বাংলাস্ফিয়ার: কলকাতা বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে অবস্থিত ১৩৬ বছরের পুরনো বঙ্করা মসজিদে সাধারণ মানুষের প্রবেশে কড়াকড়ির সিদ্ধান্তকে সমর্থন করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর বক্তব্য, বিমানবন্দরের অপারেশনাল এলাকার নিরাপত্তার সঙ্গে কোনও ধরনের আপস করা যায় না। যে কোনও ধর্মীয় স্থানের ক্ষেত্রেই একই নীতি প্রযোজ্য হওয়া উচিত।

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি জানিয়েছে, আপাতত অনির্দিষ্টকালের জন্য মসজিদে সাধারণের প্রবেশ বন্ধ রাখা হয়েছে। কারণ হিসেবে তারা বলেছে, এতদিন শুধুমাত্র আধার কার্ড দেখিয়ে বিমানবন্দরের সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশের যে ব্যবস্থা ছিল, তা বর্তমান নিরাপত্তা মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

এই সিদ্ধান্তের পরেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, দেশের বিমানবন্দরগুলি অত্যন্ত সংবেদনশীল অবকাঠামো। সেখানে নিরাপত্তা সংস্থাগুলির সুপারিশকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তাঁর কথায়, “নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনও রকম আপস করা হবে না। ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধা রয়েছে, কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তা তার ঊর্ধ্বে।”

নিরাপত্তা বনাম ধর্মীয় ঐতিহ্য

বিমানবন্দরের ভিতরে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক মসজিদ নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। বহু বছর ধরেই বিমান চলাচল ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন, রানওয়ের এত কাছাকাছি সাধারণ মানুষের নিয়মিত যাতায়াত নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

আগেই কেন্দ্রীয় অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রক সংসদে জানিয়েছিল, মসজিদটির অবস্থানের কারণে দ্বিতীয় রানওয়ের থ্রেশহোল্ড সরিয়ে নিতে হয়েছে। এর ফলে জরুরি অবতরণ, কম দৃশ্যমানতায় বিমান নামানো এবং নেভিগেশন ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও কিছু সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে সিআইএসএফও দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসছিল।

আধার দেখিয়ে প্রবেশ নিয়ে আপত্তি

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের মূল আপত্তি ছিল, এতদিন শুধুমাত্র পরিচয়পত্র যাচাই করে বিমানবন্দরের অপারেশনাল এলাকায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছিল। অথচ এই এলাকা সাধারণ যাত্রীদের জন্যও সম্পূর্ণ উন্মুক্ত নয় এবং এখানে কঠোর নিরাপত্তা বিধি কার্যকর থাকে।

কর্তৃপক্ষের মতে, বর্তমান আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী এই ধরনের প্রবেশব্যবস্থা আর গ্রহণযোগ্য নয়। সেই কারণেই প্রবেশ সাময়িক নয়, অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

স্থানান্তরের ভাবনা

বিমানবন্দর সূত্রে জানা গিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদে মসজিদটিকে বিমানবন্দরের সুরক্ষিত এলাকার বাইরে স্থানান্তরের সম্ভাবনাও বিবেচনা করা হচ্ছে। যদিও এ বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, প্রশাসনিক স্তরে আলোচনা চলছে।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

শুভেন্দু অধিকারীর সমর্থনের ফলে বিষয়টি রাজনৈতিক গুরুত্বও পেয়েছে। বিজেপির বক্তব্য, এটি সম্পূর্ণ নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এবং একে সাম্প্রদায়িক রং দেওয়া উচিত নয়। তাদের দাবি, দেশের প্রতিটি বিমানবন্দরে একই ধরনের নিরাপত্তা নীতি কার্যকর হওয়া উচিত।

অন্যদিকে বিরোধী মহলের একাংশের মত, ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থানের ঐতিহ্য এবং ভক্তদের সুবিধার বিষয়টিও বিবেচনা করা প্রয়োজন। তবে তারাও স্বীকার করছে, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত বিশেষজ্ঞ সংস্থাগুলির মূল্যায়নের ভিত্তিতেই হওয়া উচিত।

ভারসাম্যের চ্যালেঞ্জ

কলকাতা বিমানবন্দরের এই মসজিদ বহু দশক ধরে ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে আসছে। কিন্তু আধুনিক বিমান চলাচলের নিরাপত্তা মান, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা এবং সংবেদনশীল অবকাঠামোর সুরক্ষা এখন অনেক কঠোর। ফলে ঐতিহ্য রক্ষা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্যে একটি ভারসাম্য খুঁজে বের করাই প্রশাসনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য সেই নিরাপত্তাকেন্দ্রিক অবস্থানকেই আরও জোরালো করেছে। এখন নজর থাকবে, মসজিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলি শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেয়।