Home SportsFIFA 2026 মেসিকে নিস্তেজ করার রণকৌশল

মেসিকে নিস্তেজ করার রণকৌশল

Authored By নির্ণয় চট্টোপাধ্যায়
8 views 4 minutes read
A+A-
Reset

সুইজারল্যান্ড জানত, লিওনেল মেসিকে কীভাবে সামলাতে হয়। তারা মাঠের মাঝখানটা এতটাই ঘন করে রক্ষণ সাজিয়েছিল যে, মেসির পক্ষে ফাঁক খুঁজে সূক্ষ্ম পাস বাড়ানো বা বাঁ পায়ের সেই পরিচিত ক্ষুরধার শট নেওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে। খেলার গতি কমে এলে মেসির একটি চেনা কৌশল হলো, বক্সের সামনে কোনো সতীর্থের সঙ্গে দ্রুত ওয়ান-টু পাস খেলে হঠাৎই জায়গা তৈরি করা। সেই মুহূর্তেই বাঁ পা খুলে তিনি গোলের সুযোগ তৈরি করেন। কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে সেই পরিকল্পনা সফল হয়নি। প্রতিবারই তিনি লাল জার্সিধারী সুইস রক্ষণপ্রাচীরে আটকে গিয়েছেন। কেবল হুলিয়ান আলভারেসের জয়সূচক গোলের ঠিক আগে একবারই গ্রেগর কোবেলের সামনে কিছুটা জায়গা পেয়েছিলেন।

আর্জেন্টিনার গোটা কৌশলই এমনভাবে সাজানো যে, বল ছাড়া মেসির সীমিত ভূমিকার ক্ষতিটুকু মেনে নিয়ে তাকে বল পেলে সর্বাধিক বিপজ্জনক অবস্থানে রাখা যায়। সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৩৯ বছর বয়সী মেসি, তার নিজস্ব মানদণ্ডে, অনেকটাই নিষ্প্রভ ছিলেন। যদিও কর্নার থেকে আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের গোলে অ্যাসিস্ট করেছিলেন। কাগজে-কলমে “মেসিকে থামাও” পরিকল্পনা সহজ শোনায়, কিন্তু বাস্তবে তা সফল করা প্রায় অসম্ভব। তবু সুইজারল্যান্ড দেখিয়ে দিয়েছে, সেই পথ হয়তো একেবারে বন্ধ নয়। ইংল্যান্ড নিশ্চয়ই সেই ম্যাচ থেকে শিক্ষা নিতে চাইবে।

ডান প্রান্তের দুর্বলতা

সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনিকে তার দলের ডান দিকের দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। কারণ নটিংহ্যাম ফরেস্টের দ্রুতগতির উইঙ্গার ড্যান এনদোয়ে প্রায় পুরো ম্যাচজুড়েই সেই দিক দিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করেছিলেন।

ডান-ব্যাক নাহুয়েল মোলিনা এনদোয়েকে সামলাতেই পারেননি। এনদোয়ে তার গতিতে বারবার মোলিনাকে পেছনে ফেলে সমতাসূচক গোল করেন এবং আরও ক্ষতি করার সম্ভাবনাও তৈরি করেন। অতিরিক্ত সময় শুরুর আগেই মোলিনাকে তুলে নিতে হয়। পরে স্কালোনি জানান, টুর্নামেন্ট শুরুর আগে তিনি গুরুতর চোটে ভুগছিলেন। তার পরিবর্তে যিনি খেলেন, গনসালো মন্তিয়েল, তিনিও পুরোপুরি সুস্থ নন। ফলে দু’জনের খেলানোর সময় খুব সতর্কতার সঙ্গে বণ্টন করতে হচ্ছে।

ইংল্যান্ডের অ্যান্থনি গর্ডন কিংবা মার্কাস র‍্যাশফোর্ড এই দুর্বলতাকে কাজে লাগানোর স্বপ্ন দেখতেই পারেন। আরও বড় সমস্যা হলো, ডানদিকে রদ্রিগো দে পলের কাছ থেকেও পর্যাপ্ত সহায়তা মিলছে না। আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডে প্রস্থের অভাব থাকায় ফুল-ব্যাকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে।

ছন্দময়, কিন্তু ত্রুটিপূর্ণ মিডফিল্ড

সময় ও জায়গা পেলে আর্জেন্টিনার মিডফিল্ড এখনও খেলার ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কখনও ধীরগতিতে ম্যাচ পরিচালনা করে, আবার কখনও দ্রুত ছোট ছোট পাসে প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করে দেয়। কিন্তু তাদের বড় দুর্বলতা হলো, তারা অন্য শীর্ষ দলগুলোর তুলনায় অনেক কম দৌড়ায়।

এই বিশ্বকাপে দৌড় বা স্প্রিন্টের পরিসংখ্যানে আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডারদের নাম শীর্ষে নেই। ফলে জুড বেলিংহ্যামের মতো অক্লান্ত পরিশ্রমী ফুটবলারের সামনে আবারও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। ডেকলান রাইস যদি পুরোপুরি সুস্থ থাকেন, তার সামনের দিকে দ্রুত উঠে আসার অভ্যাসও আর্জেন্টিনাকে সমস্যায় ফেলতে পারে।

