হাইলাইটস
- কানাডার শত শত দাবানলের ধোঁয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাজুড়ে ভয়াবহ বায়ুদূষণ।
- ২০টিরও বেশি মার্কিন অঙ্গরাজ্যে সতর্কতা; প্রায় ১১ কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত।
- স্কুল, গ্রন্থাগার ও বহিরঙ্গন অনুষ্ঠান বাতিল বা ঘরের ভিতরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
- হাঁপানি, হৃদরোগ ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্তদের জন্য বিশেষ সতর্কবার্তা।
- বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, দাবানল নিয়ন্ত্রণে না এলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
কানাডার শত শত দাবানল থেকে ছড়িয়ে পড়া ঘন ধোঁয়ায় কার্যত দমবন্ধ উত্তর আমেরিকা। সীমান্ত পেরিয়ে সেই ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তীর্ণ এলাকায়। কোটি কোটি মানুষ বিপজ্জনক মাত্রার বায়ুদূষণের মুখে পড়েছেন, বাতিল হচ্ছে বহিরঙ্গন কর্মসূচি, আর স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ বারবার ঘরে থাকার পরামর্শ দিচ্ছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ২০টিরও বেশি অঙ্গরাজ্যে বায়ুদূষণ সতর্কতা জারি রয়েছে। দক্ষিণ-মধ্য কানাডা, উত্তর অন্টারিও এবং মিনেসোটার দাবানলের ধোঁয়া মধ্য-পশ্চিম, উত্তর-পূর্ব ও মধ্য-আটলান্টিক অঞ্চল ঢেকে ফেলেছে। এর প্রভাবে প্রায় ১০ কোটি ৯০ লাখ মানুষ অস্বাস্থ্যকর বাতাসে শ্বাস নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখে অবশ্য কানাডার বাসিন্দারাই। কয়েক বছর ধরেই দেশটির অনেক অঞ্চলে গ্রীষ্ম মানেই দাবানল আর ধোঁয়া। অন্টারিওর ওয়াটারলুর বাসিন্দা টেনিল বোনোগুয়ের বলেন, শীত শেষে যে ঋতুর জন্য সবাই অপেক্ষা করেন, সেই সময়টাই এখন ঘরে বন্দি কাটাতে হচ্ছে।
তাঁর কথায়, অনেক পরিবার এখন কঠিন সিদ্ধান্তের সামনে—প্রচণ্ড গরমে জানালা খুলবেন, নাকি ধোঁয়া ঠেকাতে সব বন্ধ রাখবেন? যাঁদের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই, তাঁদের কাছে এটি কার্যত গরম আর ধোঁয়ার মধ্যে একটিকে বেছে নেওয়ার লড়াই।
উত্তর অন্টারিওতে এখনও ১৮০টিরও বেশি দাবানল জ্বলছে। ফলে আগামী কয়েক দিনও ধোঁয়ার প্রবাহ অব্যাহত থাকবে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সংকট শুধু জনস্বাস্থ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব পড়ছে অর্থনীতিতেও। অন্টারিওর হ্যামিলটনের কাঠমিস্ত্রি টেড ব্রিয়ারলি জানান, দূষণের কারণে কাজের সময় কমাতে হচ্ছে এবং কর্মীদের আগেভাগে ছুটি দিতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদন ও আয়—দুটোই কমে গেছে।
তাঁর প্রশ্ন, প্রতি বছর দাবানলের প্রকোপ বাড়লেও আগাম প্রস্তুতি ও অবকাঠামোয় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ কি সত্যিই হচ্ছে?
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। বৃহস্পতিবার রাতে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় শীর্ষে ছিল শিকাগো। ডেট্রয়েট ও মিনিয়াপোলিসও ছিল সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর মধ্যে।
ইলিনয়ের স্কোকির বাসিন্দা জেফ বলেন, বাতাসে পোড়া প্লাস্টিকের মতো গন্ধ। গভীর শ্বাস নিলেই নাক ও গলায় জ্বালাপোড়া হচ্ছে, আর শহরজুড়ে যেন ধোঁয়ার সাদা চাদর নেমে এসেছে।
শিকাগোর বাসিন্দা ভ্লাদ জানান, দুই দশকে এমন পরিস্থিতি তিনি কখনও দেখেননি। হাঁপানিতে আক্রান্ত ছেলেকে ঘরের বাইরে যেতে দিচ্ছেন না। ঘরের বায়ু বিশুদ্ধ রাখতে ইতিমধ্যেই ফিল্টার বদলেছেন, নতুন বায়ুমান পর্যবেক্ষণ যন্ত্র কেনার পরিকল্পনাও করছেন।
দাবানলের ধোঁয়া পৌঁছে গেছে নিউইয়র্কেও। আকাশে কমলা আভা, বাতাসে পোড়া গন্ধ—শহরজুড়ে তৈরি হয়েছে অস্বাভাবিক পরিবেশ।
মিশিগানের ফার্মিংটন হিলসে একটি গ্রন্থাগারের শিশুদের গল্পপাঠের অনুষ্ঠান বাইরে থেকে ঘরের ভিতরে সরিয়ে নিতে হয়েছে। দর্শনার্থীদের জন্য রাখা হয়েছে এন–৯৫ মাস্ক।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, দাবানলের ধোঁয়া হাঁপানি, হৃদরোগ এবং অন্যান্য শ্বাসযন্ত্রের সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন শিশু, প্রবীণ, গর্ভবতী নারী এবং আগে থেকেই অসুস্থ ব্যক্তিরা।
মেরিল্যান্ডের বাল্টিমোরে বায়ুদূষণ “অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর” পর্যায়ে পৌঁছেছে। চিকিৎসক শার্লট ওয়াটস জানান, ধোঁয়ার প্রভাব তাঁর নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসেও পড়েছে। হাসপাতালগুলোতেও শ্বাসকষ্টের রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।
তাঁর মতে, সবার ঘরে উন্নত মানের এয়ার পিউরিফায়ার বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই। ফলে ঘরের ভেতরেও নিরাপদ থাকা অনেকের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, কানাডার দাবানল দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে আগামী কয়েক দিন উত্তর আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ধোঁয়ার দাপট আরও বাড়তে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এমন দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যাপক দাবানল ভবিষ্যতে আরও ঘন ঘন দেখা যেতে পারে বলেও তাঁদের সতর্কবার্তা।