Table of Contents
নতুন অ্যালবাম, রাজনীতি ও রক সঙ্গীত নিয়ে অকপট রোলিং স্টোনস কিংবদন্তি
হাইলাইটস
- ২৫তম অ্যালবাম Foreign Tongues-এ ব্লুজ, কান্ট্রি ও ক্লাসিক রকের শিকড়ে ফিরেছে দ্য রোলিং স্টোনস।
- ৮২ বছরেও শিল্পকে সমাজ থেকে আলাদা করে দেখতে নারাজ মিক জ্যাগার।
- “শিল্প উপদেশ নয়, সমাজের প্রতিফলন হওয়া উচিত”—বললেন স্টোনসের ফ্রন্টম্যান।
- নস্টালজিয়া নয়, নিজের প্রতি সৎ থাকাই নতুন অ্যালবামের মূল দর্শন।
- ছয় দশক পরও ব্যান্ডে মতবিরোধ আছে, তবে এখন তা অনেক বেশি পরিণত।
রক সঙ্গীতের ইতিহাসে এমন শিল্পী খুব কমই আছেন, যাঁদের নামই একটি যুগের প্রতীক। মিক জ্যাগার তাঁদেরই একজন। ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে দ্য রোলিং স্টোনসের মুখ হয়ে তিনি শুধু অসংখ্য কালজয়ী গানই উপহার দেননি, রকস্টারের সংজ্ঞাকেও নতুনভাবে লিখেছেন বারবার।
৮২ বছর বয়সেও তাঁর কৌতূহল, উদ্যম এবং নতুন কিছু করার আগ্রহ এতটুকু কমেনি।
দ্য রোলিং স্টোনসের ২৫তম স্টুডিও অ্যালবাম Foreign Tongues প্রকাশের পর হিন্দুস্তান টাইমস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জ্যাগার কথা বলেছেন নতুন অ্যালবাম, শিল্প ও রাজনীতির সম্পর্ক, সৃজনশীল স্বাধীনতা এবং ছয় দশকের ব্যান্ডজীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে।
অতীতের ছোঁয়া, কিন্তু অতীতের বন্দি নয়
জ্যাগারের মতে, প্রতিটি অ্যালবামই শিল্পীর সেই সময়ের মানসিকতা ও সঙ্গীতচিন্তার প্রতিফলন।
তিনি জানান, Foreign Tongues খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তৈরি হয়েছে। লন্ডনের স্টুডিওতে ব্যান্ড একসঙ্গে ১২-১৩টি গান রেকর্ড করে, পরে সেখান থেকে বেছে নেওয়া হয় ১০টি ট্র্যাক।
তাঁর মতে, ছয় দশক পরেও এই উৎসাহই প্রমাণ করে যে সঙ্গীতের প্রতি তাঁদের ভালোবাসা এতটুকুও কমেনি।
ব্লুজে ফেরা, কিন্তু একই ছকে নয়
নতুন অ্যালবামে ব্লুজের পাশাপাশি রয়েছে কান্ট্রি, পপ এবং ক্লাসিক রকের মিশেল।
তবে জ্যাগারের দাবি, এটি কোনও পরিকল্পিত ‘ফিরে যাওয়া’ নয়।
রোলিং স্টোনস শুরু থেকেই কোনও একটি ঘরানার মধ্যে নিজেদের আটকে রাখেনি। বরং নানা ধরনের সঙ্গীতকে নিজেদের ভাষায় উপস্থাপন করাই তাদের পরিচয়।
‘ভিনটেজ’ স্টোনস? জ্যাগারের উত্তর আলাদা
অনেক সমালোচক Foreign Tongues-কে সত্তরের দশকের ক্লাসিক রোলিং স্টোনসের প্রত্যাবর্তন বলে বর্ণনা করছেন।
কিন্তু জ্যাগার এই ব্যাখ্যার সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন।
তাঁর কথায়, Exile on Main Street-এর মতো পুরনো অ্যালবামের সাউন্ড আজ প্রযুক্তিগতভাবে অনেক ঘোলাটে শোনায়। চাইলে সেই শব্দ আবার তৈরি করা সম্ভব, কিন্তু সেটাই লক্ষ্য নয়।
বরং একজন শিল্পীর কাজ হওয়া উচিত নিজের প্রতি সৎ থাকা। আধুনিক প্রযুক্তির স্বচ্ছ শব্দ ব্যবহার করেও পুরনো আবহ তৈরি করা যায়—যদি সঙ্গীতের আত্মা অক্ষুণ্ণ থাকে।
শ্রোতার জন্য নয়, নিজের বিশ্বাসে
গত অ্যালবামের পর অনেকেই রোলিং স্টোনসকে ব্লুজ ও কান্ট্রির শিকড়ে ফেরার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
জ্যাগার অবশ্য স্পষ্ট জানিয়ে দেন, নতুন অ্যালবামের এই সঙ্গীতধারা দর্শকের চাহিদা পূরণের জন্য নয়।
তাঁদের নীতি সবসময়ই এক—
যা ভালো লাগে, সেটাই তৈরি করা।
‘রোলিং স্টোনসের মতো শোনায়’—এর মানে কী?