এনজো ফার্নান্দেজ ও ম্যাক অ্যালিস্টার গুরুত্বপূর্ণ গোল করেছেন ঠিকই, কিন্তু বল হারালে তাদের পাশ কাটিয়ে যাওয়াও খুব কঠিন হয়নি। বিশেষ করে মিশরের বিরুদ্ধে সেটি স্পষ্ট ছিল। ৩২ বছর বয়সী দে পলের মধ্যেও ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে শেষদিকে রক্ষণ সামলাতে নামা লিয়ান্দ্রো পারেদেসও সুইজারল্যান্ড ম্যাচে পুরো সময় টিকতে পারেননি। মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ একবার হারালে সেটি ফিরিয়ে আনতে আর্জেন্টিনাকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়।

প্রতিভার ঝলকই সবচেয়ে বড় অস্ত্র

আর্জেন্টিনা এমন একটি দল, যারা প্রায়ই এক-দুটি অসাধারণ মুহূর্তের ওপর ভর করে ম্যাচ জিতে নেয়। এটিই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি, আবার কিছুটা দুর্বলতাও। নকআউট পর্বের তিনটি ম্যাচেই তারা বিপদের মুখে পড়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেউ না কেউ অসাধারণ কিছু করে দলকে উদ্ধার করেছে।

গ্রুপ পর্বে মেসি বারবার দলকে টেনে তুলেছেন। মিশরের বিরুদ্ধে যখন হারের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তখনও তিনি সামনে এসেছিলেন। সেই ম্যাচে লাউতারো মার্তিনেসের দুর্দান্ত ক্রস থেকে এনজো ফার্নান্দেজ জয়সূচক গোল করেন। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে দীর্ঘ সময় নিষ্প্রভ থাকা হুলিয়ান আলভারেস হঠাৎই দুর্দান্ত দূরপাল্লার শটে এমন একটি গোল করেন, যা গোটা বিশ্বকাপের সেরা গোলের দাবিদার হতে পারে।

ইংল্যান্ডের জন্য সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা এখানেই। আর্জেন্টিনা অনেকক্ষণ নিষ্প্রভ থাকতে পারে, আক্রমণের পথ বন্ধ হয়ে যেতে পারে, খেলার ছন্দ হারিয়ে ফেলতে পারে। কিন্তু তাদের বড় তারকারা এক মুহূর্তের জাদুতেই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম।

স্কালোনির কথায়, “শেষ পর্যন্ত আমরা সমাধান বের করেই ফেলি।” আর সেই অপ্রত্যাশিত মুহূর্তগুলোর জন্য কোনো দলই পুরোপুরি প্রস্তুত থাকতে পারে না।

শারীরিক লড়াইয়ে টিকে থাকার চ্যালেঞ্জ

সেমিফাইনালে ওঠার উচ্ছ্বাসের মধ্যেও স্কালোনি একটি বিষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।

তিনি বলেন, “দ্বৈরথে জেতা আমাদের জন্য খুব কঠিন হয়ে গিয়েছিল। টানা পাঁচ-ছয়টির বেশি পাসও একসঙ্গে খেলতে পারিনি।”

সুইজারল্যান্ডের শক্তিশালী ও শারীরিক ফুটবল আর্জেন্টিনাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। শেষ আটের দলগুলোর মধ্যে উচ্চতা ও শারীরিক গঠনের বিচারে আর্জেন্টিনাই ছিল সবচেয়ে ছোট দল। ফলে সুইস ফুটবলারদের শক্তির সামনে তারা বারবার বল হারিয়েছে।

ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে এই সমস্যা আরও প্রকট হতে পারে। কারণ ইংল্যান্ডের অন্যতম বড় শক্তিই হলো তাদের শারীরিক সক্ষমতা ও দীর্ঘ সময় একই তীব্রতায় খেলার ক্ষমতা।

মাঝমাঠের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ হবেই, তবে হ্যারি কেন ও আর্জেন্টিনার সেন্টার-ব্যাকদের দ্বৈরথও ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে। কেনের সাবেক সতীর্থ ক্রিস্তিয়ান রোমেরো হাঁটুর চোট কাটিয়ে টুর্নামেন্টে ফিরেছেন বটে, কিন্তু এখনও পুরো ছন্দে নেই। সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে বারবার ধাক্কা খেয়েছেন এবং শেষ ১৫ মিনিট মাঠেও থাকতে পারেননি। মিশরের বিরুদ্ধে প্রত্যাবর্তনের সূচনা করলেও তার স্বাভাবিক আগ্রাসন এখনও পুরোপুরি ফিরে আসেনি।

স্কালোনি জানেন সামনে কী অপেক্ষা করছে। তার ভাষায়, “আমরা জানি, আমাদের সামনে কী ধরনের প্রতিপক্ষ রয়েছে।”

ফাইনালে উঠতে হলে আর্জেন্টিনাকে শুধু ফুটবলেই নয়, শারীরিক লড়াইয়েও ইংল্যান্ডের সমান তালে টিকে থাকতে হবে।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles