশে প্রকাশ পেতেই পারে। তাই পূর্ণাঙ্গ ছবি না দেখে সমালোচনা করা তাড়াহুড়োর শামিল।
এই বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। হোমারের মহাকাব্য যুগে যুগে অসংখ্যবার চলচ্চিত্র, নাটক ও উপন্যাসে রূপান্তরিত হয়েছে। প্রতিটি নির্মাতাই সময় ও দর্শকের চাহিদা অনুযায়ী কাহিনিকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। কখনও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ, কখনও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, আবার কখনও রাজনৈতিক প্রতীকের মাধ্যমে ওডিসিউসকে নতুন অর্থ দেওয়া হয়েছে।
তবু গ্রিক গবেষকদের আপত্তির একটি বড় কারণ সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্ব। তাঁদের মতে, হোমারের রচনা শুধু একটি অ্যাডভেঞ্চারের গল্প নয়; এটি গ্রিক সভ্যতার অন্যতম ভিত্তিপ্রস্তর। ফলে এর চরিত্র ও ভাষাকে অতিরিক্ত সরলীকরণ বা আধুনিক হলিউডি ছাঁচে ঢেলে দেওয়া হলে মূল ঐতিহ্যের ক্ষতি হতে পারে।
অন্যদিকে, নোলানের অনুরাগীদের যুক্তি, বিশ্বজুড়ে নতুন প্রজন্মকে হোমারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা এই ছবির রয়েছে। এমনকি ছবি নিয়ে বিতর্কও মানুষের মধ্যে মহাকাব্যটি পড়ার আগ্রহ বাড়াতে পারে। সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের সম্পর্ক বরাবরই এমন—একটি অন্যটিকে প্রশ্ন করে, নতুন পাঠের সুযোগ তৈরি করে।
সব মিলিয়ে ‘দ্য ওডিসি’ এখনও মুক্তি না পেলেও তা ইতিমধ্যেই এক গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। ছবিটি শেষ পর্যন্ত হোমারের মহাকাব্যের প্রতি কতটা বিশ্বস্ত থাকবে, আর কতটা নোলানের নিজস্ব শিল্পদৃষ্টির প্রতিফলন হবে, তার উত্তর মিলবে মুক্তির পর। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো এক মহাকাব্য এখনও এমন আবেগ, বিতর্ক এবং বৌদ্ধিক কৌতূহল জাগিয়ে তুলতে পারে, সেটাই তার চিরন্তন শক্তির প্রমাণ।