জ্যাগারের মতে, কোনও গানকে “রোলিং স্টোনসের মতো” বলা খুবই আপেক্ষিক।
তিনি উদাহরণ দেন ব্যান্ডের অন্যতম জনপ্রিয় গান Paint It Black-এর। সেখানে সেতারের ব্যবহার, মধ্যপ্রাচ্য-প্রভাবিত সুর—সবই ছিল প্রচলিত রকের বাইরে।
তাঁর মতে, রোলিং স্টোনসের আসল পরিচয় কোনও নির্দিষ্ট সাউন্ড নয়, বরং বৈচিত্র্যকে নিজের করে নেওয়ার ক্ষমতা।
‘শিল্প সমাজ থেকে আলাদা হতে পারে না’
নতুন অ্যালবামের Divine Intervention গানের একটি ব্যঙ্গাত্মক লাইন ইতিমধ্যেই আলোচনায় এসেছে।
এ প্রসঙ্গে জ্যাগার বলেন, তিনি গান লিখতে বসলে চারপাশের পৃথিবীকে অনুভব করার চেষ্টা করেন।
তবে সেটা কখনও রাজনৈতিক বক্তৃতা নয়।
তাঁর ভাষায়,
“সব গান যদি শুধু প্রেম নিয়ে হয়, কিংবা সব গান যদি শুধু রাজনীতি নিয়েই হয়, তাহলে শিল্প একমাত্রিক হয়ে পড়ে।”
রাজনীতি নয়, বাস্তবতার প্রতিফলন
সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল শিল্প ও রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে জ্যাগারের মন্তব্য।
তিনি মনে করেন, শিল্পী সমাজের বাইরের কেউ নন। ফলে চারপাশের ঘটনা তাঁর সৃষ্টিকে প্রভাবিত করবেই।
তাঁর মতে,
“শিল্পকে প্রচারপত্র হতে হবে না। কিন্তু সমাজের প্রতিফলন অবশ্যই হওয়া উচিত।”
একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন, শিল্প যেন কখনও দলীয় প্রচার বা নীতিবাক্যে পরিণত না হয়।
ছয় দশক পরও মতবিরোধ আছে
রোলিং স্টোনসের দীর্ঘ পথচলার রহস্য নিয়েও কথা বলেছেন জ্যাগার।
হেসে তিনি বলেন, ব্যান্ডে এখনও মতের অমিল হয়, তবে আগের তুলনায় অনেক কম।
এবারের অ্যালবামের প্রযোজক অ্যান্ডি ওয়াট-এর প্রশংসা করে জ্যাগার বলেন, একজন দক্ষ প্রযোজক অনেক সময় রেফারির ভূমিকাও পালন করেন। মতবিরোধের মাঝেও তিনি সৃজনশীল পরিবেশ বজায় রাখতে সাহায্য করেন।
বয়স শুধু সংখ্যা
আট দশকের জীবনে এবং ছয় দশকের সঙ্গীতযাত্রায় মিক জ্যাগার বহুবার নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছেন।
Foreign Tongues সেই ধারাবাহিকতারই নতুন অধ্যায়।
এই সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, রোলিং স্টোনস অতীতকে শ্রদ্ধা করে, কিন্তু অতীতের বন্দি নয়। তারা নতুন শব্দ নিয়ে পরীক্ষা করে, আবার প্রয়োজনে ব্লুজের শিকড়েও ফিরে যায়।
আর সবচেয়ে বড় কথা, জ্যাগারের বিশ্বাস—
যে শিল্প সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, সে শিল্প ধীরে ধীরে প্রাণ হারায়। তাই ৮২ বছর বয়সেও তিনি পৃথিবীকে একই কৌতূহল নিয়ে দেখেন, আর সেই অভিজ্ঞতাই ফিরে আসে তাঁর গানে।