হাইলাইটস:

  • প্রথমবার আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যে শনাক্ত হল এরিথ্রুলোজ (Erythrulose) নামে একটি প্রকৃত শর্করা।
  • এই শর্করা রাস্পবেরির মতো ফলে স্বাভাবিকভাবে থাকে, আবার সেলফ-ট্যানিং প্রসাধনীতেও ব্যবহৃত হয়।
  • স্পেনের শক্তিশালী রেডিও টেলিস্কোপ ব্যবহার করে মিল্কিওয়ের কেন্দ্রের কাছে বিশাল গ্যাস-ধূলিকণার মেঘে এর সন্ধান পান বিজ্ঞানীরা।
  • গবেষকদের মতে, জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় জটিল জৈব অণু পৃথিবীতে তৈরির আগেই মহাশূন্যে তৈরি হতে পারে।
  • গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে Nature Astronomy-তে।

বাংলাস্ফিয়ার: মহাকাশের বিশাল শূন্যতা যে শুধু গ্যাস, ধুলো আর নক্ষত্রে ভরা, সেই ধারণায় নতুন মাত্রা যোগ করলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। প্রথমবারের মতো তারা আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যে এমন একটি শর্করার সন্ধান পেয়েছেন, যা পৃথিবীতে রাস্পবেরি ফলের মধ্যে পাওয়া যায় এবং প্রসাধনী শিল্পেও ব্যবহৃত হয়। এই আবিষ্কার শুধু জ্যোতির্বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেই নয়, জীবনের উৎপত্তি নিয়ে গবেষণাতেও এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিজ্ঞানীরা যে অণুটি শনাক্ত করেছেন তার নাম এরিথ্রুলোজ। এটি চার-কার্বনবিশিষ্ট একটি শর্করা। পৃথিবীতে এটি অল্প পরিমাণে বিভিন্ন ফলে পাওয়া যায় এবং সেলফ-ট্যানিং লোশন তৈরিতেও ব্যবহৃত হয়। এবার সেই একই অণুর অস্তিত্ব ধরা পড়েছে নক্ষত্রগুলির মধ্যবর্তী গ্যাস ও ধূলিকণার বিশাল মেঘে, যাকে বলা হয় ইন্টারস্টেলার মিডিয়াম

এই আবিষ্কারের জন্য গবেষকরা স্পেনের ইয়েবেস ৪০ মিটার এবং আইরাম ৩০ মিটার রেডিও টেলিস্কোপ ব্যবহার করেন। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রের কাছে অবস্থিত G+0.693−0.027 নামের একটি বিশাল আণবিক মেঘ থেকে আসা রেডিও সংকেত বিশ্লেষণ করে এরিথ্রুলোজের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। পরীক্ষাগারে প্রস্তুত নমুনার বর্ণালির সঙ্গে টেলিস্কোপে ধরা পড়া সংকেত মিলিয়ে এই শনাক্তকরণ সম্ভব হয়েছে।

শর্করা শুধু খাদ্যের উৎস নয়। জীবন্ত কোষের শক্তি উৎপাদন, ডিএনএ ও আরএনএর গঠন এবং নানা জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় শর্করার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই মহাশূন্যে এই ধরনের জটিল শর্করার উপস্থিতি বিজ্ঞানীদের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। যদিও এরিথ্রুলোজ নিজে জীবনের জন্য অপরিহার্য নয়, এটি সহজেই এমন শর্করায় রূপান্তরিত হতে পারে, যা আদিম পৃথিবীতে জীবন শুরুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মনে করা হয়।

গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, এই শর্করা সম্ভবত আন্তঃনাক্ষত্রিক ধূলিকণার ওপর অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় অপেক্ষাকৃত সহজ জৈব অণু থেকে তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ, জটিল জৈব রসায়ন শুধু গ্রহে নয়, নক্ষত্র জন্মের আগেই মহাশূন্যে শুরু হতে পারে।

দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্ক ছিল—পৃথিবীতে জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় জৈব উপাদান কি এখানেই তৈরি হয়েছিল, নাকি ধূমকেতু ও গ্রহাণুর মাধ্যমে মহাশূন্য থেকে এসেছিল? এই নতুন আবিষ্কার সেই বিতর্কে নতুন তথ্য যোগ করেছে। যদি আন্তঃনাক্ষত্রিক মেঘেই এই ধরনের শর্করা তৈরি হয়ে থাকে, তবে সৌরজগত গঠনের সময় থেকেই সেগুলি গ্রহ তৈরির উপাদানের সঙ্গে মিশে থাকতে পারে।

এর আগেও বিজ্ঞানীরা গ্রহাণু বেন্নু থেকে আনা নমুনায় বিভিন্ন ধরনের শর্করার সন্ধান পেয়েছিলেন এবং মিল্কিওয়ের কেন্দ্রে টেবিল-চিনির আত্মীয় কিছু অণুও শনাক্ত হয়েছিল। কিন্তু আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যে এভাবে একটি প্রকৃত শর্করা শনাক্ত হওয়া এই প্রথম।

গবেষকদের মতে, যদি আমাদের গ্যালাক্সির এক অঞ্চলে এমন শর্করা তৈরি হতে পারে, তাহলে মহাবিশ্বের আরও অসংখ্য নক্ষত্র-গঠনের অঞ্চলেও একই ধরনের রাসায়নিক প্রক্রিয়া ঘটতে পারে। সেক্ষেত্রে জীবনের মৌলিক উপাদান শুধু পৃথিবীর জন্য নয়, গোটা গ্যালাক্সিতেই ছড়িয়ে থাকার সম্ভাবনা আরও জোরালো হল।